বলিউড গায়ক কেকে-র মৃত্যু: অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা করেছে পুলিশ, তদন্ত শুরু

    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি, কলকাতা

বলিউডের জনপ্রিয় গায়ক কৃষ্ণকুমার কুন্নাথ, যিনি কেকে নামেই পরিচিত, তার মৃত্যুর পরে এক অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্ত শুরু করেছে কলকাতা পুলিশ।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কলকাতায় এক অনুষ্ঠানে গান করে হোটেলে ফেরার পরেই অসুস্থ বোধ করেন কেকে। হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়।

বুধবার দুপুরে ময়নাতদন্তের পরে দেহ তুলে দেওয়া হয়েছে মুম্বাই থেকে আসা শিল্পীর স্ত্রীর হাতে।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

কেকে যে অনুষ্ঠানে মঙ্গলবার গান করতে গিয়েছিলেন, সেটি ছিল পূর্ব কলকাতার স্যার গুরুদাস কলেজের ছাত্র সংসদের অনুষ্ঠান। যদিও সেটি আয়োজন করা হয়েছিল দক্ষিণ কলকাতার নজরুল মঞ্চে।

অনুষ্ঠানটির যেসব ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে আর দর্শকরা অনুষ্ঠানের যেসব অব্যবস্থাপনার কথা জানাচ্ছেন, তার ভিত্তিতেই চিকিৎসকরা মনে করছেন- গান গাওয়ার সময়েই সম্ভবত অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন কেকে, তবে তা কাউকে বুঝতে দেন নি।

আর হোটেলে ফিরে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ার পরে তাকে যখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে- এমনটাও মনে করছেন চিকিৎসকদের একাংশ।

'কেকে-র অনুষ্ঠানে দমবন্ধ হয়ে আসছিল'

সামাজিক মাধ্যমে কেকের অনুষ্ঠানের প্রচুর ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। সেগুলিতে দেখা যাচ্ছে নজরুল মঞ্চের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক ভিড়।

এমনকি একটা ভিডিওতে এও দেখা গেছে যে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে অগ্নি-নির্বাপণ যন্ত্র থেকে গ্যাস স্প্রে করা হচ্ছে দর্শকদের ওপরে।

"এটা আমরা পরে শুনেছি যে বাইরে ফায়ার এক্সটিঙগুইশার থেকে গ্যাস স্প্রে করা হয়েছে ভিড় হঠানোর জন্য। সেটা ভেতরে হয় নি। তবে যা পরিস্থিতি হয়েছিল, তাতে দমবন্ধ হয়ে আসছিল রীতিমতো," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বুধবারের অনুষ্ঠানের এক দর্শক শর্মিষ্ঠা চ্যাটার্জী।

তার কথায়, "যখন দুপুর দেড়টা নাগাদ আমি নজরুল মঞ্চে ঢুকি, তখন চেয়ার মোটামুটি ভর্তি হয়ে গিয়েছিল, বেশ কিছু লোক দাঁড়িয়েও ছিলেন। বোঝা যাচ্ছিল যে এয়ার কন্ডিশনিং যন্ত্রও চলছে। অন্য এক শিল্পী সেই সময়ে পারফর্ম করছিলেন। ধীরে ধীরে ভিড়ও বাড়ছিল। দর্শকাসনের মাঝের সিঁড়িগুলোতেও তখন লোক বসে পড়েছে।"

যখন কেকের সহযন্ত্রীরা মঞ্চে ওঠেন সাউন্ড চেক করতে তখন থেকেই সমস্যার শুরু বলে জানালেন মিজ চ্যাটার্জী।

"হঠাৎই বিকট শব্দ শুনতে পাই আমরা। প্রবেশদ্বারগুলোতে অনেক লোক একসঙ্গে ধাক্কা দিচ্ছে বলে জানতে পারি। খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমরা। তবে আয়োজকরা মাইকে আমাদের আশ্বস্ত করায় ফের আসনে বসে পড়ি। কিন্তু একটু পরে সব গেটগুলো খুলে দেওয়া হয়। হু হু করে লোক ঢুকতে থাকে," বলছিলেন মিজ চ্যাটার্জী।

নজরুল মঞ্চে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ বসে অনুষ্ঠান দেখতে পারেন।

তবে বুধবার সেখানে প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি মানুষ হাজির হয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন ওই মঞ্চটির কর্মীরা।

এয়ার কন্ডিশনিং কী কাজ করছিল না?

হাজার হাজার মানুষ হলে ঢুকে পড়ায় এয়ার কন্ডিশনিং যে আর কাজ করছিল না, সেটা সকলেই টের পাচ্ছিলেন।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যাচ্ছে মঞ্চে কেকেও বারে বারে ঘেমে যাচ্ছেন, তোয়ালে দিয়ে মাথা, মুখ মুছছেন, কাউকে একটা বলছেন ভীষণ গরম, মাথার ওপরে বড় বড় স্পট লাইটগুলো নিভিয়ে দিতে।

শর্মিষ্ঠা চ্যাটার্জী বলছিলেন ওই সময় থেকেই দমবন্ধ লাগতে থাকে। সাংঘাতিক গরম লাগছিল সকলের। ঘেমে রীতিমতো স্নান করে গিয়েছিলেন সবাই।

"ওদিকে মঞ্চে কেকে গেয়েই চলেছেন। কিন্তু আমরা কেউ কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। তাই সবাই চেয়ারের ওপরেই উঠে পড়েছিলাম। তখনই দেখলাম কেকে-ও ভীষণ ঘামছেন, বারবার তোয়ালে বা সাদা রুমাল জাতীয় কিছু একটা দিয়ে মুখ মুছছেন," জানাচ্ছিলেন শর্মিষ্ঠা চ্যাটার্জী।

নজরুল মঞ্চের কর্মীরা অবশ্য জানাচ্ছেন যে এসি ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু সব গেট খুলে দেওয়া হলে আর ২৪৮২ জনের জায়গায় দ্বিগুণেরও বেশি মানুষ ঢুকে গেলে এসি কাজ করছে কী না, সেটা বোঝা সম্ভব নয়।

"এসি ঠিকঠাকই চলছিল, অন্তত আমরা মঞ্চের পিছন থেকে যারা অনুষ্ঠানটা দেখছিলাম, আমরা তো কিছু বুঝতে পারি নি," জানাচ্ছিলেন কেকে-র অনুষ্ঠানের আগেই ওই মঞ্চেই গান গেয়েছেন এমন এক শিল্পী শুভমিতা দে।

তার কথায়, "যত বেশি লোক ঢুকেছিল বলা হচ্ছে, আদতে কিন্তু ততটা অতিরিক্ত মানুষ ঢোকেন নি। হ্যাঁ, বাইরে খুব ভিড় হয়েছিল, কিন্তু নজরুল মঞ্চে খুব বেশি হলে শ-পাঁচেক অতিরিক্ত লোক ছিলেন। যাদের এত বেশি গরম লাগছিল, তারা গান শুনতে গিয়েছিলেন কেন!"

মঞ্চেও খুব ভিড় ছিল

কেকে যখন গান গাইছিলেন, তখন মঞ্চে অনেক মানুষের ভিড়ও চোখে পড়ছে অনেক ভিডিওতে।

দেখে মনে হচ্ছে তারা অনুষ্ঠানের আয়োজক। না হলে এত বড় মাপের একজন শিল্পীর কাছাকাছি মঞ্চে থাকার অনুমতি তারা পেতেন না।

দর্শকদেরও চোখে পড়েছে মঞ্চে বহু মানুষের উপস্থিতি।

"তারা কারা জানি না। নিশ্চয়ই আয়োজকরাই হবেন। এত বেশি মানুষ মঞ্চে ছিলেন যে কেকে আর সহযন্ত্রীরা যেটুকু জায়গা নিয়ে পারফর্ম করছিলেন, শুধু সেইটুকু জায়গাই খালি ছিল। বাকি গোটা মঞ্চেই মানুষ," বলছিলেন শর্মিষ্ঠা চ্যাটার্জী।

তবে শিল্পী শুভমিতা দের কথায়, "আমাদের মতো শিল্পীদের অনুষ্ঠানেও এরকম সংখ্যাতেই মানুষ স্টেজের ধারে থাকেন। যদি আয়োজকরা মঞ্চে ভিড় করেই থাকবেন, তাহলে কেকে স্যার মঞ্চ জুড়ে ঘুরে ঘুরে গান করলেন কী করে?"

চিকিৎসায় দেরি?

বুধবারের অনুষ্ঠানের ঘটনাক্রম দেখে চিকিৎসকরা বলছেন যে কেকে দৃশ্যতই অসুস্থ বোধ করছিলেন তার পারফর্ম্যান্সের সময়েই। সেই সময়েই দরকার ছিল চিকিৎসার।

"যা যা ছবি দেখছি, তাতে তো বোঝাই যাচ্ছে যে গরমে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়তেই পারেন। মঞ্চেই ওঁকে অসুস্থ লাগছিল। ডিহাইড্রেশন তো হতেই পারে। আর তার সঙ্গে যদি জানা অথবা কোনও অজানা শারীরিক সমস্যা থেকে থাকে, সেটা অ্যাগ্রাভেট করতেই পারে। সেই সময়ে কোনও চিকিৎসককে ডাকা উচিত ছিল আয়োজকদের," জানাচ্ছিলেন এ এম আর আই হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার স্পেশালিষ্ট ড. সোহম মজুমদার।

তার কথায়, "অনুষ্ঠানের পরে গাড়িতে তিনি যখন হোটেলে ফিরছিলেন, তখনও অসুস্থতার কথা বলেছেন বলে মিডিয়া মারফতই জানতে পারছি। সেক্ষেত্রে দক্ষিণ কলকাতা থেকে মধ্য কলকাতার হোটেলে নিয়ে যাওয়া হল, সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তারপরে আবার আলিপুরের একটা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। অনেকটা সময় নষ্ট হয়েছে এতে।"

ড. মজুমদারের মতে, মঞ্চ থেকে হোটেলে যাওয়ার পথেই যদি কোনও হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে অন্তত ব্লাড প্রেশারটা মেপে একটা ইসিজি করিয়ে নেওয়া হত, তাহলে অনেকটা সময় বাঁচানো যেত।

পুলি কেন তদন্তে নামল?

কলকাতার পুলিশ বলছে গানের অনুষ্ঠানের পরে কেকে হোটেলে ফিরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালে নিয়ে গেলে তার মৃত্যু হয়।

তাই ঠিক কীভাবে মারা গেলেন এই বলিউড গায়ক- সেটা জানার জন্যই তদন্ত।

বুধবার তার দেহের ময়নাতদন্ত হয়েছে। তার রিপোর্ট থেকেও যেমন মৃত্যুর কারণ জানা যাবে, তেমনই মধ্যকলকাতার যে হোটেলে তিনি ছিলেন, সেখান থেকে সিসিটিভির ফুটেজও তারা সংগ্রহ করেছে। হোটেল কর্মীদের সঙ্গেও তারা কথা বলবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

বিবিসি বাংলায় আরও খবর