আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
কোভিড ভ্যাক্সিন: স্কুলগেট থেকে সোশাল মিডিয়া, সর্বত্র দ্বিধাদ্বন্দ্ব
- Author, সাগুফতা শারমীন তানিয়া
- Role, লেখক, লন্ডন
গত ১৯শে জানুয়ারি গুগল তার নামের প্রতিটি অক্ষরকে পরিয়েছে নীল মাস্ক, আর বলছে, "ভ্যাক্সিন দাও, মাস্ক পরো, জীবন বাঁচাও।"
হোয়াইট হাউজের মেডিক্যাল অ্যাডভাইজার টনি ফাউচি বলছেন—"কোভিড নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে না, নানান রূপে ঘুরেফিরে আসবে এবং জীবনহানি ঘটাবে। পৃথিবীতে মানুষের রোগবালাইয়ের ইতিহাসে মানুষ কেবল একটি রোগকেই নিশ্চিহ্ন করতে পেরেছিল—তার নাম গুটিবসন্ত। কোভিডের বেলায় তা হবে না, তবে কোভিডের করাল চেহারাটা বদলাবে।"
কদিন ধরে খবরের কাগজ সরগরম হয়ে আছে কোভিডকালীন বরিস জনসনের পার্টি নিয়ে।
এইসব হচ্ছে জাহাজের খবর। সাধারণ মানুষ আদার ব্যাপারী, তারা কাঁচাবাজারে যাচ্ছে, বিয়ে কিংবা আকিকা খাচ্ছে, স্কুল-কলেজে ছেলেমেয়ে পাঠাচ্ছে, ভুগছে। সেরে উঠে বাজার-বিয়ে-স্কুল-কলেজের চক্রে ফিরে আসছে। মাথা ঘামাচ্ছে নতুন বছরে বিদ্যুৎ বিল কতটা বাড়বে তাই নিয়ে।
রেলগাড়ির কামরায় সতর্কবাণী
দরজায় দরজায় লেখা রয়েছে—মাস্ক না পরলে প্রবেশ নিষেধ। রেলগাড়ির কামরায় দরজাগুলোতেও সতর্কবাণী খুলে খুলে আসছে, তবু উড়ে যাচ্ছে না। সেঁটেই আছে।
যে পোস্টম্যানকে লাল জামা গায়ে এই কানাগলিতে ঢুকতে দেখতাম, মাসখানেক পর সে ফিরে এসেছে চিঠি বিলি করতে, শুধু তার চোখ বিমর্ষ, গাল বসা, চলাফেরায় ক্লান্তির ছাপ।
যে ট্যাক্সিড্রাইভার ভগত সিং-এর গ্রামের পাশের গাঁয়ে থাকতো বলে গর্ব করতো, সে সেই যে মুলুকে গেছে আর ফেরেনি।
যে বন্ধু প্রতিবছর আমাদের নতুন বছরের শুভেচ্ছা হিসেবে লাইট-জ্বলা ফুলের তোড়া পাঠাতো মেসেঞ্জারে, তার নামের আগে লেখা 'রিমেম্বারিং'।
আমরা সবাই যেন মেনে নিয়েছি, কেউ কেউ চলে যাবে, কারা যেন থেকে যাবে, যারা থাকবে তাদের জীবন একেবারে বদলে যাবে।
আদার ব্যাপারীর জমায়েত
বাচ্চার স্কুলগেট হচ্ছে আমাদের মতো সেইসব আদার ব্যাপারীর জমায়েত হবার জায়গা। তারাপদ রায় যাদের সম্পর্কে বলেছিলেন—'আমরা যারা দিন আনি, দিন খাই, আমরা যারা হাজার হাজার দিন খেয়ে ফেলেছি'।
রোদবৃষ্টি ঝড়জল উপেক্ষা করে যারা এই লোহার গেটে দাঁড়িয়ে থাকে বাচ্চাদের বাড়ি নিয়ে যাবে বলে।
এই গেটে অপেক্ষমান থাকা অবস্থায় কত কিছু শুনি। আগে শুনতাম মধুরিমার বর কোন শাদা মেয়ের হাত ধরে চলে গেছে অথচ এখন তারা আবার ফেসবুকে হ্যাপি ফ্যামিলি।
শুনতাম অং এর মা আত্মঘাতী হবার চেষ্টা করায় সোশfল সার্ভিস অং আর তার বোনকে কেড়ে নিয়ে গেছে। শুনতাম রোজালিন্ডের স্বামী একটি কিডনি দিয়ে নিজের বাপকে বাঁচিয়েছে।
যেন এখানে এলেই টের পাওয়া যায় আমাদের চারদিকে জীবন প্রবলভাবে ভেঙে পড়ছে আর উঠে বসছে।
আর এখন? কালোজিরা চিবিয়ে আর মধু গিলে সমস্ত রোগের শেফা লাভ করার আস্ফালন শুনি। কোভিড পজিটিভ হয়েও কে বা কারা দিব্যি চলে যাচ্ছে বাজারে, মুদিদোকানে, ফার্মেসিতে, লন্ড্রিতে, সেই ফিসফিস শুনি।
অপেক্ষমান অভিভাবকদের জীবন
ছেলেমেয়ের অসুস্থ অবস্থাতেও অভিভাবকরা জানাচ্ছে না স্কুলে… টেস্ট কিট নেই বাজারে, শুধু শুধু হুজ্জোত… যদি বেশি মিস হয় ক্লাস! সেই গল্পও শুনি।
স্কুলগেটে অপেক্ষমান অভিভাবকদের জীবন এখনো ভেঙে পড়ছে আর গড়ে উঠছে। এখানে অবমুক্ত হচ্ছে সবার একান্ত গল্প। অবাধে। শুধু অনপনেয় কালিতে সেই জীবনগুলোর ওপর ছাপ পড়েছে কোভিডের।
তেমনই একটি দিনের কথা। কে আর কারা ভ্যাক্সিন দিচ্ছেন, কে কোন ডোজে আছে—দ্বিতীয় ভ্যাক্সিন নাকি তৃতীয় অর্থাৎ বুস্টার ডোজে। গল্প করছিলাম আমি আর নুজহাতের আম্মু।
বুস্টার দেবার পরেও কে কত ভুগেছে সেই গল্প।
আদিয়ান আর নুজহাতের আম্মু
আমাদের দিকে হঠাত ফিরে তাকান আদিয়ানের আম্মু—নেকাবের আড়ালে চোখ দুটি স্থির, বলেন, "আমি কোনো ভ্যাক্সিনই দিছি না। বুস্টার তো দেওয়া দূরে থাক।"
নুজহাতের আম্মু আর আমি যারপরনাই বিচলিত।
আদিয়ানের আম্মু ঘোষণা করেন, "আমার আল্লা আছে। আমার কিছু হইতো না।"
ততক্ষণে গেট খুলে দিয়েছে, নুজহাতের আম্মু একহাতে নিজের বোরকা ঠিক করতে করতে গজগজ করেন, "আল্লায় বলছে উট বাইন্ধা রাখার সতর্কতা অবলম্বন করতে, তারপর আল্লার উপরে ভরসা করতে। কয় নাই যে, বান্দা তোমার উট ছাইড়া রাখ, আমি আইস্যা খুঁইজা দিমু।"
পাশ থেকে রামিসার নানীও কানের পেছনে ওড়না গুঁজতে গুঁজতে যোগ দেন, "এত আল্লাবিল্লা করে, এরাই তো কাতারে কাতার গেল বাংলাদেশে! কোভিড এইখানে হওয়া মাত্র দ্যাশে উইড়া গেল, দ্যাশের লোকে কত ভুগবো সেই তোয়াক্কা করছে নাকি!"
ভ্যাক্সিন নিয়ে বিবাদ
ভিড়ের ভেতর নিজ নিজ বাচ্চা খুঁজে নেবার ব্যস্ততায় আমাদের আধ্যাত্মিক আলাপ বাধা পায়। এমনি আলাপ আরো শুনি। সদাপ্রভুর ভক্ত জাহিমের বাবাও ভিড়ের ভেতর একদিন একই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। শাদা-কালো-ব্রাউন-পীত সকল ধর্মের সকল জাতের ভেতরই কেউ কেউ উট ছেড়ে রেখেছে দেখলাম।
কয়েক মাস আগের কথা। একটা কাজে গেছি হাইস্ট্রিট কেনসিংটন। দেখি সেখানেও ইস্টিশনের সামনেই সক্কালবেলা তুমুল বিবাদ লেগে গেছে ভ্যাক্সিন দেনেওয়ালা আর না-লেনেওয়ালার মাঝে।
ভ্যাক্সিনবিরোধীরা খুব আওয়াজ তুলেছে। ভিড়ের ভেতর এখানেও যেন রয়েছে নুজহাতের আম্মু, আদিয়ানের আম্মা, জাহিমের বাবা কিংবা রামিসার নানী। এদের কেউ কেউ দ্বিধায় দুলছে, কেউ চুপটি করে দাঁড়িয়ে শুনছে, ভ্যাক্সিনবিরোধীদের পারলে রীতিমতো পেটায়। উৎসুক মানুষ জড়ো হচ্ছে, কিংবা তর্ক করছে। উভয়পক্ষই অতীব আবেগদীপ্ত।
ভ্যাক্সিন নিয়ে দ্বিধা
অফিস অফ ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক্স তাদের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে বলছে, বিলেতে ৯৬% মানুষের মন ভ্যাক্সিনের ব্যাপারে নির্দ্বিধ। জাতের ভেতর কালোদের ভেতর ভ্যাক্সিন নিয়ে দ্বিধা তুলনামূলক বিচারে বেশি (২১%), ধর্মের দিক থেকে মুসলিমদের বা অন্যান্য (সংখ্যাগুরু ধর্মগুলোর বাইরে অন্য যে ধর্মগুলো রয়েছে) ধর্মাবলম্বীদের ভেতর ভ্যাক্সিন নিয়ে দ্বিধা সর্বোচ্চ (১৪%)।
সুবিধাবঞ্চিত সমাজে এই দ্বিধার প্রাদুর্ভাব বেশি, প্রাপ্তবয়স্ক অথচ বেকার এমন মানুষদের মাঝে বেশি, কমবয়স্কদের মাঝে বেশি। শিশুদের ভ্যাক্সিন দেয়া হবে কি না, উচিত হবে কি না, তা নিয়েও মানুষের মনে আছে হরেক দোদুল্যমানতা।
সোশাল মিডিয়ার ভ্রান্ত অপপ্রচারে অনেক এথনিসিটির মানুষ ভ্যাক্সিন দেয়া থেকে বিরত রয়েছেন। তা এদেশে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এবং ব্যক্তির বাকস্বাধীনতাই শেষ কথা, অন্তত এখনো। কেউ যদি ভ্যাক্সিনের বিরুদ্ধে বলতে চায়, বলবে। কেউ যদি জীবাশ্ম জ্বালানি বা ফসিল ফুয়েলের ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে চায়, করবে।
আব্বাসউদ্দিন আর জসীম উদ্দিন এর কথা
অত্যন্ত সংক্রামক ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের হাতে ভ্যাক্সিন-দ্বিধাগ্রস্ত সমাজ ভুগবে বেশি। ফলে ভ্যাক্সিন সচেতনতা তৈরিতে সরকার উঠে-পড়ে লেগেছে। ভাবতে গিয়ে মনে পড়ে গেল, পঞ্চাশের দশকের পূর্ববাংলার গ্রামে গ্রামে আব্বাসউদ্দিন আর জসীম উদ্দিন ঘুরে বেড়াতেন, গণস্বাস্থ্য, টিকাদান এবং সাধারণ পরিচ্ছন্নতা নিয়ে গান বাঁধতেন, গাইতেন আর সচেতনতা তৈরি করতেন।
পলায়নপর, পশ্চাৎপদ কমিউনিটিগুলোতে শিল্পীরা এগিয়ে আসলে বড় ভালো হতো।
নিভন্ত চুল্লি থেকে আশার ফুলকি
প্যান্ডেমিকের ভেতর দিয়ে রক্তস্নান করে উঠে এসেছে মানুষ। তাদের শরীর জুড়ে ক্ষত, মন জুড়ে জিজ্ঞাসা। কবে ফুরাবে এই দুঃসময়! ভ্যাক্সিন নিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের এই দ্বিধা পিছিয়ে দিতে পারে যে কোনো সামগ্রিকভাবে শুভ সম্ভাবনাকে।
তবু ছোট বড় আশার ফুলকি উঠে আসছে নিভন্ত সব চুল্লি থেকে। এই যেমন, সপ্তাহখানেক আগেই টিভির খবরে দেখলাম, একশো হাজারের ওপর ল্যাপটপ যুক্তরাজ্যের সাধারণ মানুষ দান করেছে যুক্তরাজ্যের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের। প্যান্ডেমিকের সময় যারা ল্যাপটপ ছাড়া অনলাইনে পড়ালেখা করতে পারতো না।
দানের সময় কেউ দেখেনি কে কোন জাতের, কে কোন বিশ্বাসের, কে কোন সমাজের। শুধু দেখেছে মানবশিশু বিকশিত হতে চায়, একটি দান সেই বিকাশমানতাকে স্থায়ী করতে পারে। এমন একেকটা গল্পই কি আমাদের কল্যাণকামিতায় বিশ্বাস ফিরিয়ে আনবার জন্য যথেষ্ট নয়?