ইভানা লায়লা চৌধুরী: আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলায় একজন চিকিৎসককে কেন আসামী করা হল

- Author, মুন্নী আক্তার
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ঢাকায় সম্প্রতি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়া একটি আত্মহত্যার ঘটনার দুই সপ্তাহ পরে দায়ের হওয়া আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলায় দেখা যাচ্ছে, আত্মহনন করা ওই নারীর স্বামী ছাড়াও একজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে প্ররোচনা দেবার অভিযোগ আনা হয়েছে।
ঢাকায় ইভানা লায়লা চৌধুরী নামে ওই নারীর আত্মহননের ঘটনা নিয়ে গত দু সপ্তাহ ধরেই বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। সমাজের বিভিন্ন স্তরে ঘটনাটি নানা ধরণের আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
শনিবার রাতে মিজ চৌধুরীর পরিবারের পক্ষ থেকে শাহবাগ থানায় একটিআত্মহত্যা প্ররোচনা মামলা দায়ের করা হয়।
মিস চৌধুরীর বাবা বাদী হয়ে এই মামলাটি দায়ের করেছেন বলে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মওদুদ হাওলাদার জানিয়েছেন।
রাজধানী ঢাকার একটি নামকরা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ক্যারিয়ার গাইডেন্স কাউন্সেলর হিসেবে কাজ করতেন মিজ চৌধুরী।
গত ১৫ই সেপ্টেম্বর পরীবাগ এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই এলাকায় একটি নয়তলা ভবনে মিজ চৌধুরীর স্বামীর বাড়ি। তার মরদেহটি ওই ভবন এবং পাশের আরেকটি ভবনের মাঝখানের সরু জায়গা থেকে উদ্ধার করে পুলিশ।
আরো পড়ুন:
আসামীদের একজন ইভানার চিকিৎসক
শাহবাগ থানার ওসি মি. হাওলাদার জানান, মিস চৌধুরীর আত্মহত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলাটিতে দুই জনকে আসামী করা হয়েছে। এদের মধ্যে একজন মিজ চৌধুরীর স্বামী এবং অন্যজন একজন চিকিৎসক।
পুলিশ বলছে আসামীদের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয়া এবং এতে সহায়তা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে মিজ চৌধুরীর স্বামীর বিরুদ্ধে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আর যে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে তার কাছে চিকিৎসাধীন ছিলেন মিজ চৌধুরী। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে বলা হয়েছে, কোন ধরণের রোগ নির্ণয় করা ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে ইভানা লায়লা চৌধুরীকে এমন ওষুধ দিয়েছেন যা মানসিক রোগের জন্য প্রযোজ্য।
মি. হাওলাদার বলেন, অভিযোগে বলা হয়েছে যে, "কোন ধরণের ডায়াগনোসিস (রোগ নির্ণয়) ছাড়া তাকে মানসিক রোগের ওষুধ দিয়েছেন যা তাকে আত্মহত্যায় ধাবিত করেছে।"
যে কারণে আলোচনা
বাংলাদেশে সরকারি হিসাব বলছে, প্রতিবছর দেশে প্রায় ১১ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। তবে সব ঘটনা যেমন সংবাদমাধ্যমে আসে না, তেমনি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সব ঘটনা নিয়ে আলোচনাও হয় না।
কিন্তু ইভানা লায়লা চৌধুরীর আত্মহননের ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সেটি ব্যাপক আলোচনায় আসে।
ফেসবুকে খবরটি শেয়ার করে নানা ধরণের মন্তব্য করেন। এমনকি বাংলাদেশের একজন সংসদ সদস্যও এ ঘটনা একটি কলাম লিখেছেন যেটি স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
বিএনপির এমপি রুমিন ফারহানা প্রথম আলোতে প্রকাশিত সেই কলামটি ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড আইডি থেকে শেয়ার করে লিখেছেন, "বর্তমানে অনেক মা-বাবাই তাঁদের কন্যাসন্তানের পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার নিয়ে অনেক বেশি মনোযোগী, কিন্তু এটা মোটেও যথেষ্ট নয়। একটা নারী বিদ্বেষী, নারীর প্রতি সহিংস সমাজে শক্তিশালী, স্বাধীনচেতা, সাহসী, দায়িত্ব গ্রহণে পারদর্শী ও সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম নারী হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা আমার কাছে অনেক বেশি দরকারি মনে হয়।"
ফেসবুক ব্যবহারকারীরা অনেকেই এ ঘটনাটি শেয়ার করে বিচারের দাবি জানিয়েছেন। জিনাত জেরিন নামে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, "অতি দ্রুত ইভানা হত্যার বিচার করা হোক, জনগণ জোরালো দাবি জানাচ্ছে।"
শুধু ইভানা লায়লা চৌধুরীর আত্মহত্যার খবর নয় বরং মৃত্যুর আগে তার সাবেক শিক্ষকের কাছে পাঠানো ইমেইল নিয়েও নানা আলোচনা হয়।
এছাড়া মিজ চৌধুরীর বেশ কয়েকটি ফেসবুক পোস্ট এবং বন্ধু-শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে কথোপকথন নিয়েও আলোচনা চলে।
তবে এই ঘটনাটি এতো আলোচনা কেন সে বিষয়ে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং সমাজবিজ্ঞানীরা নানা ধরণের কারণ উল্লেখ করেছেন।
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মেখলা সরকার বলেন, এ ঘটনার সাথে যারা জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে তাদের পারিবারিক এবং সামাজিক অবস্থান, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের মত উপাদান যা নিয়ে মানুষের আগ্রহ অনেক বেশি- সব কিছু মিলিয়ে এই ঘটনাটি নিয়ে মানুষ অনেক বেশি কথা বলছে।
অধ্যাপক সরকার বলেন, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ থাকার জন্য মানুষ আগ্রহী হতে পারে, কারণ মানুষ সব সময়ই অন্যের পারিবারিক গোপন বিষয়ের প্রতি আগ্রহী থাকে।
তিনি বলেন, এছাড়া অভিযোগ রয়েছে যে, মিস চৌধুরীকে ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হত - এটাও একটা অস্বাভাবিক ঘটনা। আর অস্বাভাবিক ঘটনা নিয়ে মানুষের আগ্রহ বরাবরই বেশি, বলছিলেন অধ্যাপক সরকার।
"অনেকের কমন ইন্টারেস্টের বিষয় (সাধারণ আগ্রহের বিষয়) এখানে জড়িত বিধায় এই ঘটনা নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা হচ্ছে," বলেন তিনি।

ছবির উৎস, Getty Images
ব্যতিক্রমী ঘটনা
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ইভানা লায়লা চৌধুরীর আত্মহত্যার বিষয়টিতে নানা ধরণের উপাদান রয়েছে, যা এই ঘটনাটিকে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনায় পরিণত করেছে। আর এ কারণেই এটি নিয়ে মানুষের আগ্রহের কমতি নেই।
সমাজবিজ্ঞানী ড. মাহবুবা নাসরীন বলেন, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী এবং স্তরের মানুষের সাথেই ঘটনাটির যোগাযোগ আছে অর্থাৎ বিভিন্ন স্তরের মানুষ এই ঘটনাটির সাথে অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় যে উপাদান সবার আগে আছে সেটি হচ্ছে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ। এই বিষয়টি নিয়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহ ব্যাপক হওয়াটা একটা কারণ।
"যেকোন ঘটনায় মানুষের স্বাভাবিক কৌতূহল তো থাকেই, আর ঘটনা যদি একটু ব্যতিক্রমী হয় সেটি নিয়ে মানুষ একটু বেশি কথা বলেই থাকে।"
বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থার বিভাজনও এ বিষয়ে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন তিনি। নানা স্তর বিশিষ্ট সমাজে উচ্চবিত্ত বা সচ্ছল পরিবারে কোন ঘটনা ঘটলে সেটি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। ধনী-দরিদ্রের বিভাজনের মধ্যে বিষয়টিকে ফেলা যায়।
পারিবারিক দ্বন্দ্ব, ঘটনার ধারাক্রম কিভাবে এগিয়ে যায় সে বিষয়ে মানুষের আগ্রহ থাকে। যার কারণে এগিয়ে চলে আলোচনা।
এছাড়া এই ঘটনায় চিকিৎসকের বিরুদ্ধে যে অভিযোগটি তোলা হয়েছে, সেটি হয়তো অনেকেই নিজেদের সাথে মিল খুঁজে পাচ্ছেন বলেও মনে করেন তিনি।

ছবির উৎস, Getty Images
ড. নাসরীনের ভাষায়, "অনেকে প্রকাশ করে না, কিন্তু তালাকের মত ক্ষেত্রে অনেক সময় কারো মানসিক রোগের ওষুধ গ্রহণ করার কাগজপত্রকে দলিল হিসেবে দেখানো হয়।"
"কারো যদি অসৎ উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে বলা হয় যে, সে ডিপ্রেশনের ওষুধ খেতো, এই করতো, সেই করতো," তিনি বলেন।
ড. মাহবুবা নাসরীন বলেন, এই ঘটনার সাথে শহুরে জীবনের একাকীত্বের বিষয়টিও জড়িত। মিজ চৌধুরী মৃতদেহ দুটি বহুতল ভবনের মাঝখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। যেখানে তার মৃতদেহটি তেমন কারো চোখে পড়েনি। শহুরে জীবন কতটা ব্যস্ত এবং এখানে জীবন-যাপন কতটা কঠিন সে বিষয়েও মানুষ আলোচনা করছে।
তবে আত্মহত্যার এই ঘটনাটির প্রচার নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং সমাজবিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, এধরণের ঘটনা নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনা মোটেই ইতিবাচক নয়।
এ ধরণের আলোচনা অনেককেই একই ধরণের আরেকটি ঘটনা ঘটানোতে প্ররোচিত করতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তারা।
তারা বলছেন, যেকোনো সমস্যার সমাধান কখনোই আত্মহত্যা হতে পারে না।











