সাকিব, তামিমদের মতো সিনিয়র ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেন ভাবতে বলছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড

    • Author, রায়হান মাসুদ
    • Role, বিবিসি বাংলা

"ওর (সাকিবের) সঙ্গে যখন আমি কথা বলি আমার মনে হয় সবগুলোই খেলতে চায়। আবার যখন খেলা আসে তখন ওর সমস্যা" - সাকিব আল হাসানকে নিয়ে এমন মন্তব্য খোদ বিসিবি প্রেসিডেন্টের।

সাকিব বাংলাদেশের ক্রিকেটে নিয়মিত আলোচনায় থাকেন এমন এক ব্যক্তিত্ব যার খেলা নিয়ে খোদ বিসিবি প্রেসিডেন্টও সংশয়ে থাকেন।

তবে এবার বিসিবি প্রেসিডেন্টের আলোচনার বিষয় শুধুই সাকিব নন, তিনি সিনিয়র ক্রিকেটারদের দিকেই প্রশ্ন তুলেছেন।

সামনে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ, তার আগে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড টিম ম্যানেজমেন্টের সাথে একটি বৈঠক করেছে, যেখানে মূল বিষয় ছিল ক্রিকেটারদের মাঠে পাওয়া এবং টেস্ট ক্রিকেটে উন্নতি করার উপায় নিয়ে আলোচনা।

ক্রিকেটারদের প্রয়োজনমতো মাঠে পাওয়ার বিষয়টি এখন বিসিবির জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়।

সাকিব আল হাসান যদিও মুখে বলেননি, কিন্তু বিভিন্ন টেস্ট সিরিজের আগেই নানা টালবাহানা চলে, টিম ম্যানেজমেন্টও নিশ্চিত থাকে না তিনি খেলবেন কি খেলবেন না, প্রস্তুতি ও অনুশীলনের চেয়ে সাকিবের অনিশ্চয়তাই বড় সংবাদ হয়ে দাঁড়ায়।

দুই হাজার ষোল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ৩৭টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছে।

এই সময়কালে বাংলাদেশের সিনিয়র ক্রিকেটারদের মধ্যে সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল সবচেয়ে বেশি টেস্ট মিস করেছেন।

এই দুজন এই সময়ে টেস্ট সিরিজে বিশ্রাম, ছুটি কিংবা অপ্রত্যাশিত কারণে দলে থাকেননি।

সাকিব আল হাসান ২০২১ সালের শুরুতে শ্রীলঙ্কা সফরে না গিয়ে আইপিএল খেলতে যাওয়ার চিঠি দিয়েছিলেন, সে সময় এটা নিয়ে তুমুল আলোচনা হয়েছিল।

গত ছয় বছরে বাংলাদেশ যে ৩৭টি টেস্ট ম্যাচে মাঠে নেমেছেন তার মধ্যে সাকিব ১৭টিতে খেলেছেন, অর্থাৎ বিশটি টেস্টেই তাকে মাঠে পাওয়া যায়নি।

তামিম ইকবালও একই সময়ে ১৪টি টেস্ট ম্যাচে খেলেননি কোনও না কোনও কারণে।

দুই হাজার বিশ সাল থেকে তামিম ইকবাল টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটেও খেলছেন না, কিন্তু তিনি টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট ছাড়ারও আনুষ্ঠানিক কোনও ঘোষণা দেননি।

দুই হাজার বাইশ সালের বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ যখন চলছিল তখন তামিম ইকবাল টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট থেকে আরও ছয় মাসের বিরতি নিয়ে নেন।

দুই হাজার একুশ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে 'তরুণ ক্রিকেটারদের খেলার সুযোগ' দেয়ার কথা বলে তামিম ইকবাল বিশ্বকাপের দল ঘোষণার আগেই নাম সরিয়ে নেন।

সাকিবকে নিয়েও টেস্ট ফরম্যাটে টিম ম্যানেজমেন্ট আলাদা করে পরিকল্পনা করে না বলেই জানা গেছে টেস্ট অধিনায়ক মুমিনুল হকের একটি সংবাদ সম্মেলনে, যেখানে তিনি বলেন, "সাকিব ভাই তো অনেকদিন ধরেই টেস্টে নিয়মিত না। তাই সেভাবেই প্ল্যান করা হচ্ছে।"

সাকিবের মতো একজন বোলার ও ব্যাটসম্যানের না থাকা যেকোনও দলেই ভারসাম্য নষ্ট করে।

এসব বিষয় বিবেচনা করেই বিসিবি প্রেসিডেন্ট ও টিম ম্যানেজমেন্টের বৈঠকের পরে ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট ধারণার দিকে জোর দেয়া হয়।

বাংলাদেশের সিনিয়র ক্রিকেটারদের মধ্যে মুশফিকুর রহিমকেই একমাত্র নিয়মিত পাওয়া যায়, তবে নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করে মেহেদী হাসান মিরাজও একাদশে জায়গা পাকা করেছেন এবং মমিনুল হক একটিমাত্র ফরম্যাটে জাতীয় দলে সুযোগ পান তাই তিনিও নিয়মিত।

এর আগে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকে নিয়ে টেস্ট ফরম্যাটে নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

দুই হাজার সতের সাল থেকে রিয়াদের টেস্ট দলে জায়গা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে বাংলাদেশের শততম টেস্ট ম্যাচে তাকে একাদশের বাইরে রাখেন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে।

দুই হাজার দশ থেকে ২০১৮ - টানা আট বছর টেস্ট ফরম্যাটে কোনও সেঞ্চুরি পাননি রিয়াদ। এরপর ২০১৯-২০ সালে নানা সময়ে টেস্ট দলে রিয়াদের জায়গা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

তিনি জিম্বাবুয়ের মাটিতে ১৫০ রানের একটি ইনিংস খেলার পর অবসর নিয়ে নেন। যদিও টেস্ট ফরম্যাটে অবসর নিয়ে কখনোই সেভাবে মুখ খোলেননি তিনি।

হারারেতে ২০২১ সালের জুলাই মাসে সতীর্থরা 'গার্ড অফ অনার' দিয়ে মাঠ থেকে ড্রেসিংরুমে নিয়ে যান, যা দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় তিনি আর টেস্ট ম্যাচ খেলছেন না।

এটা নিয়ে তখন বোর্ড প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান পাপন গণমাধ্যমে বলেছিলেন, "রিয়াদের উচিৎ ছিল আমাদের সাথে বসা আলাপ করা টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে।"

এই 'আলাপ করাটাই' আবারও বিসিবি ও টিম ম্যানেজমেন্টের মূল বিষয়।

তবে বিসিবি বলছে তারা কোনও ক্রিকেটারকেই কোনও ফরম্যাট খেলতে জোর করবে না।

"যদি ক্রিকেটাররা সিদ্ধান্ত না নেন তবে আমাদেরই নিতে হবে। কোচিং স্টাফ, টিম ম্যানেজমেন্টকে মিলে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রিয়াদ টেস্ট ক্রিকেট থেকে সরে এসেছে, তামিম ইকবাল টি টোয়েন্টি খেলছে না" - রবিবার সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন নাজমুল হাসান।

দু্ই হাজার একুশ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পর দলে জায়গা হারিয়েছিলেন মুশফিকুর রহিম, আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে তিনি দলে ফিরেছেন।

দল থেকে বাদ পড়ার পর মিডিয়ায় সরব হয়েছিলেন মুশফিক, নির্বাচকরা তখন 'বিশ্রাম' বললেও আসলে তাকে 'বাদই' দেয়া হয়েছিল বলেছিলেন তিনি।

তাকে নিয়েও ভাবনার কথা বলেছেন নাজমুল হাসান - "মুশফিক এখনো খেলছে। কিন্তু ওর চিন্তা ভাবনা জানা যাবে। ও কী ভাবছে, আমরা জানতে পারবো।"

মূলত ক্রিকেটারদের সাথে বোর্ডের সম্পর্ক যাতে গণমাধ্যমের কথাভিত্তিক না হয় এটাই চাওয়া বিসিবি প্রেসিডেন্টের।

তার বক্তব্য - "ওরা যা বলে মিডিয়াতে না বলে যাতে আমাদের সাথে বলে এটা আমাদের চাওয়া"।

সম্প্রতি মুস্তাফিজুর রহমান ইস্যুও খোলাসা করেন নাজমুল হাসান।

তিনি বলেছেন, চুক্তির সময় প্রত্যেক ক্রিকেটারকেই আলাদা চিন্তার জায়গা দেয়া হয়েছে যে কে কোন ফরম্যাটে খেলবে। এখানে কাউকেই জোর করে খেলানোর কথা আসেনি।

মুস্তাফিজের ব্যাপারে তিনি বলেন, "যদি এমন পরিস্থিতি হয় যে টেস্টে খেলানোর মতো পেস বোলার নেই, মুস্তাফিজই একমাত্র যিনি ফিট আছেন। তখন তো তাকে নিতেই হবে।"

মুস্তাফিজুর রহমান বরাবরই টেস্ট ক্রিকেট থেকে দূরে থাকতে চেয়েছেন, সম্প্রতি বাংলাদেশের দৈনিক আজকের পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "ফিটনেস ধরে রাখতে হলে বেছে বেছে খেলতে হবে।"