রনবীর সিং: 'কামসূত্র' রচিত হয়েছে যে দেশে, সেখানে বলিউড তারকার নগ্ন ছবি নিয়ে এত হৈচৈ কেন?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, সৌতিক বিশ্বাস
- Role, ভারত সংবাদদাতা
"আমি এক হাজার মানুষের সামনে নগ্ন হতে পারি… কিন্তু ব্যাপারটা হচ্ছে কি, তারা অস্বস্তি বোধ করবেন," সম্প্রতি 'দ্য পেপার' নামের এক ম্যাগাজিনকে বলছিলেন বলিউড তারকা রনবীর সিং।
বাস্তবে আসলে ঠিক এরকমটাই ঘটেছিল, যখন সম্প্রতি রনবীর সিং এই একই ম্যাগাজিনের জন্য নগ্ন হয়ে পোজ দিলেন। তার এসব ছবি ছাপা হয়েছিল ম্যাগাজিনটির পাতা জুড়ে। সাথে সাথে সোশ্যাল মিডিয়া যেন একই সঙ্গে এর প্রশংসায় আর ধিক্কারে বিস্ফোরিত হলো। তবে প্রশংসার চাইতে ধিক্কারই যেন অনেকগুণ বেশি।
রনবীর সিং এর নগ্ন ছবির মিম আর কৌতুকে ভেসে যেতে লাগলো সোশ্যাল মিডিয়ার টাইমলাইন। অনেকেই অভিযোগ করলেন এই তারকা পুরুষ জাতিকে কলঙ্কিত করেছেন। সেখানেই শেষ নয়, তার বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ পর্যন্ত দায়ের করা হলো, কারণ তিনি "নারীদের অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছেন।"
রনবীর সিং আর দশজন গড়পড়তা পুরুষ তারকার মতো নন। তিনি অসীম প্রাণশক্তিতে ভরপুর এবং বর্ণাঢ্য এক ব্যক্তিত্ব, আর তার ফ্যাশনের স্টাইলও একটু খ্যাপাটে- ভেলভেটের প্যান্ট, টার্টল-নেক সোয়েটার, অলংকার- ভোগ ম্যাগাজিনের ভাষায়, তিনি এমন এক ধরণের 'নন-বাইনারি' স্টাইল অনুসরণ করেন, যাকে এখন ফ্যাশন জগত লুফে নিচ্ছে।
দ্য পেপার ম্যাগাজিনের ভাষায়, রনবীর সিং "সনাতনী ভারতীয় সমাজে 'পুরুষত্ব' বলতে যত রকমের গতানুগতিক বদ্ধমূল ধারণা আছে, তার সবগুলিকেই আসলে চ্যালেঞ্জ করেছেন।"
"একজন আদর্শ পুরুষের শরীর যেরকম ভাবা হয়, সেটা তার আছে। কিন্তু তিনি এমন সব পোশাক পরেন, যেন তিনি এক উভলিঙ্গের মানুষ। তিনি গোঁড়া নন, এবং যৌনতা নিয়ে খোলাখুলি কথা-বার্তা বলেন। ভারতে পুরুষত্ব বলতে যা বোঝানো হয়, রনবীর সিং-কে তার মধ্যে আঁটানো যাবে না। এটা সমাজে বিরাট উদ্বেগ তৈরি করছে, বহু মানুষ তাকে নিয়ে সাংঘাতিক অস্বস্তিতে ভুগছেন," বলছিলেন রাহুল সেন, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের টাফট ইউনিভার্সিটিতে "সাহিত্য এবং যৌনতা" নিয়ে পিএইচডি গবেষণা করছেন।

ছবির উৎস, Instagram
রনবীর সিং এর নগ্ন ছবির ব্যাপারে যেরকম বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তাকে অনেকে ভারতীয় সমাজ নীতি-নৈতিকতা নিয়ে কি সাংঘাতিক বিভ্রান্তিতে আছে, তার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন। ভারতীয়দের মধ্যে একই সঙ্গে রক্ষণশীল আর উদার দৃষ্টিভঙ্গির যে এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ আছে, রনবীর সিং-কে ঘিরে বিতর্ক যেন আবার সেদিকেই আলোকপাত করেছে।
ভারতের বহু ছোট শহরের মন্দির গাত্রে পর্যন্ত কামোত্তেজক দৃশ্যের শৈল্পিক চিত্র খোদাই করা আছে। বিশ্বে যৌনতার সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থগুলোর একটি 'কামসূত্র' রচিত হয়েছে ভারতে।
ভারতীয় মডেল এবং নৃত্যশিল্পী প্রতিমা বেদী মুম্বাই এর এক সাগরতীরে নগ্ন হয়ে দৌড়ে একটি ফিল্ম ম্যাগাজিনের কভার ছবির জন্য পোজ দিয়েছিলেন বহু আগে সেই ১৯৭৪ সালে।

ছবির উৎস, Alamy
ভারতে নগ্নতা একেবারেই বিরল কোন ব্যাপার নয়। গায়ে ছাই মেখে হিন্দু সাধুরা নগ্ন হয়ে কুম্ভমেলার মতো ধর্মীয় উৎসবে যোগ দেন নিয়মিত।
মিশিল বাস 'মাস্কুলার ইন্ডিয়া' নামে একটি বই লিখেছেন। তিনি বলছেন, ইনস্টাগ্রাম এবং টিকটকে এরকম বহু ভারতীয় পুরুষের ছবি আর ভিডিও দেখা যাবে, যারা খুবই সংক্ষিপ্ত অন্তর্বাসে নিজেদের শরীর যৌন উত্তেজক ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন।
"এদের কারো কারো তো হাজার হাজার, এমনকি লাখ লাখ ফলোয়ার আছে। এদের কারও কারও ছবির নীচে অশ্লীল মন্তব্য দেখা যাবে। কিন্তু সাধারণত এসব ছবিতে লোকে নানা ধরণের ইমোজি দিয়ে তারা যে কতটা চমৎকৃত হয়েছে, সেটাই প্রকাশ করেছেন", বলছেন তিনি।
আর বলিউডের ছবিতে তারকারা অ্যাকশন দৃশ্যে তাদের গায়ের শার্ট খুলে অংশ নিচ্ছেন- এটা তো হরহামেশাই ঘটছে।
তবে মিশিল বাস বলেন, ভারতীয় সমাজে পুরুষদের শরীর দেখানোর ব্যাপারটি যতখানি পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য বলে মনে করা হয়, রনবীর সিং হয়তো সেখান থেকে অনেক বেশি বিচ্যুত হয়েছেন। তবে রনবীর সিং এর এসব ছবিতে তিনি ১৯৭০ এর দশকের সৌন্দর্য-বোধের ইঙ্গিতের পাশাপাশি আরেকটি বিষয় দেখতে পাচ্ছেন- পুরুষরা তাদের নরম বা মেয়েলি দিকের প্রকাশ ঘটালে সেটাকে যেরকম অস্বাভাবিক বলে ভাবা হয়, তিনি যেন সেটি নিয়ে উপহাস করছেন।
অনেকে অবশ্য রনবীর সিং এর ছবি নিয়ে বিতর্ক একেবারেই নিরর্থক বলে মনে করেন।
ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় এক লেখক শোভা দে বলেন, "আমি তো বুঝতেই পারছি না এই বিতর্ক কী নিয়ে। নাংগাপান (নগ্নতার হিন্দি শব্দ) তো ভারতে নতুন কিছু নয়। নিজের শরীর নিয়ে রনবীর সিং তার ইচ্ছেমত যা খুশি করার অধিকার রাখেন।"

ছবির উৎস, Getty Images
অথচ হিন্দু দেবীর নগ্ন ছবি বা নারীর স্তনের ওপর পুরুষের হাতের দৃশ্য আঁকার জন্য ভারতে এমএফ হুসেন এবং আকবর পদমশির মতো নামী শিল্পীদের আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে। নগ্নতার দৃশ্য থাকায় সিনেমার সেটে গিয়ে ভাংচুর করা হয়েছে, নাটকের মঞ্চ তছনছ করা হয়েছে।
নগ্ন ছবির পোজ কিন্তু রনবীর সিং-ই যে প্রথম দিয়েছেন, তা নয়।
মিলিন্দ সোমান এবং মধু সাপ্রে ১৯৯৫ সালে নগ্ন শরীরে অজগর পেঁচিয়ে একটি জুতার বিজ্ঞাপনের জন্য ছবির পোজ দিয়েছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগে মামলা করা হয়, আদালতে সেই মামলা চলেছে ১৪ বছর ধরে।
"যতদিনে এই মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে, ততদিনে এই জুতার ব্রান্ড তাদের পাততাড়ি গুটিয়েছে, মধু সাপ্রে ভারত ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, আর সেই অজগরেরই বা কী হয়েছে কে জানে", বলছিলেন ব্রান্ড স্ট্রাটেজিস্ট আম্বি পরমেশ্বরন।
ভারতে বিজ্ঞাপনের মান তদারকির কাজ যাদের, সেটির অফিস মুম্বাইতে। তাদের কাছে "অশ্লীল বিজ্ঞাপন" নিয়ে নিয়মিতই অভিযোগ আসে। গত নভেম্বরে তাদের কাছে দুটি অভিযোগ এসেছিল। একটি বিজ্ঞাপন সম্পর্কে অভিযোগে বলা হয়, এটিতে নারীদেরকে এমন অন্তর্বাসে দেখা যাচ্ছে, যাতে তাদের শরীর দৃশ্যমান। আরেকটির ব্যাপারে অভিযোগ করা হয়েছে - "এটি কুৎসিত, কারণ এতে দুটি মেয়ে তাদের অন্তর্বাস দেখানোর জন্য পরনের টি-শার্ট খুলছে।"
কর্তৃপক্ষ অবশ্য দুটি অভিযোগই নাকচ করে দিয়েছে।
"এখানে অনেক বেশি স্বাধীনতা, আবার বিভ্রান্তিও অনেক। তারপর তো আছে এই নৈতিক পুলিশের দল। এরা একই সঙ্গে কৌতূহলী, আবার রুচিবাগীশ। আমরা সবাই আসলে এক ধরণের বন্য নৈতিক বিভ্রান্তিতে ভুগছি", বলছেন ব্রিন্দা বোস। তিনি সাম্প্রতিক ভারতীয় সিনেমা এবং সাহিত্যে যৌনতা নিয়ে একটি বই লিখেছেন।
দু্ বছর আগে চেন্নাই এর ফ্যাশন ফটোগ্রাফার জি ভেনকেট রাম এরকম এক নৈতিক বিভ্রান্তির শিকার হয়েছিলেন। তিনি এক তরুণীর নগ্ন ছবি তোলেন, যার গায়ে উল্কি আঁকা ছিল। এই তরুণী ছিলেন একজন শিল্পী, তিনি উল্কি আঁকতেন। নিজের শরীর নিয়ে যে হীনমন্যতায় ভুগতে নেই, সেটি ছিল এই ছবিগুলোর বিষয়।

ছবির উৎস, VENKET RAM
জি ভেনকেট রাম বলেন, সাহস করে তিনি এসব ছবি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেন, সেখানে তার ফলোয়ারের সংখ্যা ৯০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
"বেশিরভাগ মানুষ এসব ছবি পছন্দ করেছিল। তবে অনেকে পছন্দ করেনি। তারা বলেছে, তোমার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আছে, কিন্তু কীভাবে তুমি এই কাজ করলে", বলছেন রাম।
তারপর অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটলো। ইনস্টাগ্রামে এক দিনের মধ্যেই তার আড়াই হাজার ফলোয়ার কমলো, আবার একই দিনে ৮ হাজার বাড়লো।

ছবির উৎস, OTHER
"যেন একটা সুনামি বয়ে যাচ্ছিল। হাজার হাজার মানুষ আমাকে ফলো করছিল, আবার আনফলো করছিল। তবে অনেক বেশি মানুষ ফলো করছিল। টিনএজাররা তো এসব ছবি নিয়ে ছিল উচ্ছ্বসিত। এই অভিজ্ঞতা আমার কাছে একটা ধাঁধাঁর মতো।"
জি ভেনকেট রাম এবছর একটি নতুন সিরিজের জন্য ছবি তুলেছেন, একটির নাম 'বেয়ার উইথ টু মডেলস।' এসব ছবি তিনি ইনস্টাগ্রামে পোস্টও করেছেন। এগুলো বেশ প্রশংসা পেয়েছে, কেউ তাকে ট্রলও করেনি।
তিনি বলছেন, অনেক নারী এবং পুরুষ মডেল এখন নগ্ন হয়ে ছবির পোজ দিতে রাজি, তবে ছবিগুলো নান্দনিক হতে হবে। এখন তিনি আরও কিছু পুরুষের নগ্ন ছবি তুলতে চান।
আরও পড়ুন:
তিনি বলছেন, "সোশ্যাল মিডিয়া এখন সনাতনী মিডিয়া বা বিজ্ঞাপন-চিত্রের চেয়ে অনেক বেশি মুক্তভাবে কাজ প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছে।"
ভিনোদ মেহতা ছিলেন এখন অবলুপ্ত ভারতীয় ম্যাগাজিন ডেবোনেয়ারের সম্পাদক। এটি ছিল অনেকটা প্লেবয় ম্যাগাজিনের মতো। নগ্নতা এবং যৌনতা নিয়ে ভারতীয় সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিটা কেমন- তা বোঝাতে গিয়ে নিজের আত্মজীবনীতে একটি ঘটনার স্মৃতিচারণ করছিলেন তিনি।
ভারতে তখন জরুরী অবস্থা চলছে, সংবাদপত্রের ওপর সেন্সরশিপ জারি করা হয়েছে। ভিনোদ মেহতাকে তলব করা হয় এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দফতরে। তিনি ম্যাগাজিনটির মধ্যভাগের পাতা জুড়ে কী ছবি যাবে, তা দেখতে চান। কারণ সাধারণত মধ্যের কয়েকটি পাতায় নারীদের অর্ধ-নগ্ন ছবি যেত।
ভিনোদ মেহতা তাকে প্রায় আধ ডজন ছবি দেখালেন, এখান থেকেই তিনি যে কোন একটি পরবর্তী সংখ্যায় সেন্টার স্প্রেডে প্রকাশ করবেন বলে পরিকল্পনা করছিলেন।
"মন্ত্রীর চোখ পড়লো সেই ছবিটিতে, যেটি প্রায় ৯০ শতাংশ নগ্ন। তিনি সেটি একপাশে সরিয়ে রাখলেন। তখন আমি জানতে চাইলাম, আমরা কি তাহলে সেন্টার স্প্রেড (ম্যাগাজিনের ঠিক মাঝখানের দুই পাতা জুড়ে ছাপানো ছবি) বাদ দেব? মন্ত্রী যেন রীতিমত আঁতকে উঠলেন। তিনি বললেন, "না, কেবল আরেকটু শালীন কোন ছবি বেছে নিন। তারপর মন্ত্রী আমার অনুমতি ছাড়াই সেই নগ্ন ছবিটি নিজের কাছে রেখে দিলেন," নিজের স্মৃতিকথায় লিখেছেন ভিনোদ মেহতা।








