কারিম বেনজেমা: রেয়াল মাদ্রিদের ফরাসী ফুটবলার কি এখন বিশ্বের সেরা স্ট্রাইকার?

ছবির উৎস, Getty Images
লিওনেল মেসি, নেইমার আর কিলিয়ান এমবাপের মতো বিশ্বপর্যায়ের তারকারা খেলছিলেন বিপক্ষ দলে, কিন্তু এই ত্রয়ীর সম্মিলিত তারকাদ্যুতিও ম্লান হয়ে গেল কারিম বেনজেমার তিন গোলে।
রেয়াল মাদ্রিদের এই ফরাসী তারকা দ্বিতীয় লেগের ৬০ মিনিট পর্যন্ত দুই লেগ মিলিয়ে ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা দলকে হ্যাটট্রিক করে কোয়ার্টার ফাইনালে নিয়ে গেলেন।
আর তারকাবহুল একাদশ নিয়ে প্যারিস সেইন্ট জার্মেই শেষ ষোল'র পর্ব থেকেই বিদায় নিল ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে।
কারিম বেনজেমার হ্যাটট্রিকের সুবাদে গতরাতে দ্বিতীয় লেগের ম্যাচে শেষ পর্যন্ত ৩-১ গোলের জয় পেয়েছে রেয়াল মাদ্রিদ।
ওই হ্যাটট্রিক করতে কারিম বেনজেমা সময় নিয়েছেন মাত্র ১৭ মিনিট।
বয়সের হিসেবে এটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলারের হ্যাটট্রিকের রেকর্ড - ৩৪ বছর ৮০ দিন বয়সে গোল তিনটি করেছেন কারিম বেনজেমা।
ক্যারিয়ারে প্রথম হ্যাটট্রিকটি তিনি করেছিলেন ১৫ বছর আগে, ফরাসী ক্লাব অলিম্পিক লিঁওর জার্সি গায়ে।
গতরাতের তিন গোলের সুবাদে রেয়াল মাদ্রিদের হয়ে গোলসংখ্যার দিক থেকে আলফ্রেডো ডি স্টেফানোকে ছাড়িয়ে গেছেন বেনজেমা - রেয়াল মাদ্রিদের হয়ে তার গোল এখন ৩০৯টি। মাদ্রিদের ক্লাবটির হয়ে তার চেয়ে বেশি গোল করেছেন কেবল ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং রাউল গঞ্জালেজ।
ফুটবল সমর্থক ও বিশ্লেষকদের আলোচনায় এখন প্রায়ই উঠে আসে যে কিলিয়ান এমবাপেই মেসি-রোনালদো পরবর্তী যুগের সেরা ফুটবলার কি-না।
তবে বার্ন্যাবুতে গতরাতে কারিম বেনজেমা বুঝিয়ে দিয়েছেন আপাতত তাকে নিয়েই কেন আলোচনা হচ্ছে - অনেকের মতে তিনিই বর্তমান সময়ের সেরা স্ট্রাইকার।

ছবির উৎস, Getty Images
সবচেয়ে পরিপূর্ণ স্ট্রাইকার বেনজেমা?
বিবিসি স্পোর্ট জানাচ্ছে, একটি পত্রিকার শিরোনাম করেছে 'বেনজেমা ঐতিহাসিক'। তিনি যেমন খেলেছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচটিতে, তাতে করে অনেক পত্রিকাকে শিরোনামও বদল করতে হয়েছে। কারণ বেনজেমা হ্যাটট্রিক করেছেন মাত্র ১৭ মিনিটের ব্যবধানে।
অনেকে ভাবতেই পারেননি, পিএসজিকে এই ম্যাচে রেয়াল মাদ্রিদ হারিয়ে দেবে।
বেনজেমার পা থেকে আসা দ্বিতীয় ও তৃতীয় গোলের মধ্যে সময়ের ফারাক ছিল মাত্র ১০৬ সেকেন্ড।
ব্রিটিশ সাবেক ফুটবলার ও বর্তমানে ফুটবল পন্ডিত গ্যারি লিনেকার নিজের টুইটারে লিখেছেন, "তর্কাতীতভাবেই কারিম বেনজেমা বিশ্বের সেরা নাম্বার নাইনদের একজন।"
ফুটবলের প্রচলিত ভাষায় নাম্বার নাইন বলতে স্ট্রাইকারকেই বোঝায়। সময়ের আলোচিত নাম্বার নাইনদের মধ্যে রয়েছেন পিএসজি'র এমবাপে, বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের এরলিং ব্রট হলান্ড আর বায়ার্ন মিউনিখের রবার্ট লেওয়ানন্ডভস্কি।
অজানা কোন এক কারণে করিম বেনজেমা তার পারফরম্যান্সের যথাযথ মূল্যায়ন পান না বলে মনে করেন ইংল্যান্ডের ফুটবলার ইজি ক্রিশ্চিয়ানসেন।
"আমার মনে হয় বেনজেমাকে প্রাপ্য গুরুত্ব দেয়া হয় না রেয়াল মাদ্রিদে। আর এটাই তাকে আরও তাতিয়ে তোলে," বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভে এ কথা বলেন ক্রিশ্চিয়ানসেন।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের পরিসংখ্যানে বেনজেমা বরাবরই শীর্ষ একজন গোলদাতা - চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে টানা ১৮ মৌসুমে গোল করেছেন তিনি।
বিটি স্পোর্টে দেয়া এক বিশ্লেষণে ইংল্যান্ড ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক ডিফেন্ডার রিও ফার্ডিনান্ড বলেন, "আমরা সবাই চোখ রাখছিলাম কিলিয়ান এমবাপের দিকে, বর্তমান সময়ের একজন বিধ্বংসী এক ফুটবলার তিনি। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে কারিম বেনজেমা মনে করিয়ে দিলেন, তিনি ফুরিয়ে যাননি।"
তার মতে, বেনজেমা 'সবচেয়ে পরিপূর্ণ নাম্বার নাইন'।
"তিনি খেলার সব ভাগেই বড় অবদান রাখেন," ফার্ডিনান্ড বলেন।
প্যারিসের প্রথম লেগে দেয়া কিলিয়ান এমবাপের গোলেই এগিয়ে ছিল সেন্ট জার্মেই। দ্বিতীয় লেগে তার খেলা নিয়ে সংশয় ছিল, কিন্তু বার্নাব্যুতে মাঠে নামেন তিনি - বা পাশ থেকে কঠিন কোণে একটি গোলও করেন। ততক্ষণ পর্যন্ত এমবাপেকে নিয়েই ছিল সব প্রশংসা আলোচনা।
কিন্তু বেনজেমা গোলকিপারের ভুলের সুযোগ নিয়ে প্রথম গোল দেয়ার পর ম্যাচের রূপই বদলে যায়।
ক্লাব ফুটবলে বেনজেমার সাবেক সতীর্থ মেসুত ওজিল টুইট করে লিখেছেন, বেনজেমা এখনও সেরা নাম্বার নাইন।

ছবির উৎস, Getty Images
বেনজেমার গল্প
ফ্রান্সের শহর লিওঁতে ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে জন্ম নেন কারিম মোস্তাফা বেনজেমা। তার বাবা-মা ছিলেন আলজেরিয়ান।
এই শহরেই বেনজেমার ক্লাব ফুটবলে হাতেখড়ি হয়।
২০০৮ সালে অলিম্পিক লিঁওর ফরাসী লিগ জয়ে বেনজেমা বড় অবদান রাখেন।
আলজেরিয়ান কানেকশান, মুসলিম পরিচয়, ভালো ফুটবলার - সব মিলিয়ে ফরাসী তারকা জিনেদিন জিদানের সাথেই সবচেয়ে বেশি তুলনা করা হতো কারিম বেনজেমার।
গণমাধ্যমে ২০০৮ সালেই তিনি বলেছিলেন, "জিদানের সাথে তুলনা হওয়াটাই আমার জন্য বড় ব্যাপার। আমরা সম্পূর্ণ আলাদা ঘরানার ফুটবলার।"
রেয়াল মাদ্রিদে যাওয়ার পর শুরুর দিকে বেনজেমা ঠিক তার নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। তাকে পেতে ৩৫ মিলিয়ন ইউরো খরচ করতে হয়েছিল স্পেনের ক্লাবটির।
কিন্তু প্রথমে রাউল, এরপর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর তারকাখ্যাতির পাশে বেশ অনুজ্জ্বলই ছিলেন বেনজেমা।
তার ওপর ফ্রান্সের ফুটবল ফেডারেশনের সাথে সবসময়ই কিছু বিষয়ে তার মতবিরোধ লেগেই থাকতো। প্রথমত তিনি ফ্রান্সের জাতীয় সংগীত গাইতে অপারগতা প্রকাশ করেন, পরে নানা ধরনের স্ক্যান্ডালে জড়ান।

ছবির উৎস, Getty Images
দীর্ঘদিন জাতীয় দলের বাইরে ছিলেন কারিম বেনজেমা।
প্যারিসের এক পতিতালয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সাথে সময় কাটানোর অভিযোগ ওঠে ২০১০ সালে। প্যারিস পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সে সময়, যদিও পরবর্তীতে যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।
২০১৫ সালে জাতীয় দলের সতীর্থ ম্যাথু ভালবুয়েনার সেক্সটেপ মোবাইলে রেকর্ড করে তাকে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ ওঠে বেনজেমার বিরুদ্ধে।
ফ্রান্সের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ম্যানুয়েল ভেয়াস বলেছিলেন, "অ্যাথলিটদের উচিত তরুণদের সঠিক পথ দেখানো। তারা ফ্রান্সের পরিচয় বুকে ধারণ করেন। এটা গুরুত্বপূর্ণ।"
এই ঘটনার পর দীর্ঘদিন জাতীয় দলের বাইরে ছিলেন তিনি। তবে ২০২১ সালের ইউরোতে শেষ পর্যন্ত ডাক পান তিনি।
তবে কখন ফর্মের কারণে বেনজেমাকে উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে গিয়েছিল ফ্রান্স দলের নির্বাচকদের।
গত বছরের নভেম্বর মাসে সেক্সটেপ মামলার রায় দেয়া হয় - বেনজেমাকে এক বছরের স্থগিত কারাদণ্ড এবং ৭৫ হাজার ইউরো জরিমানা করা হয়।
ক্যারিয়ারের উত্থান-পতন, স্ক্যান্ডাল এবং ক্লাবে রোনালদোর অভাব পূরণ করে ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে থাকা কারিম বেনজেমা ফ্রান্সে ঠিক নায়ক হয়ে উঠতে না পারলেও, রেয়াল মাদ্রিদে এখন তিনিই সবচেয়ে বড় তারকা।








