দুর্ঘটনা: গার্ডার ধসে নিহতের ঘটনায় দায় এড়াচ্ছেন প্রকল্প কর্মকর্তারা

ছবির উৎস, Khalid Faraizi
- Author, সানজানা চৌধুরী
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ঢাকার উত্তরায় চলন্ত প্রাইভেট কারের ওপর ফ্লাইওভারের গার্ডার ধসে পাঁচ জন নিহতের ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হলেও এ কাজে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রকল্প কর্মকর্তারা কেউ দায় নিতে চাইছেন না।
ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে শুধুমাত্র ঠিকাদারদের অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং এরইমধ্যে ক্রেনের চালকসহ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নয় কর্মচারীকে আটক করেছে র্যাব।
এদিকে দুর্ঘটনার তিন দিন পেরোলেও নির্মাণ প্রকল্পে নিরাপত্তা কিভাবে নিশ্চিত হবে সেই বিষয়ে এখনও কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।
এ ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে এ ধরণের উন্নয়ন প্রকল্পের সার্বিক নিরাপত্তার দিকটি নিয়ে।
নির্মাণকাজে সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে দুই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কাজ শুরুর আগে এবং কাজ চলাকালে।
এছাড়া দুর্ঘটনা ঘটে গেলে এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা থাকার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এর কোন ব্যবস্থার দেখা মেলেনি বিআরটি প্রকল্পে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত এ ধরণের কাজ চলাকালে সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা কী কী নেওয়া হয়েছে, সেটা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে লিখিতভাবে জানাতে হয়।
তাদের পদক্ষেপে পরামর্শক এবং প্রকল্প কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হলেই ঠিকাদাররা বিল পেয়ে থাকেন।
অথচ বিআরটির প্রকল্পে এতদিন অরক্ষিত অবস্থায় কাজ চললেও বিল তোলা হয়েছে নিয়মিত।
বিআরটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সফিকুল ইসলাম প্রকল্পের সার্বিক দায়িত্বে থাকলেও তিনি দায়িত্বে অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ বার বার পাশ কাটিয়ে যান।
ঘুরেফিরে ওই ঘটনায় তিনি মূলত দায়ী করেছেন প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না গ্যাঝুবা গ্রুপ কর্পোরেশনকে।
প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে একটি মামলাও দায়ের হয়েছে।
আরও পড়তে পারে:

ছবির উৎস, Monir Hossain Jibon
বুধবার রাতে র্যাব বিভিন্ন জেলায় অভিযান চালিয়ে দুর্ঘটনা কবলিত ক্রেনের চালক, তার সহকারী এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মীসহ নয়জনকে গ্রেপ্তার করে।
এক প্রেস ব্রিফিংয়ে র্যাব জানায়, তারা প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছেন দুর্ঘটনার দিন ওই ফিটনেসবিহীন ক্রেনটি চালাচ্ছিলেন হেলপার, দূর থেকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন মূল অপারেটর।
ওই হেলপারের এর আগে ক্রেন চালানোর কোন ধরণের প্রশিক্ষণ ছিল না।
আবার মূল অপারেটরের হালকা যান চালানোর লাইসেন্স থাকলেও ক্রেনের মতো বিশেষায়িত ভারী যানের লাইসেন্স ছিল না বলে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়েছে।
কিন্তু এ ধরণের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার পেছনে শুধু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর দায় চাপিয়ে সরকারি কর্মকর্তারা নিজেদের দায় এড়িয়ে চলতে পারেন না বলে জানিয়েছেন পুরকৌশল বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান।
তিনি বলেন, ঠিকাদার ফাঁকি দিচ্ছে কিনা, কাজ নিয়ম মেনে মানসম্মত উপায়ে চলছে কিনা তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পরামর্শক ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার। এবং এজন্য তাদের পেছনে বড় অংকের ব্যয় হচ্ছে।
তাই তাদের দায়িত্ব পালনের এই গাফিলতির বিষয়টি তদন্তে উঠে আসা দরকার বলে তিনি মনে করেন।
তবে এই ঘটনা তদন্তে যে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে সেখানে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা থাকায় সেই তদন্ত কতোটা নিরপেক্ষ হবে সেটা নিয়েও তুলেছেন মি. হাদিউজ্জামান।
তিনি বলেন, "তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ। এখানে যাদের জবাবদিহিতা দেয়ার কথা তারাই যদি কমিটিতে জায়গা পায় তাহলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণটি বের হয়ে আসবে না।"
সোমবারের ওই ঘটনার পর পর উত্তরা অংশের নির্মাণ কাজ বন্ধ করা হলেও এখনও বিআরটি প্রকল্পের অন্যান্য কাজ চলমান আছে।

ছবির উৎস, MONIR HOSSAIN JIBON
বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:
এর আগেও বিআরটির প্রকল্পে দুটি দুর্ঘটনায় এক শ্রমিক নিহত ও ছয় জন আহত হলেও সেগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত, অভিযুক্তদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা বা প্রকল্প এলাকায় নিরাপত্তা বিধানে কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।
তবে পাঁচ জন মৃত্যুর এই ঘটনা আলোচনায় আসায় প্রকল্প কাজে নিরাপত্তা নিয়ে বিআরটি, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সেতু বিভাগ, রাজউক, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য অংশীদারদের সাথে সিটি কর্পোরেশনের বৃহস্পতিবার আলোচনায় বসার কথা ছিল। সেটা রোববার পেছানো হয়েছে।
সেখানে মূলত জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়ার কথা জানান ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রেজা।
"সাধারণ মানুষের ভোগান্তি করে, কোন সেফটি, সিকিউরিটি না দিয়ে তো এভাবে নির্মাণ কাজ চলতে পারে না। নিরাপত্তা নেই বলেই তো এই অবস্থা। আমরা এর আগেও প্রকল্প পরিচালকদের যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বলেছি। কিন্তু সব এখতিয়ার তো সিটি কর্পোরেশনের নেই," তিনি বলেন।
বুধবার বিকেলে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছে এই প্রকল্পের মূল অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এডিবি।
এ সময় প্রকল্পের কাজে সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত পুরো কাজ বন্ধ রাখার কথা বলেছে এডিবি।








