বাংলাদেশে পাকিস্তানের পতাকা ওড়ানো নিয়ে বিতর্ক, আদৌ কোন বিধিনিষেধ রয়েছে?

- Author, সানজানা চৌধুরী
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
মিরপুরের শের-ই -বাংলা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মধ্যে চলতি টি-টোয়েন্টি সিরিজে পাকিস্তান দলকে সমর্থন এবং দেশটির পতাকা ওড়ানোর ঘটনাকে "গর্হিত অপরাধ" বলে মন্তব্য করেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।
এতে বাংলাদেশের পতাকা বিধিমালার লঙ্ঘন হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সোমবার বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, বাংলাদেশের পতাকা বিধিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে অন্য দেশের পতাকা এদেশে উত্তোলন করা যাবে না।
"সেক্ষেত্রে পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে এবং 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ' স্লোগান দেয়া অবশ্যই এই দেশের নীতি ও আদর্শবিরোধী একটি কাজ। এটা খুবই দুঃখজনক," বলেন তিনি।
বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশের পতাকা ওড়ানোরও সমালোচনা করেছেন তিনি।
"পাকিস্তান সমর্থকদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে"
ক্রিকেটে পাকিস্তান দলকে সমর্থন করা বাংলাদেশে একটি বিভেদমূলক বিষয়। এবারের সিরিজের শুরু থেকেই গ্যালারিতে পাকিস্তানি পতাকা ওড়ানো নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে।
মিরপুরের এই স্টেডিয়ামের কাছেই বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম উর্দুভাষী সম্প্রদায়ের বসবাস। মাঠে আসা পাকিস্তান সমর্থকদের অনেকেই ওই সম্প্রদায়ের বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আবার কিছু গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তান সমর্থকদের মধ্যে কয়েকজন বাংলাদেশিও রয়েছেন।
এ ব্যাপারে আ ক ম মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন, পাকিস্তানের পতাকা ওড়ানোর বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখবেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
রবিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।
এরই মধ্যে বিভিন্ন ফুটেজ ও ছবি দেখে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন।
কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানান নি মি. হক।
তবে তিনি বলেছেন, তারা প্রাথমিকভাবে কাউন্সেলিং বা বোঝানোর চেষ্টা করবেন।
আরও পড়তে পারেন:
মি. হক বলেন, "আমরা জানতে চাই তারা কারা। তারা বাংলাদেশের নাগরিক হলে তারা বাংলাদেশের নীতি, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও শিষ্টাচার পরিপন্থী কাজ করেছে। আর এগুলো আইনেরই কাছাকাছি, এটাকে কনভেনশন বলা যেতে পারে। খেলার মাঠে পতাকা ওড়ানো নিয়ে আইনে সেভাবে কিছু বলা না থাকলেও নজির স্থাপন হতে পারে।"
বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এই পতাকা ওড়ানো নিয়ে যারা সমালোচনা করছেন তাদের অনেকেই বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের রাজনীতি ও দ্বন্দ্বের ইতিহাসকে টেনে আনছেন।
অনেকেই আবার এটাকে প্রিয় দলকে সমর্থন করতে পারার স্বাধীনতা বলে মনে করেন।
পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন জানানো নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই মি. হকের, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিপক্ষ অন্য কোন দেশ।
অনেকটা আক্ষেপের স্বরে মি. হক বলেন, "গণতান্ত্রিক দেশে, যে কেউ যেকোনো দেশ সমর্থন করতে পারে। কিন্তু যেখানে বাংলাদেশের সাথে খেলা হচ্ছে সেখানে এদেশের ছেলেমেয়েরা নিজের দেশ রেখে সমর্থন করছে পাকিস্তানকে, তাদের দেশের পতাকা ওড়াচ্ছে, স্লোগান দিচ্ছে। এটা আমাদের বিব্রত করে। যদি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অন্য কোন দেশের খেলা হতো তাহলে এ নিয়ে এতো বিতর্ক হতো না।"

ভিনদেশি পতাকা ওড়ানোর ব্যাপারে কী বলা আছে?
বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা বিধি (পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ ফ্ল্যাগ রুলস ১৯৭২) অনুযায়ী, বাংলাদেশে অবস্থিত কূটনৈতিক মিশনসমূহের চ্যান্সারি ভবন এবং কনস্যুলার অফিসসমূহে বিদেশের 'জাতীয় পতাকা' উত্তোলন করা যেতে পারে।
কূটনৈতিক মিশনের প্রধান কর্মকর্তারা সেইসঙ্গে দেশটির রাষ্ট্র প্রধান, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীরা বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সফরের সময় তাদের সরকারি ভবন এবং গাড়িতে 'জাতীয় পতাকা' উত্তোলন করতে পারবেন।
বাংলাদেশে অবস্থিত কূটনৈতিক মিশন তাদের জাতীয় দিবস উপলক্ষে যে স্থানে সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হবে, সেখানে তাদের জাতীয় পতাকা ওড়াতে পারবেন। তবে শর্ত থাকে যে, বাংলাদেশের পতাকা 'সম্মানজনক স্থানে পাশাপাশি উত্তোলন' করতে হবে।
এবং এসব সুবিধা শুধুমাত্র সেইসব দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা বাংলাদেশকেও অনুরূপ সুবিধা দেবে।
এসব বিধির বাইরে বাংলাদেশ সরকারের সুনির্দিষ্ট অনুমোদন ব্যতীত, বিদেশি রাষ্ট্রের পতাকা কোন গাড়িতে বা ভবনে উত্তোলন করা যাবে না।
অন্যান্য দেশের পতাকার সাথে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হলে, বাংলাদেশের পতাকার জন্য সম্মানিত স্থানটি বা 'প্লেস অব অনার' সংরক্ষিত রাখতে হবে ।
অন্য কোন পতাকা বাংলাদেশের পতাকার চেয়ে উঁচুতে উত্তোলন করা যাবে না। অন্যান্য দেশের পতাকার সাথে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পতাকা সবার প্রথমে উত্তোলন করতে হবে এবং সবশেষে নামাতে হবে।
যদি দুই বা ততোধিক দেশের পতাকা প্রদর্শিত হয়, সেক্ষেত্রে প্রতিটি পতাকা পৃথক পৃথক দণ্ডে উত্তোলন করতে হবে এবং পতাকাগুলো প্রায় সমান আয়তনের হবে।
যদি পতাকার সংখ্যা দুটি হয় তবে বাংলাদেশের পতাকা ডান দিকে উত্তোলন করতে হবে ।
পতাকার সংখ্যা যদি দু'য়ের অধিক হয়, বেজোড় সংখ্যার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পতাকা কেন্দ্রস্থলে এবং জোড় সংখ্যার ক্ষেত্রে কেন্দ্রস্থলের ডান পাশের প্রথম স্থানে উত্তোলন করতে হবে ।
অন্য কোন পতাকার সংগে আড়াআড়িভাবে পতাকা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পতাকাটি অন্য পতাকার ডান পাশে থাকবে।

খেলার মাঠে পতাকা ওড়ানো নিয়ে বিধিনিষেধ আছে?
পতাকা বিধিমালার সব ধারাই পতাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। খেলার মাঠে বা অন্য কোন দেশের সমর্থনে পতাকা ওড়ানোর বিষয়ে আইনে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা নেই।
এ নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল আইসিসির হ্যান্ডবুক, রুল বুক বা ল'জ অব ক্রিকেটেও কোন বিধিবিধান নেই।
বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডের মিডিয়া বিভাগ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট চলাকালে মাঠে বা অনুশীলনে পতাকা ব্যবহারের বিষয়ে কোন সুনির্দিষ্ট আইন নেই বিসিবির।
এমনিতে দ্বিপাক্ষিক ম্যাচ চলাকালে বাংলাদেশসহ বিশ্বের যেসব মাঠে খেলা চলে সেসব মাঠে অংশগ্রহণকারী দেশ দুটি এবং আয়োজক বোর্ডের পতাকা ওড়ানোর রীতি আছে।
তবে ২০১৪ সালে মিরপুরের মাঠে এশিয়া কাপ টুর্নামেন্ট চলাকালে দর্শক গ্যালারিতে বিদেশি পতাকার আধিক্য নিয়ে তীব্র সমালোচনার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড দর্শকদের মাঠে প্রবেশের সময় ভিনদেশি পতাকা বহনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল।
যদিও এ নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তুমুল সমালোচনা হলে একদিন পরেই সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় বোর্ড।
সাধারণত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচে যে ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে তেমন পরিস্থিতিই চোখে পড়েছে মিরপুরে।
কতিপয় আন্দোলনকারী পাকিস্তানি পতাকা ওড়ানোর বিরুদ্ধে স্টেডিয়ামের বাইরে অবস্থান নিলেও কোন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি।
পাকিস্তানের পতাকা নিয়ে সমর্থকরা স্টেডিয়ামের ভেতরে প্রবেশ করতে পেরেছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
বিসিবির কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেছেন, "আমরা আইসিসিকে জানিয়েছি যে স্টেডিয়ামে দর্শকদের তাদের পছন্দের কোনও দেশের পতাকা বহন করতে বিসিবি নিষেধ করেনি। তবে পতাকার কোন নিয়ম ভঙ্গ হচ্ছে কি না সেটা নিরাপত্তা সংস্থা দেখভাল করবে।"
এর আগে মিরপুরের একাডেমি মাঠে জাতীয় পতাকা গেড়ে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের অনুশীলন নিয়ে বিস্তর সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে।
এ নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কোন মন্তব্য না করলেও পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড বলছে, মাস দুয়েক ধরে অনুশীলনে পতাকা ওড়ানোর এই রীতিটি মেনে আসছে পাকিস্তান দল।
পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের মিডিয়া ম্যানেজার ইব্রাহিম বাদিজ সেসময় বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, "প্রধান কোচ সাকলাইন মোশতাক এই রীতির প্রচলন করেন। পাকিস্তানের হাই পারফরম্যান্স দলের কোচ থাকা অবস্থাতেও তিনি এই রীতি মানতেন।"
সেপ্টেম্বর মাসে পাকিস্তানের মাটিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের সময়েও অনুশীলন চলাকালে তারা মাঠের ভেতরে পতাকা গেড়েছিল।
সম্প্রতি শেষ হওয়া আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও এই রীতি মেনে অনুশীলন করে পাকিস্তান দল।
এর আগে হাই পারফরম্যান্সের অনূর্ধ্ব ১৬ এবং অনূর্ধ্ব ১৯ দলের অনুশীলনে এমনটা দেখা গেছে।








