নোভাক জকোভিচ: বিশ্বের শীর্ষ টেনিস তারকার ভিসা বাতিলের ব্যাপারে অস্ট্রেলিয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে যেসব রাজনীতি

ছবির উৎস, Getty Images
অস্ট্রেলিয়ার সরকার কোভিড টিকা না নেওয়ার কারণে টেনিস তারকা নোভাক জকোভিচের ভিসা দ্বিতীয়বারের মতো বাতিল করেছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে তাকে এখন অস্ট্রেলিয়া থেকে বহিষ্কার করাসহ দেশটিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে তিন বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। প্রথমবার ভিসা বাতিল করার পর জকোভিচ আইনের আশ্রয় নিয়েছিলেন। তখন আদালত তার পক্ষে রায় দিয়েছিল। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার সরকার এখন নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে জকোভিচের ভিসা আবারও বাতিল করেছে। পুরুষদের এককে এক নম্বর এই টেনিস খেলোয়াড় অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে খেলার জন্য সেখানে গেছেন। আগামী সোমবার এই টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু বিবিসির সংবাদদাতা শায়মা খলিল ব্যাখ্যা করছেন, অস্ট্রেলিয়ার এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনীতিও কাজ করেছে:
নোভাক জকোভিচ অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে শিরোপা ধরে রাখার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় আসার কথা ঘোষণা করার পর পরই সেদেশের সরকার অসুবিধায় পড়ে গিয়েছিল।
এর আগে আদালত জকোভিচের পক্ষে রায় দিলেও সরকার দ্বিতীয় বারের মতো তার ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচনী বছরে ভোটারদের কাছে মুখ রক্ষার জন্য।
আর সেটা করতে গিয়ে সরকার যেকোনো কূটনৈতিক পরিণতি, আন্তর্জাতিক অস্বস্তি এবং জকোভিচের সমর্থকদের রোষের মুখে পড়ার জন্যেও প্রস্তুত।
গত দুই সপ্তাহ ধরে অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার একটা বিষয় জোরালোভাবে তুলে ধরতে চাইছে আর সেটা হলো- কেউই নিয়মনীতির ঊর্ধ্বে নয়। এমনকি বিশ্বের এক নম্বর এই টেনিস খেলোয়াড়ও।
এটা খুবই সহজ ও সৎ নীতি। কিন্তু যেভাবে এটা সামাল দেওয়া হয়েছে তা মোটেও সেরকম ছিল না।
জকোভিচের অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছানোর আগে প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন বলেছেন মেলবোর্নে পৌঁছানোর পর যদি দেখা যায় যে তার নথিপত্র ঠিক নেই তাহলে তাকে "পরের বিমানে তুলে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।"
পরের দিন ৬ই জানুয়ারি যখন জকোভিচের ভিসা বাতিল করা হয় তখন প্রধানমন্ত্রী মরিসন আবারও বলেন, "নিয়ম তো নিয়মই।"
এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of X post
আরো পড়তে পারেন:
জকোভিচ যখন সরকারের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার কথা ঘোষণা করেন, তখন মি. মরিসন বলেছিলেন এটা নির্ভর করছে আদালতের উপর।
কিন্তু এর পর হঠাৎ করেই সরকারের অবস্থান বেশ নড়বড়ে দেখাতে শুরু করে। কারণ প্রক্রিয়াগত কারণে আইনগতভাবে মামলা দায়েরের জন্য সরকার আরো কিছু সময় চেয়েছিল যা দিতে বিচারক অস্বীকৃতি জানান।
কিন্তু জকোভিচকে কেন শুরুতেই বিমানে ওঠার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল - সরকারকে এই প্রশ্নেরও মুখোমুখি হতে হয়েছে।
নোভাক জকোভিচের পক্ষে বিচারক অ্যান্থনি কেলির দেওয়া রায়ের পরই পুরো বিষয়টির অবসান ঘটতে পারতো। মেলবোর্ন বিমানবন্দরে যে প্রক্রিয়ায় ভিসা বাতিল করা হয়েছে তাকে তিনি আনাড়ি কাজ বলে উল্লেখ করেন এবং তার ভিসা পুনর্বহাল করে তাকে আটকাবস্থা থেকে ছেড়ে দেওয়ারও নির্দেশ দেন।
কিন্তু ঘটনাটি এখানেই শেষ হয়নি।
অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন বিষয়ক মন্ত্রী অ্যালেক্স হকের নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ ছিল যার মাধ্যমে তিনি জকোভিচের ভিসা বাতিল করে তাকে দেশ থেকে বের করে দিতে পারেন। এবং তিনি সেটা করেছেন।
এর পেছনে কী উদ্দেশ্যে কাজ করেছে তা নিয়ে প্রচুর কথাবার্তা হয়েছে। মূল কারণ রাজনৈতিক।
রাজনীতির এই শোরগোল এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব।

ছবির উৎস, Getty Images
এখানে সরকারের সামনে দুটো বিষয় বিবেচনা করার আছে।
প্রথমত, এর ফলে মরিসন প্রশাসন গভীর বিড়ম্বনায় পড়েছে। অস্ট্রেলিয়া এবং সারা বিশ্বের মানুষের মনে হবে যে রাজনীতিবিদরা এমন নিয়মনীতি প্রয়োগ করছে যা তারা নিজেরাই বোঝে না অথবা বিষয়গুলো তাদের কাছে পরিষ্কার নয়। তারা যে একে অপরের সঙ্গে কথা বলে না এই ধারণাও তৈরি হতে পারে।
সরকারের একটি অংশ ভিক্টোরিয়া রাজ্য আলাদাভাবে টেনিস অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তারা একেবারেই ভিন্ন কথা বলছিলেন। আর টুর্নামেন্ট আয়োজনকারীরা অভিযোগ করেছেন যে তারা এই দুটো পক্ষের মাঝখানে পড়ে গেছেন।
দ্বিতীয়ত, বিষয়টির সঙ্গে টেনিসের চাইতেও কোভিডের সম্পর্ক বেশি। বলা যায় করোনাভাইরাস মহামারিকে কেন্দ্র করে দেশের ভেতরে এক ধরনের হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। অস্ট্রেলিয়ায় সবচেয়ে জনবহুল দুটো রাজ্য নিউ সাউথ ওয়েলস এবং ভিক্টোরিয়াতে কয়েক সপ্তাহ ধরে হাজার হাজার মানুষ কোভিডে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হচ্ছে।
আরো পড়তে পারেন:
টেস্ট করার কাজে ক্লিনিকগুলো এখনও হিমশিম খাচ্ছে এবং মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। যদিও এই হার ইউরোপ কিম্বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো নয়। উল্লেখ্য যে করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে বিশ্বের যেসব দেশে অনেক বেশি কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে তাদের অন্যতম এই অস্ট্রেলিয়া।
এটি এমন একটি দেশ যেখানে কখনো একজন আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হলেও পুরো শহর কিম্বা রাজ্য লকডাউনে চলে যেতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ানরা মনে করছেন যে তাদের দিকে কেউ ফিরে তাকায় নি। তারা মনে করছেন পরিস্থিতির খুব দ্রুত অবনতি ঘটেছে। অনেকে একথাও বলছেন-তাদেরকে যা যা করতে বলা হয়েছে তারা তার সবকিছুই করেছেন।
তারা টিকা নিয়েছেন। এখন তারা বুস্টারও নিচ্ছেন। কিন্তু তারপরেও অমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে বহু লোক আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেকেই প্রশ্ন করছেন, তারা যা যা করেছেন এর চাইতে বেশি আর কী তারা করতে পারতেন!

ছবির উৎস, EPA
এখন এই চিত্রটি নোভাক জকোভিচের বেলায় বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে যিনি প্রকাশ্যেই বলেছেন যে তিনি টিকার বিরোধিতা করেছিলেন এবং কোভিড আক্রান্ত হওয়ার পরেও সবার কাছ থেকে আলাদা থাকার নিয়ম ভঙ্গ করেছিলেন। এছাড়াও ভ্রমণের সময় ফর্মে তিনি মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করেছিলেন।
এছাড়াও তার কোভিড হওয়ার ব্যাপারে তিনি কখন জানতে পেরেছেন সেসব তথ্যেও কিছু অমিল রয়েছে। তিনি তার বিবৃতিতে বলেছেন যে ১৭ই ডিসেম্বরে জানতে পেরেছেন। কিন্তু আদালতের কাছে তিনি যে এফিডেবিট জমা দিয়েছেন তাতে বলা হয়েছে ১৬ই ডিসেম্বর তার কোভিড পজিটিভ নিশ্চিত করা হয়েছে।
"এটা যদি আমি কিম্বা আপনি হতাম তাহলে কি তারা আমাদের ঢুকতে দিতো," আমার টুইটারে ফিডে একজন এই মন্তব্য করেছেন।
এর সহজ উত্তর - না।
এই বিতর্কে যে স্কট মরিসন সরকারের ক্ষতি হয়েছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, যোগাযোগ ভেঙে পড়া, কোন নিয়ম কার বেলায় প্রযোজ্য হবে- এবিষয়ে অস্বচ্ছতা, এবং টিকা না নেওয়া একজন বিখ্যাত খেলোয়াড়ের কোভিড নিয়ম ভঙ্গ করা- এসব কিছু মিলেই এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, রাজনীতিবিদরা এখন যা সহজ করার চেষ্টা করছেন।








