ইতিহাসের সাক্ষী: স্পেস শাটল কলাম্বিয়ার মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন

ছবির উৎস, Getty Images
১৯৮১ সালের এপ্রিল মাসে মানুষের মহাশূন্য অভিযানের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সেদিনই প্রথম উৎক্ষেপণ হয়েছিল নাসার প্রথম স্পেস শাটল কলাম্বিয়া - পৃথিবীর প্রথম পুনর্ব্যবহারযোগ্য মহাকাশযান।
এটিই ছিল প্রথম মহাকাশযান যাতে করে নভোচারীরা উড়োজাহাজের মত মহাশূন্যে আসা-যাওয়া করতে পারতেন।
কিন্তু বেশ কিছু দুর্ঘটনার পর এ কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যায়।
ইতিহাসের সাক্ষীর এই পর্বে স্পেস শাটলের প্রথম মহাশূন্য যাত্রার নভোচারীদের সাথে কথা বলেছেন বিবিসির এ্যালেক্স লাস্ট।
বছরের পর বছর ধরে পরিকল্পনা, শত শত কোটি ডলার খরচ , বহু রকম সমসা আর শেষ মুহূর্তে দেরির পর - অবশেষে ১৯৮১ সালের এপ্রিলে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারে উৎক্ষেপণের জন্য তৈরি হয় স্পেস শাটল কলাম্বিয়া।
এটা দেখতে ছিল অনেকটাই একটা এরোপ্লেনের মত। তার সাথে লাগানো ছিল বুস্টার রকেট আর জ্বালানির একটি বিশাল ট্যাংক।
এটা ছিল এক বৈপ্লবিক মহাকাশযান। বলা যায়, মানুষের মহাশূন্য অভিযানে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। কারণ - এমন ভাবে এই যানটি তৈরি করা হয়েছে যা আবার ব্যবহার করা যাবে এবং মহাকাশ স্টেশনে নানা রকম সরঞ্জাম বহন করে নিয়ে যাবার কাজে লাগানো হবে।
প্রথম এই মিশনে ছিলেন মাত্র দুজন নভোচারী। একজন হলেন কম্যাণ্ডার এবং চাঁদের বুকে পদচারণাকারী অভিজ্ঞ জন ইয়ং, আরেকজন নবীন রবার্ট ক্রিপেন।
আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Space Frontiers
ক্রিপেন বলছিলেন, যখন উৎক্ষেপণের মাত্র এক মিনিট বাকি তখন আমি পাশে বসা জনকে বললাম - জন, আমার মনে হচ্ছে আমরা কাজটা করতে পারবো।
"আমার মনে হয় তখন আমার হৃৎপিণ্ডের গতি ১৩০এ উঠে গিয়েছিল। আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।"
এর পর কলাম্বিয়া উ'ক্ষেপণ হলো। দু মিনিট পর স্পেস শাটল থেকে জ্বলন্ত বুস্টার রকেট দুটি খসে পড়লো, ঠিক যেমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
ক্রিপেন বলছিলেন, "এটা ছিল টি এস ওয়ান - একটা পরীক্ষামূলক যন্ত্র, আমরা যেটা প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম তা হলো এটা কাজ করে কিনা। আমাদের কাজটা ছিল টেকঅফ করা, যানটিতে থাকা সবরকম সিস্টেমসগুলো চেক করা, এবং তার পর নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসার মহড়া শুরু করা।"
উৎক্ষেপণের মাত্র সাড়ে আট মিনিটের মধ্যে স্পেস শাটলটির গতি ছিল ঘণ্টায় ১৭ হাজার মাইল।
এর পর যানটির সাথে থাকা জ্বালানির ট্যাংকটিও খসে পড়লো। তার পর এটি পৃথিবীর ১৭০ মাইল ওপরে একটা কক্ষপথে প্রবেশ করলো। এটি ৩৬ বার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করলো। প্রতিবার পৃথিবীর চার পাশে ঘুরে আসতে সময় লাগছিল ৯০ মিনিট।

ছবির উৎস, Bettmann
মহাশূন্যচারী দুজন চেষ্টা করছিলেন শাটলটির দরজা খোলা ও বন্ধ করার - যাতে পরবর্তী মিশনের নভোচারীরা এভাবে মহাশূন্যে থাকা উপগ্রহগুলোকে যানে তুলে নিতে পারেন।
ঘন্টা খানেক পর মহাশূন্যে থাকা অবস্থায় স্পেস শাটলে প্রথম ছবি হাতে পেলো নিয়ন্ত্রণ কক্ষ।
কিন্তু এ সময়ই তারা একটা সমস্যা দেখতে পেলেন। স্পেস শাটলের ওপরের ঢাকনা খোলার সময় তারা খেয়াল করলেন, - পুরো যানটি যে তাপরোধী টাইল দিয়ে ঢাকা, লেজের দিকে তার কয়েকটি নেই।
তবে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে বলা হলো, এগুলো অত্যবশ্যক কোন টাইল নয়। এগুলো না থাকলেও যান বা নভোচারীদের কোন ক্ষতি হবে না।

ছবির উৎস, Getty Images
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল শাটলটির নিচের দিকে কোন তাপ-রোধী টাইল খসে পড়েছে কিনা। কারণ পৃথিবীতে অবতরণ করার সময় বায়ুমণ্ডলের সাথে ঘর্ষণে যে প্রচণ্ড তাপ তৈরি হবে - সেটা প্রধানত ওই জায়গাটিকেই সহ্য করতে হবে।
নভোচারী জন ইয়ং বলছিলেণ, তাদের মনের ভয় কেটে যাবার মত কোন কর্মসূচি নাসার ছিল না।
"যখন আমরা বাইরের দিকে তাকাচ্ছিলাম তখনই লেজের দিকে টাইল খসে পড়ে যাবার কথাটা মনে আসছিল, আর খুব নার্ভাস হয়ে পড়ছিলাম। তবে যখন আমরা দেখলাম যে আর কোথাও টাইল খসে পড়েনি, তখন ভয়টা কেটে গেল।"
অভিযানের বাকি সময়টা শাটল ঠিকভাবেই তার কাজ করে গেল।
স্পেস শাটলের কৃত্রিম বায়ুচাপযুক্ত কেবিনে নভোচারীরা একটি রাত কাটালেন। তাদের পাশ দিয়ে পৃথিবী তখন ঘন্টায় ১৭ হাজার মাইল বেগে ঘুরছে। সেই দৃশ্য বেশ উপভোগ করলেন নভোচারীরা।

ছবির উৎস, Space Frontiers
জন ইয়ং বলছিলেন, রাতে স্পেসশাটলের ভেতরে ঘুমানোর সময় তাদের বেশ ঠান্ডা লাগছিল। জানালা দিয়ে পৃথিবীর দৃশ্যের খুব সুন্দর কিছু ছবি তোলেন তারা।
কলাম্বিয়া যখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দিয়ে উড়ছে তখন - আমেরিকার টিভি দর্শকরা ক্রিপেন এবং ইয়ং এই দুই নভোচারীর বেশ কিছু ছবি দেখতে পেলেন।
কম্যান্ডার ইয়ং বলছিলেন, স্পেস শাটল নিখুঁতভাবে কাজ করছে।
জন ইয়ং বলছেন, "আমাদের যেসব টেস্ট করার কথা তার সবগুলোই করেছি। প্রথম ফ্লাইট হিসেবে আমরা যতটা আশা করেছিলাম - সবকিছুই তার চেয়ে অনেক ভালোভাবে কাজ করছে।"
৫৪ ঘন্টা ধরে পৃথিবীর চার পাশে ঘোরার পর শাটল কলাম্বিয়ার ঘরে ফেরার সময় হলো। এখন চ্যালেঞ্জটা হলো বায়ুমণ্ডলে ঢোকার চ্যালেঞ্জটা সামাল দেয়া, এবং তার পর ক্যালিফোর্নিয়ার মাটিতে অবতরণ করা।
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢোকার আগে এটাই ছিল নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সাথে কলাম্বিয়ার শেষ যোগাযোগ।
এটাই হচ্ছে এই অভিযানের সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ। স্পেস শাটলটির গায়ে তাপরোধী যে আবরণ লাগানো হয়েছে - তার আসল পরীক্ষাও এখানেই। এই ২১ মিনিট সময় স্পেস শাটলের সাথে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কোন যোগাযোগ থাকবে না - এবং এই সময়টা তাদের রুদ্ধশ্বাস উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করতে হবে।

ছবির উৎস, Roger Ressmeyer
নিচে ক্যালিফোর্নিয়ার মরুভূমিতে রানওয়ে টুযেন্টি থ্রি তখন প্রস্তুত। এটা ছিল একটা শুকিযে যাওয়া লেকের মাঝখানে পাঁচ মাইল দীর্ঘ মাটির একটা অবতরণক্ষেত্র।
এই অবতরণ নিয়ে মানুষের এমনই আগ্রহ যে - তা দেখতে হাজার হাজার লোকের সমাগম হচ্ছে। বিমানঘাঁটির বাইরের রাস্তায় তখন গাড়ির ভিড়ে ৬ মাইল দীর্ঘ ট্রাফিক জ্যম তৈরি হয়েছে।
কলাম্বিয়া তখন ঘন্টায় ২০০ মাইল গতিতে ক্রমশ নিচের দিকে নেমে আসছে। এটা ছিল একটা গ্লাইডার - অর্থাৎ ইঞ্জিনবিহীন বিমানের অবতরণের মত। কলাম্বিয়া বিমানের মত দেখতে হলেও এতে কোন ইঞ্জিন নেই, তাই অবতরণের সময় কোন ভুল করার সুযোগ ছিল না।
খুব সুন্দরভাবে নিখুঁত একটা ল্যান্ডিং করলো কলাম্বিয়া। পৃথিবীর মাটিতে প্রথম পুন:ব্যবহার যোগ্য মহাকাশযানের প্রত্যাবর্তন।

ছবির উৎস, Fairfax Media Archives
জন ইয়ং এবং রবার্ট ক্রিপেন দুজনেই এর পরে অনেকবার স্পেস শাটল মিশনে অংশ নিয়েছেন।
জন ইয়ংএর কথায়, "আমার মনে হয়, প্রথম মিশনে আমরা দেখাতে পেরেছি যে এই স্পেস শাটল কত ভালোভাবে কাজ করে। আর এতে ওড়ার অনুভুতিও অনেকটা বিমানে ওড়ার মতই। এটাতে চড়ে প্রায় যে কেউই মহাকাশে যেতে পারবে।"
ক্রিপেন বলছিলেন - "এই শাটলে করে আমরা বহু রকম লোককে মহাশূন্যে নিতে পেরেছি। তাদের নভোচারী বানাতে পেরেছি। আমাদের শুধু টেস্ট পাইলট ব্যবহার করতে হবে এমন কোন ব্যাপার আর ছিল না। কাজেই আমরা মহাকাশচারী নেবার ক্ষেত্রে আওতাটা আরো বাড়াতে পেরেছি।"

ছবির উৎস, Getty Images
জন ইয়ং বলেন, ৱএকটা বিরাট সুবিধা ছিল যে প্রতিবারই আমরা শাটলে করে অনেক বেশি সরঞ্জাম বহন করে নিতে পেরেছি। এটা আমরা আগে কখনো পারি নি। আমরা সব ধরনের ব্যবহারকারীর জন্য মহাকাশকে উন্মুক্ত করে দিতে পেরেছি।"
স্পেস শাটল যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ কর্মসূচিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল্।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন নির্মাণে, এবং হাবল টেলিস্কোপ মেরামতে এর ভুমিকা ছিল বিরাট।
কিন্তু এই স্পেস শাটল অনেক মর্মান্তিক দুর্ঘটনাতেও পড়েছে।
চ্যালেঞ্জার এবং কলাম্বিয়া এই দুটি শাটলই পরে দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত হয়। সাথে সাথে নিহত হন তার সকল আরোহীও।

ছবির উৎস, Alain Nogues
অবশেষে ২০১১ সালে শাটল কর্মসূচির অবসান হয়।
এখন মনে করা হচ্ছে যে মহাশূন্যে উপগ্রহ পাঠানোর জন্য মনুষ্যবিহীন রকেটই অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এবং সস্তা পদ্ধতি।
কিন্তু অনেকেই এখনো স্বপ্ন দেখেন যে - পুনর্ব্যবহারযোগ্য একটি মহাশূন্য বিমান একদিনে আবার ফিরে আসবে।
ক্রিপেন বলছেন -"এটা ছিল একটা দারুণ যন্ত্র কিন্তু খুবই ভঙ্গুর। এর অনেক রক্ষণাবেক্ষণ দরকার হতো। রাজনীতি আর একাধিক দুর্ঘটনা এর সমাপ্তি ডেকে এনেছে।"
"কিন্তু স্পেস শাটলের মতো অসাধারণ আরেকটি মহাকাশযান পেতে আমাদের অনেক দিন অপেক্ষা করতে হবে।"








