শিশুদের দৃষ্টিত্রুটি: অভিভাবকরা যেভাবে বুঝবেন, যা করতে পারেন

শিশুর চোখ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ঢাকায় স্কুল পড়ুয়া শিশুদের দৃষ্টিত্রুটি বেশি পাওয়া গেছে।
    • Author, শাহনাজ পারভীন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে ঢাকায় স্কুল পড়ুয়া শিশুদের মধ্যে ৪০ শতাংশের নানারকম দৃষ্টিত্রুটি রয়েছে।

ঢাকা, বরিশাল, নওগাঁ ও জামালপুরে প্রায় ৩৩ হাজার স্কুল পড়ুয়া শিশুর চোখ পরীক্ষা করে গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালের একদল চিকিৎসক।

২০১৯ সালের মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত নার্সারি থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের চোখ পরীক্ষা করেছেন তারা।

গবেষণায় দেখা গেছে ঢাকায় স্কুল পড়ুয়া শিশুদের মধ্যে ৪০ শতাংশের দৃষ্টিত্রুটি রয়েছে।

চারটি জেলায় করা পরীক্ষায় পাওয়া উপাত্তের ভিত্তিতে সারা বাংলাদেশের একটি চিত্র বের করার চেষ্টা করেছেন গবেষকরা।

যার ফল অনুযায়ী সারা দেশে শতকরা ১৪ ভাগ শিশুর দৃষ্টিত্রুটি রয়েছে।

মা ও শিশু

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শিশুরা শারীরিক সমস্যা বোঝাতে পারে না।

শিশুদের চোখের সমস্যা যেভাবে বুঝবেন

শিশু দৃষ্টি বিষয়ে একটি সমস্যা হচ্ছে একটি বয়স পর্যন্ত শিশুর বোঝার ক্ষমতা নেই যে সে কম দেখছে কিনা।

শিশুরা তাদের অনেক শারীরিক সমস্যা বলে বোঝাতে পারে না। সেজন্য তাদের সমস্যা সময়মত চিহ্নিত হয় না বা কখনো একেবারেই হয় না।

আরো পড়ুন:

অনেক ছোট লক্ষণ প্রায়শই নানাবিধ শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।

এই গবেষণায় গবেষক দলের প্রধান ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালের শিশু চক্ষুরোগ ও স্কুইন্ট বিভাগের প্রধান ডা. মো. মোস্তফা হোসেন।

শিশু

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ছোট শিশুর চোখের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করুন।

তিনি বলছেন, অভিভাবকেরা কিছু বিষয় নজরে রাখতে পারেন যার মাধ্যমে শিশুর চোখে কোন ধরনের সমস্যা থাকতে পারে বলে তারা ধারণা পেতে পারেন।

যার ফলে সন্দেহের ভিত্তিতে অভিভাবক তার সন্তানকে নিয়ে অনেক আগেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারেন।

শিশুর চোখের প্রতিক্রিয়া

ছোট এসব লক্ষণগুলো কী হতে পারে তার একটি ধারণা দিয়ে ডা. হোসেন বলছেন, "যদি একদম ছোট শিশু হয়, দেখবেন একদম কোলের শিশু দুধ খাওয়ানোর সময় মায়ের মুখের দিকে তাকায়, এমনিও তাকায়। সামনে যেকোনো বস্তু বা লাইট ধরলে সে সেদিকে তাকায়। অভিভাবকদের খেয়াল করতে হবে শিশু এসব দিকে তাকাচ্ছে কিনা। যদি শিশুর চোখ এসব দিকে না যায় তাহলে অভিভাবকদের সন্দেহ করতে হবে এবং ডাক্তার দেখিয়ে নিতে হবে।"

বাঁকা চোখ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দৃষ্টিত্রুটির কারণে চোখ বাঁকা হতে পারে আবার উল্টোটাও হতে পারে।

বাঁকা বা ট্যারা চোখ এবং চোখের আকার

দুটি চোখের দৃষ্টি যদি দুইদিকে থাকে তাহলে বাংলাদেশে সেটিকে 'ট্যারা' বলা হয়।

এই সমস্যাটি অল্প মাত্রায় হলে তাকে লক্ষীট্যারা বলে হয়ে থাকে। ডা. হোসেন বলছেন, অনেক সময় দৃষ্টিত্রুটির কারণে চোখ বাঁকা হতে পারে, আবার চোখ বাঁকা হওয়ার কারণে দৃষ্টিত্রুটি হতে পারে।

তিনি বলছেন, "চোখের আকারও একটি বিষয়। জন্মের পর থেকে দশ বছর পর্যন্ত শিশুর আইবল বৃদ্ধি পায়। চোখ যদি স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট হয় তাহলে হাইপারোপিয়া হতে পারে অর্থাৎ কাছে দেখতে সমস্যা হবে। আর চোখ যদি স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হয় তাহলে মাইওপিয়া হতে পারে অর্থাৎ দূরের বস্তু ঝাপসা লাগবে," বলছেন ডা. হোসেন।

যেসব বিষয় নজরে রাখতে হবে

স্কুল পড়ুয়া বাচ্চাদেরও অনেক বিষয়ে কিছুটা খেয়াল করলে তার চোখে কোন সমস্যা রয়েছে কিনা সেটার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

ডা. মো. মোস্তফা হোসেন বলছেন, "দেখা যাবে স্কুল পড়ুয়া শিশুরা ব্লাকবোর্ডে লেখা অনেক কিছু ঠিক মতো খাতায় তুলতে পারছে না। কিছু লেখা হয়ত বাদ পড়ে যাচ্ছে। কেন সে খাতায় অনেক কিছু তুলতে পারেনি তার একটি কারণ হতে পারে তার দৃষ্টিত্রুটি।"

শিশু

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শিশুরা এখন অনেক বেশি ডিভাইস নির্ভর।

ছয় মিটার দূর থেকে ব্লাকবোর্ডের লেখা পড়তে পারার কথা। ক্লাসের পেছনে বসা শিশুদের কারো যদি নিয়মিত কিছু মিস হয় তাহলে সেটি চোখের সমস্যা কিনা বিবেচনা করতে হবে।

আর একটি লক্ষ করার বিষয় হল কিছু পড়তে গেলে শিশু চোখ কুঁচকে দেখার চেষ্টা করছে কিনা। অনেক সময় স্কুলের শিক্ষকের নজরেও পড়তে পারে এসব সমস্যা।

যেসব কারণে শিশুদের চোখের সমস্যা হচ্ছে

ঢাকায় শিশুদের বাইরে যাওয়া ও খেলাধুলার সুযোগ খুবই কম। বাইরে কম গেলে তাতে চোখের দৃষ্টি প্রভাবিত হতে পারে।

খুব বেশি সময় ঘরের ভেতরে থাকলে অনেক বেশি কাছের বস্তু দেখা হয়। দৃষ্টি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এতে 'নিয়ার ভিশনে' চাপ পড়ে।

ঘরের মধ্যে খুব বেশি সময় কাটালে মাইওপিয়া হতে পারে। একটি প্রধান কারণ হচ্ছে মোবাইল ফোন অথবা অন্য ডিভাইস নির্ভরতা।

শিশুর পড়াশুনা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, চেয়ার টেবিলে বসে পড়াশুনা করা জরুরি।

কম্পিউটার বা মোবাইল ফোন থেকে এক ধরনের নীল আলোর বিচ্ছুরণ ঘটে। খুব কাছে থেকে নিয়মিত দীর্ঘ সময় নীল উজ্জ্বল আলোর ডিভাইস স্ক্রিন চোখের উপর চাপ সৃষ্টি করে যা দীর্ঘমেয়াদে চোখের ক্ষতি করে।

করোনাভাইরাসের মহামারির কারণে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় স্কুল বন্ধ রয়েছে। এতে শিশুদের অনেক বেশি ডিভাইস নির্ভরতা বেড়েছে। সেটি পড়াশুনা এবং বিনোদন দুটো কারণেই।

চোখে কোন অসুখের কারণে দৃষ্টিশক্তি প্রভাবিত হতে পারে।

অভিভাবকরা যা করতে পারেন

ডিভাইস ব্যাবহার কমিয়ে আনা। করোনাভাইরাসের মহামারির কারণে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ জাতীয় ডিভাইস শিশুদের বেশি ব্যবহার করতে হচ্ছে।

যদি অনেকক্ষণ তা ব্যবহার করতেই হয় সে ক্ষেত্রে একটি ব্যায়াম করা যেতে পারে।

বই পড়া

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শুয়ে, অল্প আলোতে, চোখের বেশি কাছে রেখে বই পড়া নয়।

ডিভাইস ব্যবহার বা বই পড়ার প্রতি ২০ মিনিট পরে ২০ সেকেন্ড ধরে ২০ ফিট দূরের কোন কিছুর দিকে তাকিয়ে থাকা।

সেটি সবুজ গাছ বা ঘাস হলে সবচেয়ে ভাল। সবুজ গাছে বা ঘাসের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের উপকার হয়।

খুব বেশি সময় বই বা কম্পিউটারে তাকিয়ে থাকলে চোখের পলক কমতে থাকে। তাতে চোখের পানি শুকিয়ে যেতে থাকে।

শিশুদের চোখের পলক ফেলতে মনে করিয়ে দিতে হবে। মাঝে মাঝে চোখে পানি দিতে পারেন।

ভিটামিন এ রয়েছে এমন খাবার খাওয়াতে হবে শিশুদের। এটি চোখের অসুখ প্রতিরোধে সহায়তা করে।

শিশু পড়াশুনা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, করোনাভাইরাসের মহামারির কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় পড়াশুনায় ডিভাইস নির্ভরতা বেড়েছে।

সোফায়, বিছানায় বিভিন্নভাবে চিৎ, কাৎ, উপুড় হয়ে পড়ালেখা করা যাবে না। চেয়ার টেবিলে বসে পড়াশুনা করতে হবে।

চোখ থেকে বইয়ের অবস্থান এক থেকে দেড় ফিট দূরে হতে হবে।

টেবিল থেকে লাইট কত দূরে, তার আলো কোন দিক থেকে পড়ার টেবিলে আসছে সেটিও একটি বিষয়। পড়ার জন্য ঘরে আলো সঠিক হতে হবে।

বাইরে যাওয়া ও খেলাধুলা বাড়াতে হবে। মাঠে খেলতে না পারলেও বাড়ির ছাদে গেলেও তা বাইরে যাওয়ার যা উপকার তার কিছুটা পাওয়া যাবে।

চোখের পরীক্ষা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নিয়মিত চোখের পরীক্ষা জরুরি।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল শিশুর চোখে কোন সমস্যা থাকুক বা না থাকুক তার চোখ পরীক্ষা করিয়ে নেয়াই ভালো কারণ অনেক সময় উপসর্গ বোঝা যায় না।

নিয়মিত চোখের পরীক্ষা জরুরি

অভিভাবক কোন সমস্যা বুঝতে না পারলেও অন্তত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কারণে হয়ত সময়মত সমস্যা চিহ্নিত হবে।

ডা. হোসেন মনে করেন সারা বছরজুড়ে স্কুলেই চোখ পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা উচিৎ।

তিনি বলছেন, "কম বয়সে দৃষ্টিত্রুটি থাকলে সেটি পরের দিকে আর চিকিৎসা করা সম্ভব হয় না, যে কারণে ছোটবেলা থেকেই নিয়মিত স্ক্রিনিং জরুরি।"