ডিসলেক্সিয়া : শিশুর অক্ষর, ভাষা, পড়া ও লেখা শিখতে দেরি হওয়া একটি জন্মগত সমস্যা

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শাহনাজ পারভীন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ঢাকার উত্তরার শাম্মি রহমানের সাত বছরের ছেলে অন্য বাচ্চাদের তুলনায় একটু দেরিতে কথা বলতে শুরু করেছিল। সেসময় চিকিৎসকেরা বলেছিলেন এটা অনেক বাচ্চাদের ক্ষেত্রেই হয়। কিন্তু স্কুলে ভর্তি করানোর পর জানতে পারলেন যে সে অন্য বাচ্চাদের তুলনায় শিখতে অনেক বেশি সময় নেয়।
তিনি বলছিলেন, "স্কুলের ম্যাডামরা বলেছে যে ও বিশেষ করে অক্ষর লেখা অনেক দেরিতে শিখছে। একটা অক্ষর ওকে বারবার শেখাতে হয়। কিন্তু ওর সবকিছু ঠিক আছে, কথাবার্তা নরমাল, সে ভালো ছবিও আঁকে।"
শাম্মি রহমান বলছিলেন, ছেলেটি এতটাই পিছিয়ে আছে যে শিক্ষকদের পরামর্শে তাকে দুই বছর ধরে প্লে-গ্রুপে রাখা হয়েছে। তবে কেন এমন হচ্ছে সেব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন এবং এব্যাপারে কোন বিশেষজ্ঞের পরামর্শও নেননি তিনি।
ঢাকায় এক গৃহশিক্ষক শায়লা আক্তারের সাথে কথা হচ্ছিল। তিনি বলছিলেন, শেখাতে না পেরে তিনি এক পর্যায়ে চতুর্থ শ্রেণির একটি বাচ্চাকে পড়ানোই ছেড়ে দিয়েছেন।
"পুরো সেমিস্টার জুড়ে একটা জিনিস পড়ালাম। কিন্তু দেখা যেতো যে সে তারপরও শিখতে পারছে না। তার বাবা একজন অংকের শিক্ষক। দেখা যেতো সকালে সে একটা বিষয় শিখেছে কিন্তু সন্ধ্যায় আর পারছে না। আমি নানা পদ্ধতিতে চেষ্টা করতাম।"

ছবির উৎস, Getty Images
ডিসলেক্সিয়া কি?
এমন কি হতে পারে যে এই শিশু দুটির ডিসলেক্সিয়া রয়েছে? ডিসলেক্সিয়া এমন একটি সমস্যা যার কারণে শিশুদের কোন কিছু শিখতে গিয়ে সমস্যা বা দেরি হয়।
বাংলাদেশে এই জন্মগত ত্রুটি সম্পর্কে তেমন একটা ধারণা নেই। কোন শিশুর অক্ষর বা ভাষা মনে রাখতে, পড়া বা লেখা শিখতে দেরি হলে খুব সহজেই অভিভাবক বা শিক্ষকেরা বলে ফেলেন যে তার পড়ালেখায় মন নেই - তাই কিছু শিখতে পারছে না।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ডা. রিয়াজ মোবারক বলছেন, গবেষণায় প্রমাণিত যে ডিসলেক্সিয়া একটি জন্মগত ত্রুটি যা শিখন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে, বিলম্বিত করে। মেধা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
"এটি এমন একটি সমস্যা যা এক একটি শিশুর ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। কারো হয়ত ভাষা শিখতে দেরি হয়, কারো লিখতে দেরি হয় বা পড়তে দেরি হয়। কোন শিশুর এর সবগুলোতে আবার কারো যেকোনো একটিতে সমস্যা হতে পারে।"

ছবির উৎস, Getty Images
যেভাবে বুঝবেন
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য সেবা সংস্থা এনএইচএস বলছে, একটি শিশুর বেড়ে ওঠার বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্নভাবে ডিসলেক্সিয়া প্রকাশ পায়। তবে প্রাথমিক স্কুলে একটু বেশি চোখে পড়ে - যেহেতু তখন সে অনেক নতুন কিছু শিখতে শুরু করে।
একই বয়সী অন্য শিশুদের তুলনায় তার কিছু শিখতে দেরি হওয়া এটির প্রধান লক্ষণ। যেমন নতুন কোন শব্দের উচ্চারণ শিখতে, শব্দের আওয়াজটি ধরতে, বলতে সমস্যা । অক্ষর লিখতে সমস্যা, কোন অক্ষরটি কোনটির পরে আসে, সপ্তাহের বিভিন্ন দিনের ধারাবাহিকতা মনে রাখার সমস্যা।
বানান শিখতে দেরি হওয়া, একই রকম দুটো শব্দ গুলিয়ে ফেলা, দেখে লিখতেও সময় নেয়া। একই বয়সী অন্য বাচ্চাদের তুলনায় দেরিতে পড়তে ও লিখতে শেখা। একই বয়সী অন্য বাচ্চাদের তুলনায় ধীরে পড়ার গতি ও পড়ার সময় বেশি ভুল করা। এনএইচএস বলছে, এগুলোই সাধারণত প্রধান লক্ষণ।

ছবির উৎস, Getty Images
কেন এটি হয়?
ডা. রিয়াজ মোবারক শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি নিয়ে একজন বিশেষজ্ঞ। তিনি বলছেন, এটি একটি জিনগত সমস্যা। তাই পরিবারে অন্য কারো ইতিপূর্বে সমস্যাটি থেকে থাকলে শিশুদের এ ত্রুটি দেখা দেয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
প্রতিটি কাজের জন্য মানুষ মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করে। যেমন যে অংশ দেখা, শেখা, লেখায় কাজ করার কথা ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের সেই অংশটি সঠিকভাবে কাজ করে না।
ডা. মোবারক বলছেন, "এমন শিশুদের ওই বিষয়গুলো শিখতে সমস্যা হয়, দেরি হয়। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তারা বোকা বা বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী।"
তবে তিনি বলছেন, এটি নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। এর নির্দিষ্ট কারণ এখনো পরিষ্কার নয়। সমস্যাটি আরও ভালো করে বুঝতে একজন বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।
কি করণীয়?
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার বলছেন, এসব শিশুরা সাধারণত পড়াশোনায় অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে থাকে। সঠিক সময়ে ধরতে না পারলে তারা আরও বেশি পিছিয়ে যায়।

ছবির উৎস, Getty Images
তিনি পরামর্শ দিচ্ছেন, "ডিসলেক্সিক শিশু পিছিয়ে আছে বলে তাকে অন্য শিশুর সাথে তুলনা করা যাবে না, তাকে বকাঝকা করা যাবে না তাহলে সে নিজের ক্ষমতার ব্যাপারে অনেক বেশি সন্দেহ করতে শুরু করবে এবং তাতে শিখতে আরও সমস্যা হবে। আর মারধরতো করাই যাবে না। তাহলে সে লেখাপড়াকে ভয় পেতে শুরু করবে।"
তিনি বলছেন, এই শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবক ও শিক্ষকের অনেক বেশি ধৈর্য দরকার হয়। ধৈর্য সহকারে তাকে যত্ন না নিলে তার শিক্ষা ও জীবন দীর্ঘ মেয়াদে প্রভাবিত হয়।
ডা. সরকার বলছেন, এক্ষেত্রে স্কুলের সাথে অভিভাবকদের অনেক সমন্বয় দরকার। ডিসলেক্সিক শিশুদের জন্য আলাদা স্কুল প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন না তিনি। তবে তাদের অন্য শিক্ষার্থীদের চেয়ে অবশ্যই বেশি সময় ও মনোযোগ দিতে হবে।

ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশে সেটা কতটা হচ্ছে জানতে কথা বলেছিলাম ঢাকার একটি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক আনিতা দাসের সাথে। তিনি বলছিলেন, "এখন শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অংশই থাকে যে আমরা একটা বেসলাইন সার্ভে করি। দুর্বল শিশু, কার ক্ষমতা কতটুকু, কে কোনটাতে ভাল, কোন শিশুর কোন বিষয়ে চাহিদা বেশি এসব জানার জন্য। এটা করে আমরা তাদের সেইভাবে শিখন পদ্ধতিতে সহায়তা করার চেষ্টা করি।
"কিন্তু স্কুলের অনেক ভূমিকা থাকলেও আমাদের দেশে এক একটি ক্লাসে অনেক বেশি বাচ্চা, সেই তুলনায় শিক্ষক এত কম যে তাদের সবার দুর্বলতা অত বিস্তৃতভাবে চিহ্নিত করার সুযোগ আসলে আমাদের নেই"
যার ফলে এক পর্যায়ে এমন অনেক শিশু ঝড়ে পড়ে। বিশেষ করে মেয়ে বাচ্চাদের তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেয়া হয় এবং ছেলে বাচ্চাদের কাজে পাঠানো হয়, বলছিলেন আনিতা দাস।








