ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ: জাপোরিঝিয়া পরমাণু কেন্দ্রে পৌঁছেছে জাতিসংঘ পরিদর্শক দল

জাপোরিঝিয়া পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পৌঁছেছে জাতিসংঘের পরিদর্শকদের গাড়ি বহর

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, জাপোরিঝিয়া পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পৌঁছেছে জাতিসংঘের পরিদর্শকদের গাড়ি বহর

ইউক্রেনের রুশ অধিকৃত জাপোরিঝিয়া পরমাণু কেন্দ্র পরিদর্শনে যাওয়া জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকরা অবশেষে সেখানে পৌঁছেছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

এই পরিদর্শক দল এর আগে পরমাণু কেন্দ্রের কাছাকাছি ইউক্রেনের একটি তল্লাশি চৌকিতে আটকে পড়েছিল।

ইউক্রেন এবং রাশিয়া- দুই দেশের কর্মকর্তারাই নিশ্চিত করেছেন যে জাতিসংঘ পরিদর্শক দল এখন জাপোরিঝিয়া পরমাণু কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে।

গত কিছুদিন ধরে রাশিয়া এবং ইউক্রেন পরস্পরের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের আশে-পাশে গোলাবর্ষণের অভিযোগ করছিল।

ইউক্রেন বলছে, এই কেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকায় আবার নতুন করে রুশ গোলাবর্ষণ হয়েছে এবং এর কারণে কেন্দ্রের একটি পরমাণু চুল্লি বন্ধ করে দিতে হয়েছে।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মিশনের প্রধান রাফায়েল গ্রসি বলেন, কয়েক ঘণ্টার বিলম্ব সত্ত্বেও তার টিম জাপোরিঝিয়া পরমাণু কেন্দ্র পরিদর্শনে বদ্ধপরিকর।

জাপোরিঝিয়া পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরো ইউরোপের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র।

জাপোরিঝিয়া শহরটির নিয়ন্ত্রণ যদিও এখনো ইউক্রেনের হাতে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির অবস্থান ৩৪ কিলোমিটার দূরে নিপার নদীর অপর তীরে। এই কেন্দ্রটির নিয়ন্ত্রণ রুশ সামরিক বাহিনীর হাতে।

অন্যান্য খবর:

'পক্ষপাতহীন' রিপোর্ট চায় রাশিয়া

পরিদর্শক দল পরমাণু কেন্দ্রে এসে পৌঁছানোর আগে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেছেন, জাতিসংঘের এই পরিদর্শকরা একটি 'পক্ষপাতহীন' রিপোর্ট দেবে বলে মস্কো আশা করে।

তিনি বলেন, পরিদর্শক দলের জাপোরিঝিয়া কেন্দ্র পরিদর্শন যেন নিরাপদে সম্পন্ন হয়, সেটা নিশ্চিত করার জন্য রাশিয়া কাজ করে যাচ্ছে।

"এই পরমাণু কেন্দ্র যেন নিরাপদ থাকে, যাতে নিরাপদে চালানো যায়, সেজন্যে আমাদের সাধ্যের মধ্যে যা যা করা দরকার, তা আমরা করছি।"

জাপোরিঝিয়া কেন্দ্রে সম্ভাব্য দুর্ঘটনার আশংকায় ইউক্রেনের জরুরি উদ্ধার কর্মীরা মহড়া দিচ্ছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জাপোরিঝিয়া কেন্দ্রে সম্ভাব্য দুর্ঘটনার আশংকায় ইউক্রেনের জরুরি উদ্ধার কর্মীরা মহড়া দিচ্ছে

জাতিসংঘ পরিদর্শকদের সবচেয়ে কঠিন মিশন

জাপোরিঝিয়া পরিদর্শনে যাওয়া জাতিসংঘ পরিদর্শকদের এই মিশনকে সংস্থাটির ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন মিশন বলে বর্ণনা করা হচ্ছে।

এই কেন্দ্রটির অবস্থান দক্ষিণ ইউক্রেনের একটি সক্রিয় যুদ্ধাঞ্চলে। সেখানে পৌঁছাতে জাতিসংঘের পরিদর্শকদের বহরকে একটি তথাকথিত "ধূসর অঞ্চল" পার হয়ে যেতে হয়েছে, যেটি যুদ্ধরত দুই পক্ষের সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে।

জাতিসংঘ মিশনের নেতৃত্বে থাকা রাফায়েল গ্রসি স্বীকার করেছেন যে এখানে অনেক মারাত্মক ঝুঁকি আছে। কিন্তু তারপরও তাদেরকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ সম্পন্ন করতে হবে।

এই মিশনে আছেন মোট ১৪ জন পরিদর্শক। তারা লড়াইয়ের কারণে জাপোরিঝিয়া পরমাণু কেন্দ্রের কী ক্ষতি হয়েছে তা যাচাই করে দেখবেন এবং ইউক্রেনের যে টেকনিশিয়ানরা এখনো কেন্দ্রটি চালু রেখেছে তাদের সাক্ষাৎকার নেবেন।

কিন্তু পরমাণু কেন্দ্রে তারা কতক্ষণ সময় আসলে কাটাতে পারবেন, তা পরিষ্কার নয়।

রাফায়েল গ্রসি বলেছেন, তিনি আশা করছেন অন্তত কয়েকদিন তারা পরমাণু কেন্দ্রটি ঘুরে দেখতে পারবেন, যদিও রাশিয়ার নিয়োগ করা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা বড়জোর এক বা দুদিন সেখানে থাকতে পারবেন।

রুশ অধিকৃত জাপোরিঝিয়া পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, রুশ অধিকৃত জাপোরিঝিয়া পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র

তাদেরকে পরমাণু কেন্দ্রে কতখানি পর্যন্ত প্রবেশাধিকার দেয়া হবে, সেটাও পরিষ্কার নয়।

ইউক্রেনে কী ধরনের পরমাণু দুর্ঘটনার ঝুঁকি আছে

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গত কিছুদিন ধরেই তার দেশে একটি বড় ধরনের পরমাণু বিপর্যয়ের ঝুঁকির কথা বলছেন। বিশেষ করে জাপোরিঝিয়া কেন্দ্রের আশে-পাশে যেভাবে লড়াই চলছে, তার কারণে। ইউক্রেনে আসলে এরকম ঝুঁকি কতটা আছে? বিবিসির নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদদাতা ফ্রাংক গার্ডনার তিনটি ঝুঁকির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করছেন:

১. তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানোর ঝুঁকি

জাপোরিঝিয়া পরমাণু কেন্দ্রে ছয়টি পরমাণু চুল্লি রয়েছে। এগুলো বেশ সুরক্ষিত। ১৯৮৬ সালে চেরনোবিলের যে পরমাণু চুল্লি বিস্ফোরিত হয়েছিল, তার তুলনায় এগুলোর ডিজাইন অনেক বেশি নিরাপদ।

তবে এই চুল্লিকে ঠাণ্ডা রাখার জন্য সেখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজন হয়। যদি সেখানে কিছু সময়ের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, পরমাণু কেন্দ্রের তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের ক্ষতি হতে পারে, এবং এর ফলে চারপাশের পরিবেশে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার আশংকা আছে।

এখন জাপোরিঝিয়ায় বাতাস বইছে উত্তর দিক থেকে। শুক্রবার এটি ঘুরে যাবে উত্তর-পূর্বদিকে। এর ফলে সেখানে যদি কোন দুর্ঘটনা ঘটে, তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে যাবে ওডেসার দিকে।

২. কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র

রাশিয়া এখন যে সামরিক ডকট্রিন অনুসরণ করে, তাতে যুদ্ধক্ষেত্রে ১৫ কিলোটন পর্যন্ত 'ট্যাকটিকাল' বা কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। একটি ফুটবল স্টেডিয়াম বা এক হতে দুই মাইলের মধ্যে সব ধ্বংস করে দেয়ার জন্য এরকম একটি অস্ত্র যথেষ্ট।

এখনো পর্যন্ত অবশ্য এরকম ইঙ্গিত নেই যে রাশিয়া এরকম অস্ত্র ব্যবহার করবে। কিন্তু এই যুদ্ধে যদি রাশিয়া খুব খারাপ অবস্থায় পড়ে, তখন প্রেসিডেন্ট পুতিন আসলে কী নির্দেশ দিতে পারেন, সেটা কেউ জানে না।

৩. পারমাণবিক মারণাস্ত্র

এগুলো হচ্ছে মহা-বিপর্যয় সৃষ্টি করা যায় যে ধরনের অস্ত্র দিয়ে, সেধরনের মারণাস্ত্র। এরকম একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা বা পরমাণু বোমা দিয়েই একটি বিশাল নগরী ধ্বংস করে দেয়া সম্ভব। এরকম অনেক মারণাস্ত্র যে তাদের আছে, সেটি মনে করিয়ে দিতে পছন্দ করেন প্রেসিডেন্ট পুতিন।

যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং ফ্রান্সেরও এরকম অনেক পরমাণু অস্ত্র আছে। তবে ১৯৪৫ পর আজ পর্যন্ত কেউ ক্রোধের বশে এরকম অস্ত্র ব্যবহার করেনি। সোভিয়েত আমলে ইউক্রেনে যত পরমাণু অস্ত্র ছিল, তার সবগুলোই তারা ১৯৯০ এর দশকে রাশিয়াকে ফেরত দিয়েছিল। এখন তারা বলছে, সেটি ছিল একটা বিরাট ভুল।

আরও পড়ুন: