হাজী সেলিম: আদালতে আত্মসমর্পণের আগে বিদেশে আসা যাওয়া নিয়ে বিতর্ক কেন

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন আওয়ামী লীগের এমপি হাজী মোহাম্মদ সেলিম আইন মেনেই জরুরি চিকিৎসার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন এবং ফিরেও এসেছেন।

সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে বৃহস্পতিবার মি. খান বলেন, হাজী সেলিম সংসদ সদস্য ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। হাইকোর্টের রায় কার্যকরের আগেই তিনি গিয়ে আবার ফেরত এসেছেন।

তবে দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান বলছেন যে, আদালত দণ্ড দিয়ে আত্মসমর্পণের তারিখ বেধে দেয়ার পর আদালতের অনুমতি ছাড়া দেশত্যাগের সুযোগ নেই।

মি. সেলিম গত শনিবার চিকিৎসার জন্য ব্যাংকক গেলে এ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়।

কারণ সম্প্রতি হাইকোর্ট একটি দুর্নীতি মামলায় দশ বছর কারাদণ্ড দিয়ে তাকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের জন্য এক মাসের সময় দিয়েছিলো।

এর মধ্যেই তার বিদেশে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠে এবং বিরোধ দল বিএনপি মি. সেলিমকে দণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও বিদেশে যাওয়ার সুযোগ দেয়ার সমালোচনা করে।

হাজী সেলিম বিদেশে যাবার পর অনেক প্রশ্ন তুলেছিলেন, দুর্নীতির মামলায় হাইকোর্ট সাজা বহাল রাখার পরেও তিনি কিভাবে বিদেশে গেলেন?

তিনি দেশে ফিরে আসবেন কি না এমন সংশয়ও প্রকাশ করেছিলেন অনেকে।

কিন্তু চারদিনের মাথায় বৃহস্পতিবার তিনি থাইল্যান্ড থেকে ঢাকায় ফিরেছেন।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

খালেদা জিয়ার উদাহরন

হাজী মোহাম্মদ সেলিমের বিদেশ যাত্রার সাথে খালেদা জিয়ার উদাহরণ টেনে আনছেন অনেকে।

হাইকোর্টে দণ্ডিত হয়েও মি. সেলিম বিদেশে যেতে পারছেন কিন্তু খালেদা জিয়া পারছেন না।

কিন্তু মি. সেলিমের আইনজীবী বলছেন, খালেদা জিয়ার মামলার সাথে তার মক্কেলের মামলা মেলানোর সুযোগ নেই।

কারণ, মি. সেলিমের জামিন রয়েছে এবং অন্যদিকে খালেদা জিয়াকে উচ্চ আদালত জামিন দেয়নি।

তাছাড়া দুটোই দুর্নীতির মামলা হলেও মামলার মেরিট আলাদা বলে উল্লেখ করছেন মি. সেলিমের আইনজীবী।

তিনি বলেন, হাইকোর্ট নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের জন্য তিরিশ দিনের সময় দিয়েছে এবং এই তিরিশ দিনের আগে এই মামলায় কোন নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে না।

মি. সেলিম হাইকোর্টে দন্ডিত হলেও এখনো তার জন্য আপীল বিভাগে যাবার সুযোগ রয়েছে। সেজন্য হাইকোর্টের সাজাই চূড়ান্ত নয়।

এমন অবস্থায় কেউ বিদেশে যেতে পারেন কি না সেটি সুস্পষ্ট আইন আছে কিনা এ বিষয়টি নিয়ে আইনজীবীরাও কিছু বলতে পারছেন না।

চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড

মি. সেলিমের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, চিকিৎসার প্রয়োজনে থাইল্যান্ডে গিয়েছিলেন এবং তার মক্কেল বিদেশে যেতে পারবেন না -এমন কথা হাইকোর্টের রায়ে উল্লেখ করা হয়নি।

"জাজমেন্ট কার্যকর করা হয়েছে কুলিং পিরিয়ড এই তিরিশ দিন হাতে রেখে। অর্থাৎ স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল যেদিন রায় পাবে সেদিন থেকে তিরিশ দিন।"

"রায় কিভাবে কার্যকর হবে তাও আদালত বলে দেয়। এখানে কার্যকরের জন্য তিরিশ দিন সময় হাতে রাখা হয়েছে এবং এর মধ্যে বাইরে যেতে নিষেধাজ্ঞা হলে তা জাজমেন্টেই লেখা থাকতো," বলেন মি. সেলিমের আইনজীবী।

মি. আহমেদ বলেন যে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নিন্ম আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন হাজী সেলিম।

তবে দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী খুরশিদ আলম বলছেন তিরিশ দিন অতিবাহিত হয়নি মানে এটা নয় যে আদালত বিদেশে যেতে পারমিশন দিয়েছে।

"বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে আদালত থেকে পারমিশন নেয়া উচিত ছিলো কিন্তু হাজী সেলিম তা করেননি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মামলা

প্রসঙ্গত, দুদকের যে মামলায় হাজী সেলিমের কারাদণ্ড হয়েছে সেই মামলাটি দায়ের করা হয়েছিলো ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়।

মামলায় ২০০৮ সালের এপ্রিলে তাকে মোট তের বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলো আদালত। দণ্ড হয়েছিলো তার স্ত্রীরও।

পরে তারা আপিল করলে সে প্রেক্ষাপটে আদালত ২০১১ সালে ওই দণ্ড বাতিল করলে দুদক আবার উচ্চ আদালতে আপিল করে।

এই আপিলের শুনানি শেষে ২০১৫ সালে হাইকোর্টের রায় বাতিল করে আপিল বিভাগ আবারো হাইকোর্টে শুনানির নির্দেশ দেয়।

সে অনুযায়ী শুনানি শেষে গত বছরের নয়ই মার্চ হাইকোর্ট দশ বছরের সাজা বহাল রাখে ও অন্য ধারায় তিন বছরের দণ্ড থেকে অব্যাহতি দেয়।

অন্যদিকে আপিল চলাকালে মিস্টার সেলিমের স্ত্রী মারা যাওয়ায় তার আপিল বাতিল করা হয়।

হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী রায় নিন্ম আদালত পৌঁছানোর পর তিরিশ দিনের মধ্যে তার আত্মসমর্পণের কথা।

তার আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা বলছেন যে গত ২৫শে এপ্রিল ওই নথি আদালত পেয়েছে এবং সে কারণে ২৫শে মে পর্যন্ত আত্মসমর্পণের সময় আছে।

তবে এর মধ্যে গত শনিবার হাজী সেলিমের ব্যাংকক যাওয়ার খবর এলে তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়।