ভারতে কল-কারখানা, নির্মাণ সাইট যেভাবে একেকটি মরণ-ফাঁদ

- Author, অর্চনা শুক্লা,
- Role, বাণিজ্য বিষয়ক সংবাদদাতা, বিবিসি
"এই কারখানা আসলে একটি মৃত্যুর কারখানা," ভারতের রাজধানী দিল্লিতে পুড়ে যাওয়া একটি ভবনের দ্বিতীয় তলার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললেন ইসমাইল খান। সে সময় তার হাত থরথর করে কাঁপছিল।
চার তলা ভবনের একটি অংশে ছিল একটি ইলেকট্রনিক্স কারখানা। এ বছর মে মাসে সেখানে আগুন লাগলে বহু মানুষের সাথে আটকা পড়েন ইসমাইল খানের ২১ বছরের ছোট বোন মুসকান।
যে ২৭ জন লোক আগুনে মার যান, মুসকান ছিলেন তাদের একজন।
ঐ অগ্নিকাণ্ডের কদিন পর একজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান ভবনের মালিক তিনটি তলা জুড়ে ঐ কারখানাটি স্থাপনের জন্য ভাড়া দেওয়ার আগে ফায়ার ব্রিগেড এবং পুলিশের কাছ থেকে কোনও ছাড়পত্র নেননি।
পুলিশের ঐ কর্মকর্তা জানান, এমনকি ঐ কারখানাটির প্রয়োজনীয় লাইসেন্সও ছিলনা।
কারখানার দুই মালিকের সাথে বিবিসি কয়েকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করে, কিন্তু তারা ফোন ধরেননি, টেক্সটের জবাব দেননি। তাদের আইনজীবীর সাথেও যোগাযোগ করা হয়, কিন্তু কার কাছে প্রশ্ন পাঠাতে হবে তা জানাতে তিনি অস্বীকার করেন।
ভারত বিশ্বের একটি শিল্পোন্নত দেশ হওয়ার চেষ্টা করছে। শিল্পে বিনিয়োগের জন্য, উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিভিন্ন নতুন নতুন সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে সরকার।
কিন্তু দিল্লির এই কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের মত ঘটনা সেদেশে আকছার ঘটছে। আর এসব এসব দুর্ঘটনার বলি হচ্ছেন দরিদ্র শ্রমিক কর্মচারীরা।
প্রতি বছর ভারতে কর্ম ক্ষেত্রে নানারকম দুর্ঘটনায় শত শত লোক মারা যায়। পঙ্গু হচ্ছে আরও অনেকে।
কেন্দ্রীয় একজন মন্ত্রী ২০২১ সালে পার্লামেন্টে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, তার আগের পাঁচ বছরে কল-কারখানা, বন্দর, খনি এবং নির্মাণ শিল্পে কাজ করার সময় কমপক্ষে ৬,৫০০ লোক প্রাণ হারিয়েছে।

শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করেন এমন লোকজন বিবিসিকে বলেছেন প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি কারণ বহু দুর্ঘটনার খবর জানাই যায়না অথবা নথিবদ্ধ হয়না।
আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন ইন্ডাস্ট্রি-অলের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতে কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুর সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটছে কল-কারখানা এবং নির্মাণ খাতে। ঐ সংগঠনের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২১ সালে ভারতে কলকারখানায় প্রতি মাসে গড়ে সাতটি করে দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে যেসব দুর্ঘটনায় মারা গেছে কমপক্ষে ১৬২ জন শ্রমিক।
মিডিয়ায় প্রকাশিত এবং প্রচারিত বিভিন্ন খবর থেকে দেখা যায় কর্মক্ষেত্রে এসব দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি এবং পঙ্গুত্বের শিকার হচ্ছেন সেসব শ্রমিক যারা ছোটোখাটো এবং লাইসেন্স বিহীন কারখানায় কাজ করেন। ট্রাজেডির শিকার এসব শ্রমিক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খুব গরীব এবং তারা প্রধানত ভিন্ন রাজ্য থেকে বড় বড় শহরে কাজ করতে আসেন। দুর্ঘটনার পর তার প্রতিকারে বা ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য আইনি লড়াই করার কোনো ক্ষমতা তাদের নেই।
এ বিষয়ে দিল্লি পৌর কর্পোরেশনের শ্রম বিষয়ক কমিশনার এবং কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কাছে প্রশ্ন পাঠিয়েছিল বিবিসি। কিন্তু কোনও উত্তর আসেনি।
'আমি বিচার চাই'
প্রায় প্রতিদিনই মাঝরাতে দুঃস্বপ্নে রাকেশ কুমারের ঘুম ভেঙ্গে যায়। চিৎকার করে তখন কাঁদেন তিনি।
দিল্লির ঐ ইলেকট্রনিক্স কারখানার আগুনে তিন মেয়েকে হারিয়েছেন রাকেশ কুমার। মাসে আট হাজার রুপি মজুরীতে ঐ তিন বোন ওয়াই-ফাই রুটারের যন্ত্রপাতি জোড়া দেওয়ার কাজ করতেন।

"আমার মেয়েরা নিশ্চয়ই খুব কষ্ট পেয়ে মরেছে!" রাকেশ বলেন।
অগ্নিকাণ্ডে তিন মেয়ের কপালে কী ঘটেছে তা জানতে কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে পরিবারকে। তারপর পুলিশ পোড়া মৃতদেহের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য তাদের ডেকে পাঠায়। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ায় দুর্ঘটনার এক মাস পর মেয়েদের সৎকার করেন রাকেশ কুমার।
"আমি এই মৃত্যুর বিচার চাই," তিনি বলেন।
অগাস্টে দিল্লির পুলিশ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ দায়ের করে। তাদের বিরুদ্ধে অবহেলার কারণে মৃত্যু ঘটানোর অভিযোগ আনা হয়।
দিল্লির একজন শ্রমিক নেতা রাজেশ কাশ্যপ বলেন রাজধানী এবং শহরতলীগুলোতে বহু কল-কারখানায় নিরাপত্তা বিষযক আইন-কানুন কখনই পুরোপুরি মানা হয়না। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুবই কম।
মি. কাশ্যপ এবং তার মতে আরও অনেক শ্রমিক নেতা অভিযোগ করেন, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার মামলা বছরের পর বছর চলতে থাকে, এবং অভিযুক্তরা সহজে জামিনে মুক্তি পেয়ে যায়।
দিল্লি পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ বছরে রাজধানীতে বিভিন্ন কারাখানায় ৬৬৩টি দুর্ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে যেসব দুর্ঘটনায় ২৪৫ জন মারা গেছেন। এসব দুর্ঘটনায় পর ৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে শ্রমিক অধিকার কর্মীরা বলেন এসব দুর্ঘটনার প্রাথমিক তদন্তেই অনেক গরল থাকে। যদিও পুলিশের বক্তব্য - "অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা" যাতে নেওয়া যায় তা তারা নিশ্চিত করেন।
পুলিশ অবশ্য স্বীকার করছে, বেশ কিছু কারণে - যেমন, ফরেনসিক তদন্তের রিপোর্ট এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত পেতে দেরি হওয়ার কারণে অনেক মামলায় অভিযুক্তরা খলাস পেয়ে যায়।
ক্ষতিপূরণের জন্য লড়াই
বিবিসি বেশ কতগুলো পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেছে যারা এসব দুর্ঘটনায় ঘনিষ্ঠ স্বজন হারিয়েছে। নিহত অনেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী।
কিন্তু আইনগত জটিলতা এবং অন্য আরও কিছু কারণে কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়ে।
ক্ষতিপূরণের এসব কিছুটা মামলায় শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের পক্ষ হয়ে লড়েছেন এমন একজন সিনিয়র আইনজীবী বিবিসিকে বলেন, এসব মামলা বছরের পর বছর ধরে চলে।
অনেক সময় এসব দুর্ঘটনার পর সরকার তৎক্ষণাৎ আহত-নিহতদের পরিবারকে এককালীন কিছু সাহায্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করে, যাতে কোম্পানিগুলো বড় কোনো চাপে না পড়ে।
এবং শেষ পর্যন্ত যখন মামলা শুরু হয় তখন ভিন রাজ্য থেকে কাজ করতে আসা বিধ্বস্ত, হতাশ শ্রমিক পরিবারগুলো হয়তো নিজেদের গ্রামে বা অন্য শহরে কাজের খোঁজে পাড়ি জমায়।

"দীর্ঘসূত্রিতা এবং জটিলতার কারণে আইন-আদালতের ওপর এসব দরিদ্র শ্রমিকদের তেমন কোনো আস্থা নেই। সুতরাং ক্ষতিপূরণের নামে সরকার বা কোম্পানির কাছ থেকে অল্পস্বল্প যে পয়সা তারা পায় তা নিয়েই তারা চলে যায়," বলছিলেন চন্দন কুমার, যিনি এমন একটি নাগরিক সংগঠনের সাথে যুক্ত যারা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে।
২০১৮ সালে দিল্লিতে একটি কারাখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৭ জন শ্রমিকের পরিবারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে বিবিসি। কিন্তু সেসব পরিবারের অধিকাংশ দিল্লি ছেড়ে চলে গেছে। ঐ দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যাওয়া শ্রমিকদের পরিবারের বেলাতেও তাই হয়েছে।
পঞ্চাশ বছর বয়সী সঙ্গীতা রয় তিন বছর আগে একটি কারখানায় কার্ড-বোর্ড কাটার একটি মেশিনে কাজ করার সময় একটি হাত হারান। তিনি জানান কোম্পানি থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ তিনি পাননি। শুধু তিনবছর পর পঙ্গু শ্রমিকদের জন্য সরকারের দেওয়া একটি পেনশন কর্মসূচিতে ঢুকতে পেরেছেন।
কাজের জায়গায় কত মানুষ পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে তার কোনো সরকারি পরিসংখ্যান ভারতে নেই। তবে সেফ ইন ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন নামে একটি এনজিও পরিচালিত এক সমীক্ষা বলছে শুধু উত্তর ভারতে গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানাগুলোতে ২০১৬ সাল থেকে ২০২২ পর্যন্ত ৩৯৫৫টি বড় ধরণের দুর্ঘটনা হয়েছে। আহতদের ৭৫ শতাংশ এসব দুর্ঘটনায় আঙ্গুল হারিয়েছেন না হয় মেশিনের চাপে হাতের বড়রকম ক্ষতি হয়েছে।
ভারত এখন দক্ষিণ এশিয়ায় গাড়ি তৈরির বড় একটি কেন্দ্র। কমবেশি এক কোটি শ্রমিক এই খাতে কাজ করেন। গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরির জন্য বহু ছোটো ছোটো কোম্পানিকে ঠিকা দেওয়া হয়।

ছবির উৎস, Getty Images
সেফ ইন ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ সচদেব বিবিসিকে বলেন অধিকাংশ রাজ্য এসব কারাখানায় দুর্ঘটনার খবর ঠিকঠাক মত রাখেইনা।
ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
ভারত সরকার শ্রম আইন সংস্কারের কাজ শুরু করেছে। সেখানে শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ এবং নিরাপত্তার বিভিন্ন নূতন শর্ত যোগ করা হচ্ছে।
তবে অধিকার কর্মীরা ভয় পাচ্ছেন প্রস্তাবিত নতুন আইনে শ্রমিক স্বার্থ আরও খর্ব হতে পারে।
যেমন, আগের আইনে বলা ছিল কোনো কোম্পানিতে ১০ জনের বেশি কর্মী থাকলেই সেখানে নিরাপত্তা বিষয়ক একটি কমিটি করতে হবে। কিন্তু প্রস্তাবিত নতুন আইনে সেই সংখ্যা করা হয়েছে ২৫০।
কিন্তু ভারতের ২০১৬ সালের অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী দেশে অকৃষিখাতের মাত্র ১.৬৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে, ২ শতাংশ কারখানায় এবং নির্মাণ খাতের ১.২৫ শতাংশ কোম্পানিতে কাগজে কলমে ১০ বা তার অধিক শ্রমিক-কর্মচারী রয়েছে। ইনফরমাল বা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির খাতেই ভারতের শ্রমশক্তির ৯০ শতাংশ মানুষ কাজ করে এবং সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে কোনো পরিসংখ্যানই আসলে নেই।
অনেক কোম্পানি এখন স্থায়ী নিয়োগের বদলে চুক্তি ভিত্তিক শ্রমিক-কর্মচারী নিয়োগ করছে। তাতে করে শ্রমিকদের অধিকার আরও বেশি করে খর্ব হচ্ছে বলে মনে করেন শ্রম অধিকার কর্মী এবং আইনজীবী সুধা ভরদোয়াজ।
কাজের জন্য মরিয়া শ্রমিকরা ইউনিয়নের সদস্য হতে দ্বিধা করে। কোম্পানিগুলোর সুবিধার জন্য কর্মস্থলে পরিদর্শন নজরদারি অনেক শিথিল করছে সরকার।
বর্তমান আইনে কাজের জায়গায় নিরাপত্তা রক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষমতা রয়েছে সরকারের শ্রম বিভাগের পরিদর্শকদের। কিন্তু নতুন প্রস্তাবিত আইনে তাদের ক্ষমতা কমানো হচ্ছে এবং তারা শুধু মালিক ও শ্রমিক পক্ষের মধ্যে মীমাংসাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারবে।
ফলে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারখানা মালিকদের কাছে শ্রমিকদের নিরাপত্তার গুরুত্ব আরও কমছে। "শ্রমিকদের নিরাপত্তা রক্ষা শেষ পর্যন্ত কারোরই দায়িত্ব থাকবে না," বলেন শ্রম অধিকার কর্মী এবং শিক্ষাবিদ সিদ্ধেশ্বর প্রসাদ শুক্লা।








