ইতিহাসের সাক্ষী: তিউনিসিয়া মুসলিম বিশ্বের প্রথম দেশ যেখানে তালাক ও গর্ভপাত বৈধ করে আইন করা হয়

মুসলিম বিশ্বে তিউনিসিয়া ছিল প্রথম দেশ যেখানে ১৯৫৬ সালে গর্ভপাত ও বিবাহ বিচ্ছেদ আইনসম্মত করা হয়। নারী পুরুষ নির্বিশেষে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহারও দেশটিতে চালু করা হয় একই সময়ে।

তিউনিসিয়া ১৯৫৬ সালের অগাস্টে স্বাধীনতা অর্জনের পর নতুন এই দেশটির প্রেসিডেন্ট হাবিব বুরগিবা একগুচ্ছ নতুন আইন প্রণয়ন করেন, যা নারীদের জীবনে বিপ্লব এনেছিল।

নারীদের ভোটদান এবং শিক্ষার অধিকারও দেন তিনি। তিনি বলেছিলেন স্বাধীনতা-উত্তর তিউনিসিয়া গঠনে নারীদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

প্রেসিডেন্টের জারি করা আইনের বলে তিউনিসিয়ার নারীরা শুধু যে ভোটের অধিকার অর্জন করেন তাই নয়, ব্যবসা-বাণিজ্যের সবক্ষেত্রে পুরুষের সাথে পাল্লা দিয়ে চলার অধিকারও নারীরা পান।

যে দেশে তালাক দেবার একচেটিয়া অধিকার ছিল শুধু পুরুষের, সেখানে নারীরাও আদালতে গিয়ে বিয়ে ভাঙার জন্য মামলা দায়ের করার অধিকার পান।

সে সময় কোন মুসলিম দেশে নারীদের ইউরোপীয় নারীদের সমান অধিকার অর্জন করার ঘটনা ছিল ঐতিহাসিক এবং দেশটির নারীদের জন্য নজিরবিহীন এক পরিবর্তনের সূচনা।

নারীদের জন্য 'সবচেয়ে বড় অর্জন'

ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে দেশটির স্বাধীনতা অর্জনের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন হাবিব বুরগিবা এবং ১৯৫৬ সালে দেশ স্বাধীন হবার পর তিনিই তিউনিসিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তিউনিসিয়ার জাতীয়তাবাদী নেতা হাবিব বুরগিবা ফ্রান্সে নির্বাসন থেকে দেশে ফেরেন ১৯৫৫ সালে।

মি. বুরগিবা ছিলেন সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তিনি তিউনিসিয়ায় রাষ্ট্র গঠনে নারীদের সমান অধিকারকে গুরুত্ব দেন।

প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি পুরুষ ও নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যাপকভিত্তিক বেশ কিছু আইন ঘোষণা করেন।

বিবিসির নিদাল আবু মুরাদকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিউনিসিয়ান উইমেন্স ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সাঈদা আল-গাইয়েদ বলেন, এই যুগান্তকারী সমান অধিকার আইনটি ছিল তিউনিসিয়ার নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন।

"প্রেসিডেন্ট বুরগিবা সে সময় বলেছিলেন তিনি শুধু তিউনিসিয়ার স্বাধীনতার জনকই নন, তিনি তিউনিসিয়ায় নারীমুক্তিরও জনক," জানান মিজ আল-গাইয়েদ।

"প্রেসিডেন্ট বুরগিবাকে আমি চিনতাম ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের দিনগুলো থেকে। আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। কারণ আমি তখন ছিলাম সাংবাদিক এবং তিউনিসিয়ান উইমেন্স ইউনিয়নের অন্যতম একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।"

প্রেসিডেন্ট বুরগিবা মিজ আল-গাইয়েদকে বলেছিলেন নতুন এই আইন তিউনিসিয়ার জনগণের সামনে তুলে ধরতে।

বিবিসিকে এই নেত্রী বলেন, তারা তখন সব সময় প্রেসিডেন্ট বুরগিবার সঙ্গে বৈঠক করতেন, এই আইন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করতেন।

"আমাদের সব সময় মনে হতো তার নেতৃত্বে আমরা একটা বিরাট দায়িত্ব পালন করছি। এটা আমাদের কর্তব্য। আমাদের ওপর তার ছিল অগাধ বিশ্বাস।"

তিউনিসিয়ার নারী আন্দোলন

প্রেসিডেন্ট বুরগিবার প্রণীত নতুন আইন তিউনিসিয়ার নারীদের জীবন সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। সাঈদা আল-গাইয়েদ বলছেন এই আইন আসার আগে বেশিরভাগ তিউনিসীয় নারীই বাইরের জীবনে কোনরকম অংশ নিতে পারতেন না।

"সে সময় নারীদের বাসার বাইরে যাওয়া সহজ ছিল না," বলছিলেন তিনি। "তারা যেতেন বিয়ের দাওয়াতে। দাফনে যোগ দিতেন, কিন্তু কোন বৈঠকে যোগ দিতে বা জমায়েতে অংশ নিতে বাইরে যাওয়া মেয়েদের জন্য ছিল খুবই কঠিন।"

কিন্তু তিউনিসিয়ায় নারী আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

সাঈদা আল-গাইয়েদ বলেন, বিংশ শতাব্দীর শুরুতেও দেশটিতে নারীর অধিকারের পক্ষে যারা কথা বলেছেন, তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন তিউনিসিয়ার সুপরিচিত মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিদ তাহের হাদ্দাদ। তার যুক্তি ছিল যে ইসলাম নারী স্বাধীনতার পক্ষে।

"তাহের হাদ্দাদ বলতেন লেখাপড়া শেখা, কাজ করা এবং দমনমূলক পরিবেশ থেকে নিজেকে রক্ষা করার ব্যাপারে নারীর স্বাধীন অধিকার রয়েছে। কিন্তু এই বক্তব্যের জন্য মি. হাদ্দাদকে লাঞ্ছনা ও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। আমরা বলতাম নারীদের জন্য তিনি শহীদ হয়েছেন। তিনি কপর্দকশূন্য অবস্থায় মারা যান," বলছিলেন সাঈদা আল-গাইয়েদ।

সাঈদা নিজেও নারীদের অধিকতর অধিকার আদায়ের দাবিতে রাস্তায় বিক্ষোভ করেছেন।

'লং লিভ তিউনিসিয়া'

প্রেসিডেন্ট বুরগিবা যখন নতুন ব্যক্তিগত অধিকার আইন ঘোষণা করেন, তখন দেশের নারীরা আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন।

"নতুন আইন যখন ঘোষণা করা হল, তখন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে আমি অন্য নারীদের নিয়ে পথে নামলাম। আমরা পতাকা হাতে ধ্বনি দিতে লাগলাম - লং লিভ তিউনিসিয়া- তিউনিসিয়া দীর্ঘজীবী হোক।"

এই আইনের খবর নারীদের কাছে পৌঁছে দিতে প্রেসিডেন্ট বুরগিবা যখন তার সাহায্য চেয়েছিলেন, তখন খুবই খুশি হয়েছিলেন মিজ আল-গাইয়েদ। তবে তিনি জানালেন প্রথম দিকে কাজটা বেশ কঠিন ছিল।

"আমরা শহরতলীতে যেতাম, ফসল ওঠার মরশুমে। কারণ সে সময় মহিলারা বেশি সংখ্যায় মাঠে জড়ো হতেন। নতুন আইনের কথা তাদের কাছে তুলে ধরতাম, বোঝাতাম। কারণ মেয়েদের জন্য লেখাপড়া সঠিক কি-না এবং পরিবার-পরিকল্পনার দায়িত্ব কার তা নিয়ে তাদের মনে সংশয় ছিল।"

সচেতনতা অভিযান

তাদের সংগঠন উইমেন্স ইউনিয়ন এই আইনে দেয়া নতুন অধিকার সম্পর্কে নারীদের সচেতন করতে বিশেষ স্কুল চালাত।

রাজধানী তিউনিসের বাইরে শহরতলীতে বিশেষ স্কুল বসিয়ে তারা তরুণী ও নারীদের বোঝাতেন নতুন আইনের আলোকে তাদের জীবন কীভাবে বিকশিত হতে যাচ্ছে।

তিউনিসিয়ান উইমেন্স ইউনিয়ন তিউনিসিয়ার বিভিন্ন শহরতলীতে এ ধরনের ১৩টি স্কুল খুলেছিল। সংগঠনটি ছিল দেশটিতে নারী অধিকার বিষয়ে বেশ জঙ্গী ও শক্তিশালী কণ্ঠ।

ইতিহাসের সাক্ষীর পুরনো পর্ব:

এই স্কুলগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল, নতুন আইন নিয়ে নারীদের মনে যেন কোনরকম সন্দেহ না থাকে, সেটা নিশ্চিত করা।

তারা বোঝাতেন নারীরা এখন আর কারও দাস নন। একজন পুরুষের যেসব অধিকার আছে, সেই একই অধিকার নারীরও আছে।

তরুণীদের তারা বলতেন: "নারীদের রক্ষার জন্যই এই আইন। এখন মেয়েদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাবারা আর জোর করে বিয়ে দিতে পারবেন না। প্রেসিডেন্ট বুরগিবা চান নারীরা যদি লেখাপড়া করতে আগ্রহী হয়, তাহলে পরিবার যে আর তাতে বাধা দিতে পারবে না - এটা যেন নারীরা বুঝতে পারেন, বিশ্বাস করেন।"

জন্মনিয়ন্ত্রণ ও গর্ভপাত

গর্ভনিরোধ যে মেয়েদের অধিকার, এই স্কুলগুলোতে সে বিষয়ে নারীদের শিক্ষা দেয়া হতো। গর্ভপাতের অধিকারও যে তাদের আছে, সে কথা তুলে ধরা হতো।

এই স্কুলে তিন মাস থাকার পর তরুণীরা ফিরে যেতেন নিজেদের গ্রামে আর গ্রামের অন্যদের এই আইন সম্পর্কে সচেতন করতেন।

তিউনিসিয়ার এই শহরতলী এলাকাগুলো থেকেই সংগঠনটির আধুনিকমনস্ক কর্মীরা দেশটিতে যুগ যুগ ধরে পুরুষশাসিত সমাজের প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রাম লড়েছেন, বলছিলেন মিজ আল-গাইয়েদ।

"আমরা নারীদের চেয়ে পুরুষদের সঙ্গেই কথা বলতাম বেশি। কারণ আমাদের বাধা দিতেন বেশি পুরুষরাই। আমরা পুরুষদের সাথে দেখা করার জন্য বেশি সময় ব্যয় করতাম। তাদের কাছে এই আইন ব্যাখ্যা করতাম।"

একবার এমন হল, তিনি স্মরণ করছিলেন, তার এক নারীবাদী বন্ধু ও সংগঠনের কর্মী রাযিয়া আল-হাদ্দাদ একটি এলাকায় গিয়ে দেখেন তার সভায় একজনও মহিলা আসেননি।

"রাযিয়া কারণ জানতে চাইলে তাকে পুরুষরা বললেন - প্রথমে পুরুষদের কাছে এই আইন ব্যখ্যা করতে হবে। আমাদের বোঝান- তারপর নারীরা বুঝবে। তিনি তখন ওই পুরুষদের বলেন- এই আইনে পুরুষদের কোথাও খাটো করা হয়নি। সেটা এই আইনের লক্ষ্য নয়," বলছিলেন সাঈদা।

এ কথার পর ওই পুরুষরা ঘরের মেয়েদের সাথে নিয়ে এসেছিলেন, আইন কী বলছে তা শুনতে।

ইসলাম ও আইন

সাঈদা আল-গাইয়েদ বলেন, প্রেসিডেন্ট বুরগিবা বিরোধিতার জন্য প্রস্তুত হয়েই কাজে নেমেছিলেন।

বিরোধীদের মোকাবেলা করতে আইন প্রণয়নের আগেই তিনি মুসলিম স্কলারদের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন, যাতে এই আইন ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়।

মুসলিম বিশ্বে তখন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র তুরস্কের পর তিউনিসিয়া ছিল দ্বিতীয় দেশ, যেখানে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়।

"সে সময় মৌলভীদের কেউ কেউ আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট বুরগিবার আস্থা ছিল যে তিনি সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। কারণ তিনি ধর্মীয় চিন্তাবিদদের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। তারা বলেছিলেন কোরআনে বহু বিবাহ নিয়ে একটি বিধান আছে যেখানে বলা হয়েছে আপনি যদি সব স্ত্রীর সাথে সমান আচরণ না করতে পারেন, তাহলে একজন স্ত্রী রাখবেন।

"প্রেসিডেন্ট এমনকি একজন মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিদকে বলেছিলেন আরব বিশ্বকে এই নতুন আইন সম্পর্কে অবহিত করতে এবং ইসলামের আলোকে এই আইন থেকে তিউনিসিয়ার নারীরা যেভাবে লাভবান হবে, সেটা ব্যখ্যা করতে," বিবিসিকে বলেন সাঈদা আল-গাইয়েদ।

বহু বিবাহ নিষিদ্ধ এবং গর্ভপাত আইনসম্মত করার এই আইনী বিধান ছিল মুসলিম বিশ্বে নজিরবিহীন।

সে সময় বিবিসির খবরে বলা হয়: "তিউনিসিয়ায় বিশাল পরিবারগুলোর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য নারীদের রক্ষাকবচ দেয়া হয়েছে। তিউনিসিয়া পৃথিবীর প্রথম মুসলিম দেশ যেখানে নারীরা গর্ভপাতের অধিকার পেয়েছেন। নতুন আইনে বলা হয়েছে কোন তিউনিসীয় নারী চারটি সন্তান নেবার পর স্বামীর অনুমতি ছাড়াই গর্ভপাত করাতে পারবেন। আর সেই গর্ভপাতের খরচ দেবে দেশটির সরকার।"

সাঈদা আল-গাইয়েদ বলেন, মেয়েদের দমিয়ে রাখাই ছিল তিউনিসিয়ায় দীর্ঘদিনের প্রচলিত পারিবারিক প্রথা। এই আইন তাদের হাতে তুলে দিয়েছিল স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার।

প্রেসিডেন্ট বুরগিবা চেয়েছিলেন নারীরা যেন বুঝতে পারেন সমাজে তাদেরও সম্মান নিয়ে বাঁচার অধিকার রয়েছে। নিজেদের ক্ষমতার ওপর যেন তারা বিশ্বাস রাখতে পারেন।

সাঈদা আল-গাইয়েদ বলেন, দেশটির আধুনিকমনস্ক প্রেসিডেন্ট বুঝেছিলেন যে স্বাধীনতা-উত্তর তিউনিসিয়ায় সমাজ গঠনে নারীর ক্ষমতার কতখানি প্রয়োজন। নারীদের পাশে নিয়েই তিনি একটা সুস্থ ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

বিবিসি বাংলায় আরও দেখতে পারেন: