হ্যান্ড ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ: জলবসন্তের সাথে অসুখটির পার্থক্য যেভাবে বুঝবেন

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শাহনাজ পারভীন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
হ্যান্ড ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ বাংলাদেশে খুব একটা হয় না। তবে চিকিৎসকেরা বলছেন, ইদানীং রোগটি আগের চেয়ে কিছুটা বেশি দেখা যাচ্ছে।
এটি ছোঁয়াচে এবং মূলত শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। তবে বড়দেরও হতে পারে। এর লক্ষণগুলোর সাথে জলবসন্তের মিল রয়েছে।
তাই অনেক সময় এটিকে জলবসন্তের সাথে মিলিয়ে ফেলেন অনেক অভিভাবক। এমনকি বাংলাদেশে চিকিৎসকেরাও অনেকসময় ভুলটি করে থাকেন।
গত মাসের ২৫ তারিখ ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা মুক্তা আক্তার খেয়াল করলেন তার ১৮ মাস বয়সী মেয়ের গায়ে একটা দুটো করে ফুসকুড়ি দেখা দিচ্ছে। তিনি বলছেন, শুরুতে ভেবেছিলেন জলবসন্ত।
"পরের দিন দেখলাম ফুসকুড়ির সংখ্যা বেড়ে গেছে। ডাক্তারের সাথে অনলাইনে কথা বললাম, ছবি পাঠালাম। তিনি বললেন এটা চিকেন পক্স। উনি সেটার জন্য কিছু ওষুধ দিলেন।"
এর সপ্তাহ খানেক পর শিশুটির উচ্চ তাপমাত্রার জ্বর ও কাশি দেখা দেয়। তখন সরাসরি চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি জানান এটি আসলে হ্যান্ড ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ।
মুক্তা আক্তার বলছেন, "যদি সময়মত তফাৎটা বুঝতে পারতাম তাহলে হয়ত বাচ্চাটা এত কষ্ট পেত না।"

ছবির উৎস, Getty Images
যেভাবে পার্থক্য বুঝবেন
ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশুরোগ বিভাগের চিকিৎসক ডা. রওনক জাহান বলছেন, হ্যান্ড ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ এবং জলবসন্ত দুটোই ভাইরাসজনিত অসুখ।
দুটোর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে হ্যান্ড ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজে গলা ব্যথা, জ্বর এবং খাবারে অরুচি প্রথম দিকের উপসর্গ। এর কয়েকদিন পর মুখ ও জিহ্বায় পুঁজযুক্ত ঘায়ের মত ফুসকুড়ি হয়।
যাতে ব্যথা হতে পারে, খেতে কষ্ট হতে পারে। এই অসুখে হাতে এবং পায়ে ত্বকের রঙ অনুযায়ী গোলাপি, লাল অথবা কাল রঙের উঁচু গোটা দেখা দেয়। পরে তা পানিযুক্ত ফুসকুড়ির মতো হয়ে ওঠে।
বেশিরভাগ সময় হাত, পা এবং জিহ্বাতেই ফুসকুড়ি দেখা দেয় তবে উরু অথবা নিতম্বেও মাঝে মাঝে হয়ে থাকে।
শিশু এবং বড়দের একই রকম লক্ষণ থাকে। তবে পাঁচ বছরের নিচের বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো বেশি কষ্টদায়ক হয়ে থাকে। অসুখটি একাধিকবার হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল বা সিডিসি'র তথ্যমতে এটি ছোঁয়াচে এবং আক্রান্ত হওয়ার প্রথম সপ্তাহে বেশি ছড়ায়।
রোগীর শরীরের সাথে সরাসরি সংস্পর্শ, আক্রান্ত হওয়ার পর গোটা থেকে বের হওয়া তরল পদার্থ, হাঁচি ও কাশির মাধ্যমে যে 'ড্রপলেট' ছড়ায়, মুখের লালা, সর্দি, মলের মাধ্যমে এর সংক্রমণ হতে পারে।
ডা. রওনক জাহান বলছেন, সাধারণত বর্ষার সময় এটি বেশি হয়ে থাকে। বাংলাদেশে অসুখটি কম হয়। 'ফুট অ্যান্ড মাউথ' নামে গবাদি পশুর একটি অসুখ রয়েছে যা এক নয়।
আর জলবসন্তে জ্বরের সাথে শরীরে বেশ ব্যথা হয়। এর তিন চারদিন পর গোটা দেখা দেয়। তবে শুধু হাত বা পায়ে নয়, সারা শরীরে হতে পারে, শরীরের নির্দিষ্ট যেকোনো স্থানে হতে পারে।
মাথায় এমনকি যৌনাঙ্গেও হতে পারে। জলবসন্তের গোটাগুলোতে তরল পদার্থ থাকে। সারা শরীরে একই ধরনের, যা পেকে ওঠে এবং একপর্যায়ে ফেটে যায়।

ছবির উৎস, Getty Images
এসময় আরও নতুন গোটা দেখা দিতে পারে। জলবসন্তের একটি বড় পার্থক্য হল এর গোটাগুলো খুব চুলকায়।
জলবসন্ত বড়দের ক্ষেত্রে বেশি কষ্টদায়ক হয়। জলবসন্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ক্ষতিসাধন করে। সাধারণত একবার জলবসন্ত হলে দ্বিতীয়বার তা হয় না। একের অধিক জলবসন্ত হওয়া খুব বিরল।
সিডিসির তথ্যমতে জলবসন্ত খুবই ছোঁয়াচে। কোন রোগীর সরাসরি সংস্পর্শে এলে এটি ছড়ায়। অসুখটির লক্ষণ দেখা দেয়ার প্রথম এক থেকে দুইদিন এটি সবচেয়ে বেশি ছড়ায়।
একজন আক্রান্ত ব্যক্তির কাছের মানুষদের মধ্যে ৯০ শতাংশেরই অসুখটি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ডা. রওনক জাহান বলছেন সাধারণত শীতের শেষে এবং বসন্ত মৌসুমে এটি বাংলাদেশে বেশি দেখা দেয়।
রোগ দুটির চিকিৎসা কি?
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস বা এনএইচএস এই অসুখ দুটির চিকিৎসা হিসেবে বেশ কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করেছে। হ্যান্ড ফুট অ্যান্ড মাউথ অসুখের কোন অ্যান্টিবায়োটিক অথবা ঔষধ নেই।
সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে অসুখটি সেরে যায়। এসময় চিকিৎসকেরা প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে বলেন, ফলের জুস খেতে নিষেধ করেন।
নরম খাবার খাওয়ার কথা বলেন, বেশি মশলাযুক্ত খাবার খেতে বারণ করা হয়। ঔষধ হিসেবে শুধু প্যারাসিটামল সেবন করতে বলা হয়।
আরো পড়ুন:

ছবির উৎস, Getty Images
এনএইচএসের তথ্যমতে জলবসন্তেরও ঠিক কোন ঔষধ নেই। এক্ষেত্রেও শুধু প্যারাসিটামল আর চুলকানির জন্য সাথে অ্যান্টি হিস্টামিন জাতীয় ঔষধ সেবন করতে বলা হয়।
প্রচুর তরল খেতে বলা হয়। ঢিলা কাপড় পরতে বলা হয় যাতে গোটা গুলোর সাথে ঘষা না খায়।
ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করলে আরাম লাগতে পারে। হাতের নখ কেটে ফেলা এবং শিশু হলে হাতে মোজা পরিয়ে দেয়া যেতে পারে যাতে চুলকাতে গিয়ে গোটাগুলোর আরও খারাপ অবস্থা না হয়।
আক্রান্ত ব্যক্তিকে দূরে রাখা সংক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়। আক্রান্ত ব্যক্তির উচিত গর্ভবতী, নবজাতক এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাকা।
কখন ডাক্তারের শরণাপন্ন হবেন
এনএইচএসের তথ্যমতে হ্যান্ড ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ হওয়ার পর শিশুর শরীর যদি পানিশূন্য হয়ে পড়ে, উচ্চ তাপমাত্রায় জ্বর হয়, জ্বরের সময় শীত লাগে, যদি ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে লক্ষণ ভালো না হয়, বা আপনি যদি গর্ভবতী অবস্থায় এতে আক্রান্ত হন তাহলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হবেন।
অন্যান্য খবর:








