ভারত: দিল্লি বিমানবন্দরে শেখ হাসিনার অভ্যর্থনা নিয়ে আলোচনা থেকে কী বার্তা পাওয়া যায়

ছবির উৎস, PID
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চারদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলে সোমবার তাকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন দেশটির রেল ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী দর্শনা বিক্রম জারদোশ।
বাংলাদেশের সরকার প্রধানকে একজন প্রতিমন্ত্রীর অভ্যর্থনা জানানোর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে চলছে নানা ধরণের আলোচনা সমালোচনা।
অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এর আগে শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দরে হাজির হয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এবার তার ব্যত্যয় ঘটার কারণ কী? তাহলে কি বাংলাদেশের গুরুত্ব ভারতের কাছে কমে গেছে?
আবার কেউ বলছেন, ভারতের সরকার প্রধান সব সময় বিদেশি অতিথিকে অভ্যর্থনা বা বিদায় জানাতে স্বশরীরে বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকেন না।
আরও পড়তে পারেন:
অভ্যর্থনা জানানোর প্রোটোকল আসলে কী?

ছবির উৎস, Ministry of External Affairs, India
রাষ্ট্রীয় সফরে আসা অতিথিকে অভ্যর্থনা জানানোর প্রোটোকল ব্যবস্থা একেক দেশে একেক রকম।
বাংলাদেশে বিদেশি অতিথিকে অভ্যর্থনা জানানোর ক্ষেত্রে রীতি হচ্ছে, কাউন্টারপার্ট বা সম-পদমর্যাদার দায়িত্ববান ব্যক্তি বিমানবন্দরে অতিথিকে অভ্যর্থনা জানান।
এ মূহুর্তে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, কোন রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধান সফরে এলে তাকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি অথবা প্রধানমন্ত্রী। এবং তাকে বিদায় জানাতে যান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন বলেছেন, এটা লিখিত কোন রীতি বা নিয়ম নয়, কিন্তু এটা বহু বছর ধরে প্রচলিত রীতি।
কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে এই প্রথা আলাদা।

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:
কূটনীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভারতের রীতি অনুযায়ী কোন রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধানকে অভ্যর্থনার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় মূলত সফরের দ্বিতীয় দিনে যখন রাষ্ট্রপতি ভবনে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধানকে স্বাগত জানানো হয়।
কিন্তু বিদেশি অতিথি, তিনি রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধান যেই হোন, যখন ভারতে পদার্পণ করেন তাকে বিমান বন্দরে স্বাগত জানান একজন প্রতিমন্ত্রী।
দ্বিতীয় দিনে অতিথিকে নিয়ে গান্ধী স্মারক স্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং রাষ্ট্রপতি ভবনে লালগালিচা অভ্যর্থনার মাধ্যমে স্বাগত জানানো হয় অতিথিকে।
তবে এর যে ব্যত্যয় যে ঘটে না তা নয়।

ছবির উৎস, Getty Images
দু'হাজার সতের সালে বিমানবন্দরে শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানানোর মতই পৃথিবীর আরো কয়েকজন নেতাকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানিয়েছেন মি. মোদী।
এদের মধ্যে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান।
এর আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালের এপ্রিলে ভারত সফরে যান সেসময় তাকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানাতে গিয়েছিলেন ভারতের তৎকালীন কেন্দ্রীয় নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী ও সংগীতশিল্পী বাবুল সুপ্রিয়।
তবে শেষ মূহুর্তে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজেই বিমানবন্দরে হাজির হন শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাতে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন সেটাই ছিল ব্যতিক্রম।

ছবির উৎস, Getty Images
এরপর ২০১৯ সালে শেখ হাসিনা যখন দ্বিতীয়বার ভারত সফরে যান, সেবার বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন প্রতিমন্ত্রী দেবশ্রী চৌধুরী। তখন মি. মোদী বিমানবন্দরে আসেননি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিশেষ ক্ষেত্রে মি. মোদী প্রচলিত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটান।
এটা অনেকটাই নির্ভর করে ওই অতিথির সাথে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর।
ওদিকে, মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে।
সেখানে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার দেওয়া হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে।
অভ্যর্থনা বিতর্ক নিয়ে কী বলছে ভারত ও বাংলাদেশ?

ছবির উৎস, Getty Images
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক এবং টুইটারে বিষয়টি নিয়ে সোমবার বিকেল থেকেই আলোচনা হচ্ছে।
বিতর্কে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দরে মি. মোদী না আসাকে কেন্দ্র করে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, তাহলে কি ভারতের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব কমে গেছে?
সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার সূত্র ধরেই দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে মঙ্গলবার এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় মোহন কাট্রাকে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকেরা।
মি. কাট্রা এসব বিতর্ককে নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, "বাংলাদেশে বিরোধীরা কী বলছে, তা নিয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না। কিন্তু আমি এটা বলতে চাই যে আমরা এই সফরকে একটি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিয়েছি এবং এটা একটা সর্বোচ্চ পর্যায়ে সফর।"
"এবং সে অনুযায়ী সর্বোচ্চ শ্রেণীর সফরের মর্যাদা অনুযায়ী প্রাপ্য সর্বোচ্চ প্রোটোকল দেয়া হয়েছে। একটি রাষ্ট্রীয় সফরে যা যা প্রোটোকল দেয়ার কথা সবই করা হয়েছে। বাংলাদেশের বিরোধীদের সমালোচনা বিষয়ে কিছু বলা আমার উচিত হবে না," বলেন মি. কাট্রা।
তবে, সামাজিক মাধ্যমে যারা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছেন তারা প্রশ্ন তুলেছেন, এটা কি ভারতের কাছে বাংলাদেশের আবেদন কমে যাওয়ার লক্ষণ?
বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানানোর ক্ষেত্রে ভারতের রীতির কোন ব্যত্যয় ঘটেনি।
"ফলে এর মাধ্যমে ভারতের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্বে কোন ঘাটতি হয়েছে কিনা সেটা বোঝা যাবে না। সেটা বরং বোঝা যাবে এ সফরে বাংলাদেশের এজেন্ডা কতটা বাস্তবায়ন হচ্ছে তার ওপর।
"আর সেজন্য সফরের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে," বলেন মি. হোসেন।
মঙ্গলবার দিল্লিতে দুই দেশের মধ্যে সাতটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। তবে বহুল আলোচিত তিস্তা নদীর পানি ভাগাভাগি বিষয়ক কোন চুক্তি এবারও হয়নি।
তবে শিগগিরই এই চুক্তি হবে বলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার যৌথ বিবৃতিতে আশা প্রকাশ করেছেন।
এদিকে, বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে বাংলাদেশি ব্যবহারকারীদের মধ্যেই বেশি আলোচিত হচ্ছে।
কিন্তু কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক কাকলী সেনগুপ্ত মনে করেন, বিমান বন্দরের অভ্যর্থনা দিয়ে ভারতের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব বিচার করা যাবেনা।
"বিমান বন্দরের অভ্যর্থনাকে যদি সিম্বোলিক বা প্রতীকী গুরুত্ব বলেও ধরে নিই, তাহলেও বুঝতে হবে বাংলাদেশের গুরুত্ব ভারতের কাছে কমেনি। কারণ ভারতের রীতি অনুযায়ী আজ (মঙ্গলবা) তাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেখানো হয়েছে," বলেন অধ্যাপক সেনগুপ্ত।
তিনি বলছিলেন, "বাংলাদেশের জন্য ভারত যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভারতের জন্যও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন ধরে এ সফর যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি ভারতের জন্যও বাংলাদেশের মত প্রতিবেশী যার সাথে তার রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক ঘনিষ্ট তার সাথে সুসম্পর্ক জরুরী।"
সামাজিক মাধ্যমের আলোচনাকে তিনি তাৎপর্যপূর্ণ মনে করেন না।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রোটোকল কেবল বিদেশ থেকে আসা অতিথিকে সুচারুভাবে অভ্যর্থনা জানানোই নয়, এর মাধ্যমে কূটনৈতিক ইমিউনিটিও দেয়া হয় অতিথিদের।
কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে ১৯৬১ সালের ভিয়েনা কনভেনশনে সার্বভৌম রাষ্ট্রসমূহ থেকে আসা অতিথিদের স্বাগত জানানোর মাধ্যমে দুই বা ততোধিক দেশের মধ্যে সুসম্পর্কের বার্তা দেয়া হয়।
এছাড়া ওই কনভেনশন অনুযায়ী দ্বিপাক্ষিক সফরে অতিথি কোন ভীতি বা চাপমুক্ত হয়ে নিজের কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।








