সীতাকুণ্ড অগ্নিকাণ্ড: বাংলাদেশে একসাথে এত জন দমকল কর্মীর প্রাণহানি আর ঘটেনি

হেলমেট

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে এপর্যন্ত নয় জন দমকল কর্মীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
    • Author, শাহনাজ পারভীন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বিস্ফোরণ এবং অগ্নিকাণ্ড চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের একটি কন্টেইনার ডিপোতে ঘটলেও এতে যেন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে কাছের দুটি ফায়ার স্টেশন।

শনিবার রাত নটার দিকে চট্টগ্রাম শহর থেকে ৩০ কিলোমিটারের মতো দূরে সীতাকুণ্ডের কদমরসুল এলাকায় কন্টেইনার টার্মিনালে যখন অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয় তখন সে আগুন নেভাতে একদম শুরুতে গিয়েছিলেন সীতাকুণ্ড এবং কুমিরা ফায়ার স্টেশনের দমকল কর্মীরা।

আগুন প্রায় নিভিয়ে ফেলেছিলেন তারা। কিন্তু ঠিক ৪০ মিনিটের মাথায় ঘটে একের পর এক বিস্ফোরণ। সেই বিস্ফোরণ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে পাঁচ কিলোমিটার দুর থেকেও শব্দ শোনা গেছে, কম্পন অনুভূত হয়েছে।

বিস্ফোরণে ডিপোতে থাকা মালবাহী কন্টেইনারগুলো দুমড়ে মুচড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। পরপর বেশ ক'টি বিস্ফোরণ হয়েছে।

বাংলাদেশে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বলছে, বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে এপর্যন্ত নয় জন দমকল কর্মীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন তিন জন দমকল কর্মী।

গুরুতর আহত অবস্থায় চট্টগ্রাম চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১২ জন। দুই জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:

দমকল কর্মী।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সীতাকুণ্ডে অগ্নি নির্বাপণের কাজের এক ফাকে ক্লান্ত, বিপর্যস্ত দমকল কর্মী।

আহত আর একজনকে সোমবার হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। মৃত, নিখোঁজ এবং গুরুতর আহত সবাই সীতাকুণ্ড এবং কুমিরা ফায়ার স্টেশনের কর্মী।

সংস্থাটির সিনিয়র স্টাফ অফিসার এবং মিডিয়া সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত মোঃ শাহজাহান শিকদার জানিয়েছেন, ১৯৮১ সালে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স পূর্ণগঠনের পর থেকে এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে ১৭ জন দমকল কর্মী মারা গেছেন। বাংলাদেশে একসাথে এতজন দমকল কর্মীর প্রাণহানি আর কখনোই ঘটেনি।

কন্যা সন্তান চাইতেন ইমরান হোসেন মজুমদার

কুমিরা ফায়ার স্টেশনের মোট দমকল কর্মী ১৫ জন। কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এই স্টেশনের এখনো পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে দমকল বাহিনী।

গুরুতর আহত হয়েছেন সাতজন। শনিবার যে দলটি প্রথম কুমিরা থেকে কন্টেইনার টার্মিনালের আগুন নেভাতে গিয়েছিলেন তাদের দলনেতা ছিলেন ইমরান হোসেন মজুমদার।

শনিবার বিস্ফোরণের পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। সোমবার দুপুরের পর তার মরদেহ শনাক্ত হয়েছে।

ইমরান হোসেন মজুমদার

ছবির উৎস, Bangladesh Fire Service and Civil Defence

ছবির ক্যাপশান, ইমরান হোসেন মজুমদার।

ইমরান হোসেন মজুমদারের স্ত্রী এখন ছয় মাসের গর্ভবতী। দুই সন্তানের মধ্যে বড় নয় বছর বয়সী একটি ছেলে। পাঁচ বয়সী একটি প্রতিবন্ধী কন্যা সন্তান রয়েছে তাদের যার মস্তিষ্ক স্বাভাবিকের চেয়ে আকারে ছোট।

ইমরান হোসেন মজুমদারের ভাগ্নি সুমাইয়া আক্তারের সাথে কথা হচ্ছিল।

তিনি জানিয়েছেন, "ওনাদের প্রথম একটা মেয়ে বাচ্চা হয়েছিল যে তিন বছর বয়সে একই অসুখে মারা যায়। আমার মামা খুব মেয়ে বাচ্চা পছন্দ করতেন। মামী যখন প্রথম প্রেগন্যান্ট হন তখন বাচ্চা ছেলে না মেয়ে হবে তা না জেনেও দোকানে গিয়ে মেয়ে বাচ্চাদের কাপড় দেখতেন মামা। পরেরটাও যেন মেয়ে হয় সেটা চাইতেন।"

চাঁদপুরের কচুয়ার বাসিন্দা ইমরান হোসেন মজুমদার দমকল বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন ২০০১ সালে।

"মামার ছেলে বারবার জানতে চাচ্ছে বাবার মোবাইল বন্ধ কেন। শনিবার রাত আগুনের ডিউটিতে যাওয়ার আগে নয়টার দিকে হবে, মামীসহ আমাদের সবার সাথে ভিডিও কল করছিলেন মামা। ওই ছিল আমাদের শেষ দেখা।", কথাগুলো বলার সময় গলা বুজে আসছিল সুমাইয়া আক্তারের।

দমকল কর্মী।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ৪০ ঘণ্টার মতো জ্বলেছে আগুন।

প্রেম করে বিয়ে, ছয় মাসের মাথায় মৃত্যু

বাংলাদেশে যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা, দুর্যোগে সবচেয়ে প্রথম যে বাহিনী সাড়া দেয় সেটি হল বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। সে হোক ভবন ধস, লঞ্চ ডুবি অথবা অগ্নিকাণ্ড। বাংলাদেশের একমাত্র উদ্ধারকারী সংস্থা এটি।

শনিবার কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণে যেসব দমকল কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন তাদের মধ্যে শেরপুরের বাসিন্দা রমজানুল ইসলামের বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর। বছর দুই আগে দমকল বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।

তার স্ত্রী সাদিয়া আফরিন বলছিলেন, "ও খুব ঘুরতে ভালবাসত। নুডলস খেতে ভালবাসত।"

মাস ছয়েক আগে বিয়ে করেছেন দু'জনে। তার আগে পড়াশুনা চলাকালীন প্রেম করেছেন চার বছর। কিন্তু বিয়ের পর দুজনে একসাথে সংসার করতে পেরেছেন মাত্র একমাস।

সাদিয়া আফরিন বলছিলেন, "আমি শেরপুরে কৃষি ডিপ্লোমাতে পড়তাম আর ও পলিটেকনিকে পড়তো। ওরে দেখার পরই আমার ভালো লাগছিল। পরে পারিবারিকভাবেই বিয়ে হয়েছে। বিয়ের পর থেকে ও সীতাকুণ্ডে থাকতো আর আমি শেরপুর। গতমাসের চার তারিখ কেবল বাসা ভাড়া করে আমাকে নিয়ে আসছিল। মাত্র একমাস। তারপর ও নাই হয়ে গেল।"

সীতাকুণ্ডের ডিপোতে ফায়ার ট্রাক

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সীতাকুণ্ডের ডিপোতে রাসায়নিকের কারণে বিস্ফোরণ হয়।

সেদিন অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই দ্রুত ঘটনাস্থল যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন রমজানুল ইসলাম।

"যখন ফায়ারের খবর পেয়েছে ও সাথে সাথে রেডি হওয়ার সময় আমার কাছে গেঞ্জি চেয়েছিল। আর কোন কথা হয়নি। ও বের হয়ে গেল আর গতরাত বারোটায় ওর লাশ পাওয়া গেল।"

ছুটি থেকে মাত্র ফিরেই মৃত্যুর মুখে

একসাথে এত সহকর্মীর মৃত্যুতে বিহ্বল হয়ে পড়েছেন সীতাকুণ্ড ও কুমিরা ফায়ার স্টেশনের যে কয়জন বেঁচে আছেন তারা। শোকের সুযোগও তারা পাচ্ছেন না। অগ্নি নির্বাপণের কাজ করে যেতে হচ্ছে। আর আহতরা হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন।

কুমিরা ফায়ার স্টেশনের দুইজন দলনেতার একজন আতিকুর রহমান বলছিলেন মৃত অপর দলনেতা মিঠু দেওয়ান সম্পর্কে।

"রাঙামাটিতে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিল। মাত্র শুক্রবারই ফিরে এসেছে। ছুটির পর এটাই ছিল প্রথম ফায়ার রেসপন্স। রাঙামাটির আনারস খুব ভাল হয়। আমাদের সবার জন্য আনারস নিয়ে আসছিল। ওই দিন আগুন নেভাতে আমাদের স্টেশনের টিম লিডার হিসেবে গিয়েছিলেন। ছুটি থেকে এসেই এইভাবে মারা গেল।"

মিঠু দেওয়ান

ছবির উৎস, Bangladesh Fire Service and Civil Defence

ছবির ক্যাপশান, মিঠু দেওয়ান দলনেতা ছিলেন।

এই ফায়ার স্টেশনে বাকি যারা কাজ করতেন তাদের সবার বয়স ২৫ এর নিচে। বেশিরভাগের দমকল কর্মী হিসেবে চাকরির বয়স দুই থেকে তিন বছর।

"এরা সবাই আমার ছেলের মতো ছিল। এত কম বয়স। এদের নিয়ে কথা বলতে গেলেই আমার কান্না পাচ্ছে। আমার পুরো স্টেশন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। একটা ভালো কাজ করতে গিয়ে ওরা আত্মাহুতি দিয়েছে। এইটুকু ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছি।", বলছিলেন আতিকুর রহমান।

যেভাবে বেঁচে গেলেন মোঃ নুর ইসলাম

"আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে আমি বেঁচে গেছি", বলছিলেন সীতাকুণ্ড ফায়ার স্টেশনের দমকল কর্মী মোঃ নুর ইসলাম।

"অন্যরা আগুন নেভাচ্ছিল। আমি রোগী আনা নেয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সের কাছে ছিলাম। সেজন্য আমার প্রাণটা বেঁচে গেছে। এরপর সারারাত অ্যাম্বুলেন্সে করে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে গেছি। যাবার পথে কারো অক্সিজেন দরকার হয়েছে সেটা দিয়েছি। কারোর ব্যান্ডেজ লাগছে সেটা করেছি। কিন্তু মাথার মধ্যে খালি ঘুরছিল, এটা কি হল, এটা কি হল?"

চোখের সামনে এতজন সহকর্মীর মৃত্যুর পরও তাকে দায়িত্ব পালন করে যেতে হয়েছে। যাদের সাথে দিন রাত কাটিয়েছেন তাদের জন্য শোকের সময় পাননি। আজও কাজ করছেন তিনি। দমকল কর্মীদের এমনই জীবন।

ভিডিওর ক্যাপশান, সীতাকুণ্ড অগ্নিকাণ্ড: এখনও নেভেনি আগুন, ক্ষতিগ্রস্ত আশেপাশের ঘরবাড়ি