সাবেক র‍্যাপশিল্পী মেয়র বালেন্দ্র শাহ কি নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন?

বালেন্দ্র শাহ নেপালে বালেন শাহ হিসাবে পরিচিত, যিনি কাঠমান্ডুর মেয়র ছিলেন

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বালেন্দ্র শাহ নেপালে বালেন শাহ হিসাবে পরিচিত, যিনি কাঠমান্ডুর মেয়র ছিলেন
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

নেপালের নির্বাচনের পর ভোট গণনা এখনো চলছে, তবে র‍্যাপার থেকে রাজনীতিতে আসা বালেন্দ্র শাহ নেপালের সাধারণ নির্বাচনে শুরুতেই বেশ ভালো ব্যবধানে এগিয়ে আছেন, যা তাকে দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে শাহ-যিনি জানুয়ারি পর্যন্ত নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর মেয়র ছিলেন,প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন অন্যান্য প্রার্থীর সঙ্গে, যাদের মধ্যে ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউএমএল)-এর সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি এবং নেপালি কংগ্রেসের গগন থাপা।

শনিবার সকাল পর্যন্ত যত ভোট গণনা হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে শাহের মধ্যপন্থী রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) ১৬৫টি সরাসরি নির্বাচিত আসনের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি জায়গায় এগিয়ে আছে-এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি নেপালি।

নেপালি কংগ্রেস দ্বিতীয় অবস্থানে অনেক পিছিয়ে এবং ইউএমএল তৃতীয় স্থানে রয়েছে।

চূড়ান্ত ফলাফল আগামী সপ্তাহের আগেই নাও আসতে পারে। পাহাড়ি দেশ নেপালে ভোট গণনা ঐতিহ্যগতভাবে ধীরগতির, এবং দূরবর্তী অঞ্চলগুলো থেকে ব্যালট আনার জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে হয়, ফলে চূড়ান্ত ফল জানতে কয়েক দিন লেগে যেতে পারে।

২০২২ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ হতে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় লেগেছিল।

ভোটে এগিয়ে থাকায় বালেন্দ্র শাহের দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভোটে এগিয়ে থাকায় বালেন্দ্র শাহের দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে

বালেন্দ্র শাহ কে?

বালেন্দ্রা শাহ নাম হলেও স্থানীয়ভাবে বালেন নামে পরিচিত ৩৫ বছর বয়সী এই নেতা অবকাঠামো প্রকৌশলী হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং কয়েক বছর ধরে নেপালের হিপ হপ অঙ্গন 'নেফপ'-এ সক্রিয় সদস্য ছিলেন।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

তিনি বহু গান প্রকাশ করেছেন, যেগুলোর বেশিরভাগই সামাজিক বার্তাধর্মী। এর মধ্যে অন্যতম পরিচিত গান "বালিদান" যার অর্থ 'ত্যাগম'সেটি ইউটিউবে মিলিয়ন ভিউ পেয়েছে।

গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, পরে যা দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার ক্ষোভে পরিণত হয়,সে সময় দেশের তরুণদের মধ্যে শাহের জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়।

সে সময় ৭৭ জন নিহত হয়েছিলেন, যাদের মধ্যে অনেকেই পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এরপর নেপালের তৎকালীন নেতা কেপি ওলিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। তবে ৭৪ বছর বয়সী ওলি এবারও নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন এবং জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন।

বালেন্দ্র শাহ প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দিয়েছিলেন এবং এক পর্যায়ে কেপি ওলিকে "সন্ত্রাসী" আখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি দেশের সাথে বেইমানি করেছেন।

এসব বক্তব্যের কারণে সমালোচকরা প্রশ্ন তোলেন, দেশ পরিচালনার জন্য তিনি কতটা উপযুক্ত।

মেয়র হিসেবে রাজধানীর সড়কগুলো পরিষ্কার রাখতে এবং অবৈধ ব্যবসা দমনে তিনি রাস্তার হকার ও ভূমিহীন মানুষের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে পুলিশ ব্যবহার করেছেন, যার জন্য মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েন।

এসব বিষয়ে বালেন্দ্র শাহের প্রচারণা টিমের সদস্যরা বিবিসির মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

বালেন্দ্র শাহ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কেপি ওলির একই আসন ঝাপা ৫-যা ঐতিহ্যগতভাবে ওলির শক্ত ঘাঁটি। এ পর্যন্ত ভোট গণনা দেখাচ্ছে শাহ উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে আছেন।

তবে প্রচারণার সময় তিনি গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেওয়া এড়িয়ে গেছেন এবং নির্বাচনের দিন সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। সেদিন তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ কালো সানগ্লাস পরে সাংবাদিকদের ভিড় পেরিয়ে দ্রুত চলে যান।

নেপালের গণমাধ্যম আশঙ্কা করছে,তিনি ক্ষমতায় গেলে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।

তবু বিবিসির সঙ্গে কথা বলা বহু তরুণ ভোটার বলছেন,তারুণ্য ও উদ্যমই এখন দেশের প্রয়োজন, এবং শাহ নেপালের ভবিষ্যতের নতুন অধ্যায়ের প্রতীক।

ভোট গণনায় বালেন্দ্র শাহের দল ভালো ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, ভোট গণনায় বালেন্দ্র শাহের দল ভালো ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে

নেপালিরা ঠিক কীসের জন্য ভোট দিয়েছেন?

বৃহস্পতিবার দেশের পরবর্তী নেতাকে নির্বাচিত করার পাশাপাশি নেপালিরা পার্লামেন্টের ২৭৫ সদস্য নির্ধারণের জন্যও ভোট দিয়েছেন।

এটি সম্পন্ন হয়েছে সরাসরি ভোট (ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট) এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার সমন্বয়ে। প্রতিটি ভোটার দিয়েছেন দুটি করে ভোট।

মোট ১৬৫ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট পদ্ধতিতে, যেখানে সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থী আসনটি জিতে নেন। বাকি ১১০ জন সাংসদ নির্বাচিত হন জাতীয়ভাবে কোনো রাজনৈতিক দল কত শতাংশ ভোট পেয়েছে তার ভিত্তিতে।

মোট প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ এই নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য ছিলেন এবং বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ শেষে কর্মকর্তারা জানান, ভোটের হার প্রায় ৬০% হতে পারে।

একজন নারী ভোট দিচ্ছেন

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, নেপালে দূরবর্তী অঞ্চলগুলো থেকে ব্যালট আনার জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে হয়, ফলে চূড়ান্ত ফল জানতে কয়েক দিন লেগে যেতে পারে

এই নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ?

গত বছরের বিক্ষোভের পর এই নির্বাচনকে পুরনো ও নতুনের লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বর্তমানে এগিয়ে থাকা আরএসপি, ২০২২ সালের সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনে চতুর্থ স্থানে ছিল।

দেশের তরুণ ভোটাররা। এদের মধ্যে ৮ লাখ প্রথমবারের ভোটার ছিলেন প্রধান ভোটার গোষ্ঠী, যাদের আকৃষ্ট করতে রাজনৈতিক দলগুলো চাকরির সুযোগ সৃষ্টি, দুর্নীতি মোকাবিলা এবং সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নেপাল বারবার জোট সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, যার নেতৃত্বে ছিল প্রধানত তিনটি দল, যার দুটি ছিল কমিউনিস্ট দল।

কিন্তু এবার কোনো দলই বড় ধরনের জাতীয় জোট করেনি, ফলে ভোটারদের কাছে দল ও প্রার্থীদের অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে।

এছাড়া এ নির্বাচনে নতুন অনেক দল ও নতুন মুখ দেখা গেছে, এবং এক-তৃতীয়াংশ প্রার্থীই স্বতন্ত্রভাবে দাঁড়িয়েছেন।

এসবই ইঙ্গিত করে যে বহু নেপালি নতুন ধারণা ও নতুন নেতৃত্বের সন্ধান করছেন, যা তাদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

যদি বালেন্দ্র শাহ নির্বাচিত হন, তবে তা নেপালের রাজনীতিতে এক ভূমিকম্পসদৃশ পরিবর্তন হবে,কারণ দশকের পর দশক ধরে একই পুরনো নেতৃত্বের অধীনে অস্থিতিশীল জোট সরকারের পর এটি হবে এক ভিন্নধর্মী মুহূর্ত।