ভারতে 'দেশপ্রেমের উন্মাদনা': দুর্নীতি-দারিদ্র নয়, পাকিস্তানই একমাত্র শত্রু?

ছবির উৎস, মালবী গুপ্ত
- Author, মালবী গুপ্ত
- Role, সাংবাদিক, কলকাতা
সেই ছোটবেলা থেকেই কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং 'ছায়াযুদ্ধ' দেখে আসছি।
চীন মাঝে মধ্যেই এদিক ওদিক থেকে উঁকি মারে বটে, ভারতীয় সীমানার মধ্যে ঢুকেও পড়ে দু'একবার। তবে দু'তরফেই কিছু হম্বিতম্বির পর তা কেমন নিস্তব্ধ হয়ে যায়। এবং তা নিয়ে দেশের লোকের যেমন কোন মাথা ব্যথা থাকে না।
তেমনি, চীন শত্রু হিসেবে জনমানসে যেন তেমন রেখাপাতও করে না।
কিন্তু দেশভাগের পর থেকে আজ পর্যন্ত পাকিস্তানই আমাদের কাছে এক এবং একমাত্র শত্রু হিসেবে চিহ্নিত থেকেই যাচ্ছে। হয়তো অমীমাংসিত কাশ্মীর সমস্যা তার প্রধান কারণ।
জানি না, কাশ্মীর সমস্যা মিটে গেলে (যদি কোন দিনও তা মেটে) পারস্পরিক শত্রুতার অবসান ঘটবে কিনা। কারণ ভারত-পাকিস্তান উভয় দেশের মধ্যেই লাইন অফ কন্ট্রোল এবং যুদ্ধ-বিরতি লঙ্ঘনের পারস্পরিক অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের প্রচ্ছন্ন ধারাবাহিকতাও বজায় থেকেই যাচ্ছে।
আর আমজনতা আমরা থেকে থেকেই দেখছি কাশ্মীর নিয়ে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠছে।

ছবির উৎস, AAMIR QURESHI
কিন্তু কেবলই মনে হয়, এই সমস্যা কি এতটাই কঠিন যে, আমরা ৭০-৭২ বছরেও তার সমাধান করে উঠতে পারলাম না? নাকি আদৌ করতে চাই না?
আমি অবশ্য এই কূটতর্কে বা এই ব্যাপারে ইতিহাসের সত্য-মিথ্যা কার্যকারণ বিশ্লেষণে যাচ্ছি না। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে তো দেখছি, দু'দেশের মধ্যে এই যে নিরন্তর আক্রমণ ও প্রতি-আক্রমণে, জঙ্গি হামলায় এবং জঙ্গি দমনের নামে শিশু ও নারীসহ হাজার হাজার নিরীহ মানুষের জীবনহানি ঘটেই চলেছে।
মনে হচ্ছে তাতে কি শেষ পর্যন্ত কোথাও পৌঁছনো যাচ্ছে? এই দু'দেশের কেউই কি সত্যিই মনে করছে - আমরাই জিতছি?
কেউ কেউ করছে হয়তো। কারণ আমাদের দেশে একটা চলতি ধারণা, যখনই এই যুদ্ধ বা ছায়া যুদ্ধের বাতাবরণ তৈরি হোক না কেন, তাতে সেই সময়ের কেন্দ্রীয় সরকার, তথা শাসক দলের রাজনৈতিক লাভের একটা ব্যাপার জড়িয়ে থাকে। বিশেষত যদি থাকে আসন্ন কোন নির্বাচনের সম্ভাবনা ।
এবং সেই নির্বাচনের ফলাফলও, পাকিস্তানকে যদি 'উচিত শিক্ষা' দেওয়া যায়, তাহলে তার গৌরব অনেকটাই নাকি শাসক দলের পক্ষে যায় - এমন দাবি অনেকে করে ।ঠিক যেমন এখনও করা হচ্ছে। (আরও জানতে এখানে ক্লিক করুন )।

ছবির উৎস, SOPA Images
কিন্তু আশ্চর্য লাগে এই ভেবে যে, কী কংগ্রেস রাজত্ব, কী এনডিএ, কী ইউপিএ - যে শাসকই লঙ্কায় যাক না কেন, কাশ্মীর উপত্যকাবাসীদের কাছে শেষ বিচারে সেই যেন রাবণ হয়ে উঠছে। কারণ তারা দেখছেন, যুগের পর যুগ পার হয়ে যাচ্ছে - নিরাপত্তাহীনতার গাঢ় আঁধার ঘুচিয়ে কেউ তাদের স্বাভাবিক সম্মানের জীবন ফিরিয়ে দিচ্ছে না।
তার ওপর ইদানিং ভারত আবার 'দেশপ্রেম' নামক নতুন এক জ্বরে আক্রান্ত। যে জ্বর থেকেই উঠে আসা 'দেশপ্রেমী' ও 'দেশদ্রোহী', দুটি শব্দই যেন এই মুহূর্তে ভারতের আসমুদ্র হিমাচল দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
কে কত বড় দেশপ্রেমী এবং কে কত ভয়ঙ্কর দেশদ্রোহী, তার কাটা ছেঁড়া চলছে অনুক্ষণ ।
কিন্তু মনে হচ্ছে, পরাধীন ভারতে যে সংজ্ঞায় দেশপ্রেমী শব্দটির ব্যবহার হত আজও কি তা অবিকৃত আছে? নাকি বদলে গিয়েছে তার রং রূপ?
কারণ, দেশকে স্বাধীন করার জন্য যে প্রবল আকাঙ্ক্ষা, ভালবাসা, যে আত্মত্যাগের আবেগে লক্ষ লক্ষ নারী পুরুষ নির্বিশেষে হৃদয় একদিন উদ্বেলিত হয়েছিল - যার থেকেই হয়তো তখন সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতিতে দেশপ্রেম ও দেশপ্রেমী হয়ে উঠেছিল বহুচর্চিত শব্দ।

ছবির উৎস, SAM PANTHAKY
আর যারা ঠিক তার উল্টো পথে সেদিন হেঁটেছিল, স্বাধীনতার জন্য কোন গণআন্দোলনেই যোগ না দিয়ে বরং নানা ভাবে তার বিরোধিতা করেছিল; জাতির পিতাকে বুলেটবিদ্ধ করতেও যাদের হাত কাঁপেনি, তাদের ললাটেই তো ছাপ পড়েছিল 'দেশদ্রোহী'র। (আরও জানতে এখানে ক্লিক করুন)।
কিন্তু আজ যেন দেখছি সেই ললাট লিখন হঠাৎই বদলে গেছে। এক কালের 'দেশদ্রোহী' রাই হয়ে উঠছে বিরাট 'দেশপ্রেমী'। এবং দেশের নাগরিকদের প্রতি তাদের অসমর্থনযোগ্য কাজের বা আচরণের দিকে যারা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছেন, তাদের মিথ্যাচারের প্রতিবাদ জানাচ্ছেন যারা, তাদেরই একবাক্যে 'দেশদ্রোহী' র কাঠগড়ায় তুলে দেওয়া হচ্ছে। 'দেশবিরোধী'র তকমা সেঁটে দেওয়া হচ্ছে তাদের গায়ে, সে রাজনীতিক, সাহিত্যিক-শিল্পী-অভিনেতা-অভিনেত্রী এমনকি একেবারে আমজনতা - যেই হোন না কেন।
আর ফেক নিউজ বা মিথ্যে খবরের তাণ্ডবে যে ঘটমান বর্তমানের মধ্যে দিয়ে আমরা চলেছি, তাতেও তো পদে পদে কেবলই বিমূঢ় হতে হচ্ছে । কারণ এই মুহূর্তে যে খবর আমরা কাগজে পড়ছি বা দেখছি তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা মিথ্যে বলে প্রমাণিত হয়ে যাচ্ছে।

ছবির উৎস, Hindustan Times
এমনকি সম্প্রতি বালাকোটে ভারতীয় বিমান বাহিনীর আক্রমণের যে ঘটনা সত্য বলে প্রতিভাত হচ্ছিল, দেশের বহু মানুষ যার প্রভাবে এক অভাবিত আবেগ এবং প্রায় হিস্টিরিক উন্মাদনায় ভেসে যাচ্ছিল, তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার সত্যতা নিয়ে দেশে বিদেশে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা প্রশ্ন তুলে দিল। এবং মিথ্যে বলে তার সপ্রমাণ দাবিও আছড়ে পড়তে থাকল সংবাদ মাধ্যমে।
এমনকি দেশের শাসক দলের প্রতিনিধিরাও যে ঘটনা, যে সংখ্যাতত্ত্বের জন্য সত্যের দাবিতে হাঁক পাড়ছেন এবং তাও যখন মিথ্যে বলে দাবি করা হচ্ছে, তখন বাস্তবিকই সত্যি-মিথ্যের প্রবল ধন্দে কিছুটা বিপন্ন বোধ করছি বইকি।
তবে আবার এও মনে হচ্ছে, ক্ষমতা অর্জন ও তাকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে দেশের রাজনৈতিক নেতারা না হয় নিরবধি কাল ধরে কেবল পাকিস্তানকেই শত্রু বলে কামান দেগে যাবে। কিন্তু আমরা সেই শত্রু নির্বাচনের ফাঁদে পা দিচ্ছি কেন?
দেশে পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি, দারিদ্র, কুসংস্কার, অ-শিক্ষা, অ-স্বাস্থ্য, দেশের নানা প্রান্তের তীব্র জল-সঙ্কট আর দূষণ ভারাক্রান্ত পরিবেশকে কি আমরা শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে পারছি না? যা আমাদের সামগ্রিক জীবনকে কেবলই বিপর্যস্ত করে তুলছে, তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার তুলে নিতে আমরা এত সময় নিচ্ছি কেন?








