ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ: ‘ভাইয়ের লাশ জাহাজের ফ্রিজে রাখছে, আমার মা যেন লাশটা দেখতে পায়’ - নিহত নাবিকের ভাই

ছবির উৎস, হাদিসুর রহমান ফেসবুক
বুধবার বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় গণমাধ্যমের খবরে ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে আটকে পড়া বাংলাদেশি জাহাজে নাবিক হাদিসুর রহমানের মৃত্যুর খবর জানতে পারে তার পরিবার।
বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে নয়টার দিকে 'বাংলার সমৃদ্ধি'তে রকেট হামলা হলে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান হাদিসুর রহমান।
শুরুতে গণমাধ্যমের বরাতে মি. রহমানের মৃত্যুর খবর জানতে পারলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজে থাকা তার সহকর্মীরাও ফোন করে জানান পরিবারকে জানান মর্মান্তিক সে খবর।
"তারা (জাহাজের নাবিকেরা) বলছে, আমার ভাইয়ের লাশ জাহাজের ফ্রিজে রাখছে। আমার মা জানি লাশটা একবার দেখতে পায়, এইটাই শুধু আমরা চাই এখন," কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন হাদিসুর রহমানের ছোট ভাই তরিকুল ইসলাম তারেক।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন হাদিসুর
সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের ২০১৪ সালে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে যোগ দেন বরগুনার বেতাগী উপজেলার হোসনাবাদ গ্রামের ছেলে হাদিসুর রহমান।
বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজের থার্ড ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন তিনি।
এই মূহুর্তে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি।
মি. ইসলাম জানিয়েছেন, জমি বন্ধক রেখে বড় ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছিলেন তার বাবা।
সাত বছরে বন্ধকী জমির অনেকটাই ছাড়িয়েছিলেন তার ভাই, কিন্তু শেষ করতে পারেননি সে কাজ।
"ভাইয়া আব্বা-আম্মাকে বলত, অনেক কষ্ট করছো তোমরা, এখন খালি সুখ করবা। কিন্তু সেই সুখ হইল না, তারও হইল না, আমার বাপ-মায়েরও হইল না," বলছিলেন মি. ইসলাম।

ছবির উৎস, বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন
অবসরপ্রাপ্ত মাদ্রাসা শিক্ষক বাবা আব্দুর রাজ্জাক আর অসুস্থ মা আমেনা বেগমের চার সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন হাদিসুর রহমান।
এক বোনের পরে তিনজন ভাই, ভাইদের মধ্যে বড় ছিলেন মি. রহমান।
'এবার ফিরে বিয়ে করার কথা ছিল'
গত আড়াই মাস ধরে সাগরেই ছিলেন হাদিসুর রহমান।
সম্প্রতি পরিবারকে তিনি জানিয়েছিলেন, তার বেতন বেড়েছে।
"ভাইয়া বলছিল এবার বাড়িতে এসে নতুন ঘর তুলবে। তারপর বিয়ে করবে বলছিল আমাদের।"
অসুস্থ মায়ের খাওয়া-দাওয়া নিয়ে ছিলেন খুব চিন্তিত, এজন্য মা কী খাচ্ছেন, কখন আর কতটুকু খাচ্ছেন নিয়মিত সে খবর নিতেন হাদিসুর রহমান।
বুধবার সকালেও ছোটভাই আর মায়ের সাথে হোয়াটসঅ্যাপে তিনি সে খবর নিয়েছিলেন।
অসুস্থ মাকে নিয়ে পটুয়াখালী ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিলেন মি. ইসলাম, বুধবার সকালেই বাড়ি ফিরেছেন।
"পটুয়াখালী থেকে সকালে ফিরতেছি যখন, সেই সময় ভাইয়া আমার আর মায়ের সাথে কথা বলছে।
মার খাওয়ার খোঁজ নিসে, আর তারে বলছে, তোমার পছন্দমত বাজার করে বাড়ি যাইয়ো," বলছিলেন মি. ইসলাম।
স্নাতক চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মি. ইসলাম বিবিসিকে বলছিলেন "আর কিচ্ছু চাই না, খালি ভাইয়ের লাশ চাই, তার কবর দেখতে চাই। আমার মা জানি লাশটা একবার দেখতে পায়, এইটাই আমাদের চাওয়া এখন।"
মি. ইসলাম এই দাবি বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজের নাবিকদের কাছে জানিয়েছেন।
'লাশ কবে ফেরানো যাবে তা বলা মুশকিল'

ছবির উৎস, বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন
বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজে রকেট হামলা নিয়ে আজ (বৃহস্পতিবার) ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করেছেন বাংলাদেশের নৌ পরিবহণ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, নিহত র হাদিসুর রহমানের মরদেহ জাহাজের ভেতরেই ফ্রিজে রাখা হয়েছে।
"আমরা লাশ আনার চেষ্টা করবো, তবে কবে লাশ আনা সম্ভব হবে সেটা বলা মুশকিল," বলেন প্রতিমন্ত্রী মি. চৌধুরী।
বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের নির্বাহী পরিচালক পীযুষ দত্ত চট্টগ্রামে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এই মুহূর্তে জাহাজটি বন্দর ছেড়ে যাওয়া নিরাপদ নয়।
নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সবাইকে জাহাজে অবস্থান করার জন্য পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

ছবির উৎস, Bangladesh Shipping Corporation
জাহাজটিতে এখনো নাবিক এবং ইঞ্জিনিয়ারসহ ২৮জন অবস্থান করছেন।
গত ২৬শে জানুয়ারি এটি ভারতের মুম্বাই বন্দর থেকে যাত্রা করে এবং তুরস্কের ইরেগলি হয়ে ২২শে ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরের বহির্নোঙ্গরে পৌঁছায় বাংলার সমৃদ্ধি।
জাহাজটি বন্দরে পৌঁছানোর পরদিন ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা শুরু হয়।
মি. দত্ত জানিয়েছেন জাহাজটিতে এক মাসের খাদ্য মজুত রয়েছে।
দুইদিন আগে আটকে পড়া জাহাজের একজন নাবিক বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে দেশে ফিরে আসার জন্য তাদের তীব্র আকুতির কথা জানিয়েছিলেন।
বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজটির মালিক বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন।








