বেন স্টোকস ইংল্যান্ডের ১৪৫ বছরের ইতিহাসে এক 'অনন্য' অধিনায়ক

ইংল্যান্ড, বেন স্টোকস

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিশ্বের সেটা টেস্ট দলের সাথে ৩-০ তে টেস্ট সিরিজ জিতলো ইংল্যান্ড

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে তিন ম্যাচ টেস্ট সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে ইংল্যান্ডের স্পিনার দুই ইনিংস মিলিয়ে দশ উইকেট নেয়ার পর ইংল্যান্ডের স্পিনার জ্যাক লিচ বিবিসি স্পোর্টকে বলেছেন বেন স্টোকস তাকে বদলে দিয়েছে, অধিনায়ক বেন স্টোকসের সাথে কাজ করে আনন্দ পাচ্ছেন লিচ।

চতুর্থ দিনের খেলা শেষে লিচ বেন স্টোকসকে নিয়ে বলেন, "অধিনায়ক হিসেবে স্টোকসের চিন্তা পরিস্কার। এটা আমাকে বল করতে সাহায্য করে। তার পরিকল্পনা আছে, আমরা তার পরিকল্পনা মেনে চলি। সে অধিনায়ক হিসেবে যা করছে তা অবিশ্বাস্য।"

এই ক'দিন আগেও ইংল্যান্ডের টেস্ট দলের অবস্থা ছিল করুণ, গত বছর নয়টি টেস্ট হেরে প্রায় ২ দশক আগে বাংলাদেশের এক বছরে নয়টি টেস্ট হারার রেকর্ড ছুঁয়েছিল ইংল্যান্ড।

টেস্ট ফরম্যাটে বর্তমান সময়ের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন হয়েও, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ হারের পর ইংল্যান্ডের নিয়মিত টেস্ট অধিনায়ক জো রুট সরে দাঁড়ান, এরপর ইংল্যান্ডের ক্রিকেট বোর্ড নেতৃত্বের দায়িত্ব দেন বেন স্টোকসের কাঁধে, যিনি নিজের অধিনায়কত্বের প্রথম সিরিজেই আক্রমণাত্মক ভঙ্গিমায় দলকে জয় এনে দিয়েছেন বর্তমানে টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম সেরা দল নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে।

তবে বেন স্টোকস ঠিক ইংল্যান্ডের অধিনায়কোচিত চরিত্র ছিলেন না বছর পাঁচেক আগেও। এমনকি গত বছরও স্টোকসের ক্রিকেট খেলা ছিল অনিশ্চিত।

মানসিক বিষাদের কারণে ২০২১ সালে হুট করেই স্টোকস ছয়মাসের বিরতিতে চলে যান, তার আগে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ খেলতে গিয়ে পান আঙ্গুলে চোট, ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচকদের কাছে নিজেকে বিবেচনায় রাখেননি নিজে থেকেই, সব মিলিয়ে বেন স্টোকস নিজের কেরিয়ার নিয়ে একটা ধোঁয়াশা রেখেছিলেন গত বছর।

এ সবকিছুই ঘটে বেন স্টোকসের পিতার মৃত্যুর কয়েক মাসের ভেতর, যা ছিল তার জন্য একটা 'অন্ধকার সময়।'

ইংল্যান্ড, বেন স্টোকস

ছবির উৎস, Gareth Copley

ছবির ক্যাপশান, বেন স্টোকসকে মনে করা হচ্ছে ১৪৫ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে 'চাঁছাছোলা' অধিনায়ক।

২০১৭ সালে ব্রিস্টলে একটি পানশালায় মারামারির ঘটনায় সরাসরি জড়িয়ে গিয়েছিলেন বেন স্টোকস। সেই ঘটনা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল, তবে কোনও শাস্তি হয়নি বেন স্টোকসের। তিনি দাবি করেন নিজেকে রক্ষার জন্যই হাত উঠিয়েছিলেন এবং আদালত সেটা মেনে নিয়েছিলেন।

তারও আগে ২০১৩ সালে তরুণ স্টোকস ইংল্যান্ড লায়ন্সের হয়ে একটি সফরে মদ্যপান করে শাস্তি পেয়েছিলেন।

এসব কর্মকান্ডের জন্য তিনি এমনই একজন ছিলেন - যার মতো কাউকে সাধারণত অধিনায়ক হিসেবে ভাবেনা ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড ।

বেন স্টোকসকে মনে করা হচ্ছে ১৪৫ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে 'চাঁছাছোলা' অধিনায়ক।

অধিনায়কত্ব পাওয়ার পরেই তিনি বলেন "আমাকে ছোটবেলা থেকেই এমন সব নামের সাথে তুলনা দেয়া হতো এটা ছিল বিশাল চাপের", পেস বোলিং অলরাউন্ডারের ভূমিকার কারণে কেরিয়ারের শুরু থেকেই ইয়ান বোথাম, অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফের মতো নামগুলোর সাথে তুলনা দেয়া হতো স্টোকসকে।

কিন্তু তারা ক্রিকেটার হিসেবে সফল হলেও অধিনায়ক হিসেবে তেমন সফল ছিলেন না।

স্টোকস এখনও মানসিক চাপ অনুভব করেন, নিয়মিত থেরাপিস্টের সাথে যোগাযোগ হয় স্টোকসের, এনিয়েও কথা বলেছেন তিনি, দ্য গার্ডিয়ানের সাথে একটি সাক্ষাৎকারে স্টোকস বলেছিলেন, "সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার হচ্ছে এসব নিয়ে কারও সাথে কথা বলা।"

তবে স্টোকস সেই সাক্ষাৎকারে একটি আহ্বান জানিয়েছেন - যদি কোনও ক্রিকেটার মানসিক অবসাদে ভোগেন, আর কাউকে না পেলেও স্টোকসকে পাশে পাবেন তারা।

নিউজিল্যান্ডে জন্ম নেয়া স্টোকসের বাবা ছিলেন রাগবি খেলোয়াড়, বাবাকে ঘিরেই জীবন ছিল স্টোকসের, তার বাবার জীবনও ছিল ছেলেকে ঘিরে।

"সবখানে যেতেন আমার সাথে। সবসময় বলতেন- 'দেখো আমি তোমার চেয়ে বেশি জানি'। হয়তো, হয়তো এই সময়ও তিনি কিছু না কিছু করার পরামর্শ দিতেন। আমি যে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক এটা নিয়ে গর্ব করতেন এটুকু নিশ্চিত।"

বেন স্টোকস তার বাবা গেড স্টোকসের মতোই মানসিকতা পেয়েছেন বলে জানান।

ইংল্যান্ড, বেন স্টোকস

ছবির উৎস, Gareth Copley - ECB

ছবির ক্যাপশান, ইংল্যান্ডের নেতৃত্ব দেয়া মাইক আথারটন বলেছেন, অধিনায়কত্ব এমন একটা ব্যাপার যা তৈরি করে হয় না - নিজের ভেতর থাকতে হয়।

ত্রিশ বছর বয়সী বেন স্টোকসের চিন্তার ছাপ আছে তার নেতৃত্ব দেয়ার ধরনেও - স্বার্থহীন, আগে দলের ভাবনা, হার নিয়ে বেশি না ভাবা এবং সবসময় ইতিবাচক ভাবা, এসবই বেন স্টোকসের মূলনীতি।

তবে সিনিয়র ক্রিকেটারদের জ্ঞানও বেন স্টোকসের অধিনায়কত্বের শক্তি, বিশেষত তিনি নিজে কখন বল করবেন, টেস্ট ক্রিকেটে কখন কখন বিরতি এসব নিয়ে তিনি অন্যদের ওপরই নির্ভর করেন।

স্টোকস দলে ঢোকার আগেই নিজের চাহিদা পরিস্কার করেন, এর আগের সিরিজেই দলে ছিলেননা দুই ফাস্ট বোলার জিমি অ্যান্ডারসন ও স্টুয়ার্ট ব্রড, অধিনায়ক হয়েই স্টোকস এই দুজনকে দলে ফিরিয়ে আনতে বলেন।

নিজেও ব্যাটিং অর্ডারের এক ধাপ নিচে ছয় নম্বরে নামেন।

জনি বেয়ারস্টোকে পাঁচ নম্বরে খেলান এবং জনি বেয়ারস্টো যেন অধিনায়কের ডাকে পূর্ণ সাড়া দিলেন এই টেস্ট সিরিজে, দুটো সেঞ্চুরি করলেন দুটিই টেস্টের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে, দুটিতেই ১০০ এর বেশি স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করেছেন জনি, যিনি কদিন আগেও টেস্ট দলে নিজের জায়গা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন।

বেন স্টোকস এখন শুধু নিজে খেলছেন না খেলাচ্ছেনও, জ্যাক লিচ ও জনি বেয়ারস্টোর খেলার ধরনই সেটা বলছে।

এই ইংল্যান্ডের এখনও অনেক সমস্যা আছে, টপ অর্ডার এখনও ভঙ্গুর, দ্রুতই টপ অর্ডার ধসে পড়ছে, কোনও দিন জো রুট, কোনও একদিন বেয়ারস্টো সামাল দিচ্ছেন।

কিন্তু তাতে স্টোকসের অধিনায়কত্বের প্রশংসা কমছে না, সাবেক অধিনায়ক নাসের হুসেইন বলেছেন স্টোকস এখন পরিপূর্ণ অধিনায়ক, তিনি মনে করেন বেন স্টোকসের অধিনায়কত্বের যে প্রতিভা সেটা স্বভাবজাত।

স্কাই স্পোর্টসের আরেক ধারাভাষ্যকার ৫৪টি টেস্টে ইংল্যান্ডের নেতৃত্ব দেয়া মাইক আথারটন বলেছেন, অধিনায়কত্ব এমন একটা ব্যাপার যা তৈরি করে হয় না নিজের ভেতর থাকতে হয়।

ইংল্যান্ড, বেন স্টোকস

ছবির উৎস, Philip Brown

ছবির ক্যাপশান, ইংল্যান্ডের টেস্ট দলের কোচ ও অধিনায়ক

নাসের হুসেইন বলেছেন কঠিন একটা সময় ইংল্যান্ডের টেস্ট দলের দায়িত্ব নিয়েছেন স্টোকস, গত ১৭ ম্যাচে মাত্র একটিতে জয় পেয়েছে ইংল্যান্ড।

এমন সময় দায়িত্ব নিয়েই টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চ্যাম্পিয়ন দলকে হোয়াইটওয়াশ করা বিশেষ কিছু।

তবে স্টোকসের পাশাপাশি ইংল্যান্ডের নতুন টেস্ট কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালামও পাচ্ছেন প্রশংসা। তিনি খেলোয়াড়ি জীবনে আক্রমণাত্মক ক্রিকেটের জন্যই পরিচিত ছিলেন।

নিজের টেস্ট ক্যারিয়ারের শেষ টেস্টে ক্রিকেট ইতিহাসের দ্রুততম টেস্ট সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়ে বিদায় নেন ম্যাককালাম।

এমন একজন ব্যক্তি এখন ইংল্যান্ডের টেস্ট দলের কোচ, অনেকে বলছেন এটা ইংল্যান্ডের ক্রিকেটারদের শারীরিক ভাষাতেও পরিষ্কার।

বিশেষ করে দ্বিতীয় টেস্টে যেভাবে জনি বেয়ারস্টো ও বেন স্টোকস মিলে শেষ দিনে আড়াইশো তাড়া করে ম্যাচ জেতেন এটা ম্যাককালামের চিন্তাভাবনার কৃতিত্ব বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

ম্যাককালামও তার দলের অধিনায়কের একজন অনুরাগী।

"অধিনায়কত্ব স্টোকসের চরিত্রের সাথে মিশে গেছে। তিনি দারুণ একজন নেতা," নিজ দেশ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের পরে এসইএনজি রেডিওতে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন ম্যাককালাম।