আসামে ডিটেনশন সেন্টারের নাম বদলে হচ্ছে ট্রানজিট ক্যাম্প, কী লাভ হবে 'বিদেশি' বন্দীদের

    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি, কলকাতা

ভারতের আসাম রাজ্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে, 'চিহ্নিত বিদেশিদের' আটক রাখার জন্য যেসব ডিটেনশন সেন্টার বা বন্দী শিবির আছে, সেগুলির নাম বদল করা হবে।

সরকারের নতুন ঘোষণা অনুযায়ী এখন থেকে সেগুলিকে বলা হবে ট্রানজিট ক্যাম্প।

কথিত ওই বিদেশিদের মুক্তির জন্য কাজ করে এমন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলি বলছে নাম বদল হলেও বন্দীদের দুর্দশার কোনও পরিবর্তন হবে না।

এই 'চিহ্নিত বিদেশি' কারা?

আসামে এরকম ছয়টি বন্দী শিবির রয়েছে, যেগুলো বিভিন্ন সাধারণ কারাগারের অভ্যন্তরেই।

কর্তৃপক্ষ আটক বন্দীদের বিদেশি বলে চিহ্নিত করলেও অ্যাক্টিভিস্টরা এবং বন্দীদের পরিবারগুলোর দাবি যে তাদের বেশিরভাগই আসলে ভারতীয়।

আরও পড়তে পারেন:

ভারতের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য আসামের মানুষকে যেসব নথিপত্র দেখাতে হয়, তার একটি বা দুটি না থাকলেই প্রথমে তাদেরকে 'সন্দেহভাজন বিদেশি' এবং পরে 'চিহ্নিত বিদেশি' বলে অভিহিত করা হয়।

'চিহ্নিত বিদেশিদের' আটক করে রাখা হয় ডিটেনশন সেন্টারে। সেগুলির নামই এখন থেকে রাখা হচ্ছে ট্রানজিট ক্যাম্প।

দেশের সবথেকে বড় বন্দী শিবিরটি তৈরি হচ্ছে গোয়ালপাড়া জেলায়, যেখানে প্রায় তিন হাজার 'চিহ্নিত বিদেশি'কে রাখা যাবে।

শনিবার গুয়াহাটি হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছে গোয়ালপাড়ার ওই শিবিরের কাজ দেড় মাসের মধ্যে শেষ করতে।

গুগল করলেই আসামের নাম আসে

গুগলে ডিটেনশন ক্যাম্প শব্দটি লিখে সার্চ করলেই কম্পিউটারের পর্দায় উঠে আসবে আসামের ডিটেনশন ক্যাম্প বা আটক শিবির সংক্রান্ত একের পর এক খবর।

প্রথম ২৩টি সার্চ রেজাল্ট আসামের ওই ডিটেনশন ক্যাম্পগুলি নিয়েই।

ডিটেনশান সেন্টারের নাম বদল করে ট্রানজিট ক্যাম্প রাখার নির্দেশে অন্য কোনও পরিবর্তনের কথা বলা হয় নি।

আরও পড়তে পারেন:

জাতীয় নাগরিকপঞ্জী বা এন আর সি হালনাগাদের কাজ চলার সময় সাধারণ মানুষকে সহায়তা দিতে আসাম জুড়ে বহু স্বেচ্ছাসেবক গোষ্ঠী তৈরি করেছিলেন, এমন একজন অ্যাক্টিভিস্ট শাহজাহান আলি আহমেদ বলছিলেন এই নাম বদল রিব্র্যান্ডিং ছাড়া আর কিছুই নয়।

নাম বদল কি শুধুই রিব্র্যান্ডিং?

শাহজাহান আলির কথায়, "প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে ভারতে কোনও ডিটেনশান সেন্টার নেই। আর আমাদের আসামের মুখ্যমন্ত্রীর যেহেতু নরেন্দ্র মোদীর কাছের মানুষ হয়ে ওঠার ইচ্ছা, এটা হয়তো সেজন্যই রিব্র্যান্ডিং করা হল।"

"আরেকটা কারণ হতে পারে, জাতীয় আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ডিটেনশন সেন্টার নিয়ে অনেক খবর বের হয়েছে আর এটা গুগলের সার্চ ইঞ্জিন ধরে নিয়েছে। সবগুলোই আসামকে ইন্ডিকেট করে। সেটাও একটা কারণ হতে পারে যে সারা বিশ্ব যে নামটা জানে, সেটা মুছে দেওয়া হল যে আসামে আর ডিটেনশন সেন্টার নেই," বলছিলেন শাহজাহান আলি আহমেদ।

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:

একসময় ছিল প্রায় দু'হাজার বন্দী

আসামের ছয়টি জেলের মধ্যে অস্থায়ীভাবে এই আটক শিবিরগুলিতে একটা সময়ে প্রায় দুহাজার মানুষ বন্দী ছিলেন, যাদের পরিবার পরিজন ভারতীয় হলেও রাজ্যের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল এদের বিদেশি বলে চিহ্নিত করেছে।

এখন যদিও আটক ব্যক্তির সংখ্যা দুশোর নিচে নেমে এসেছে।

সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে এরকম বহু উদাহরণ দেখা গেছে যে কোনও একটা নথি না দেখাতে পারলে যেমন ভারতীয়দের আটক করে ডিটেনশনে পাঠানো হয়েছে, আবার নোটিস না পেয়ে ট্রাইব্যুনালে হাজিরা দেন নি বলেও আটক করা হয়েছে অনেককে।

আবার ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার চর এলাকাগুলিতে এও দেখা গেছে যে নদী ভাঙ্গনের কারণে মানুষকে রাতারাতি জায়গা বদল করতে হয় আর নতুন ঠিকানাসহ পরিচয়পত্র যোগাড় করলেও কর্তৃপক্ষ এগুলোকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করে না।

বিবাহিত নারীদেরও বাপের বাড়ির ঠিকানার সঙ্গে শ্বশুর বাড়ির ঠিকানা না মিললে তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ করা হয়।

এভাবেই জাতীয় নাগরিকপঞ্জী হালনাগাদ করার পরে চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ গেছে প্রায় ১৯ লাখ মানুষের নাম।

এদের মধ্যে বাঙালি হিন্দু আর মুসলমান- উভয়ই রয়েছেন।

এমন এক ব্যক্তির পরিবারের সঙ্গেও দেখা হয়েছিল, যিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর হয়ে কার্গিল যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, অথচ তাকেও বিদেশি বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

'নাম বদলালেও চরিত্র বদল হবে না'

আটক শিবির থেকে বন্দীদের মুক্ত করার জন্য কাজ করে সেন্টার ফর জাস্টিস এন্ড পিস নামের একটি সংগঠন।

তার প্রধান পারিজাত নন্দ ঘোষ বলছিলেন," ডিটেনশান ক্যাম্প থেকে ট্রানজিট বা যেটাই নাম দিক না কেন, আল্টিমেটলি তার চারিত্রিক যে বৈশিষ্ট্য, সেটার কিন্তু পরিবর্তনের কথা এখনও বলা হয় নি। তার থেকে আমরা ধরেই নিতে পারি যে যারা আটক রয়েছে, তাদের কোনও পরিবর্তন হবে বলে আমার মনে হয় না," বলছিলেন পারিজাত নন্দ ঘোষ।

অ্যাক্টিভিস্ট শাহজাহান আলি আহমেদের কথায় ট্রানজিট কথাটার অর্থ যাত্রাপথের মাঝে কোনও একটি বিশ্রামের স্থল। কিন্তু এই বন্দীদের অন্তিম গন্তব্যটা কোথায়? প্রশ্ন মি. আহমেদের।

পরের গন্তব্য কোথায়?

তার কথায়, "গন্তব্য তো সরকার এখন পর্যন্ত দিতে পারে নি। যত মানুষ ডিটেনশনে থেকেছেন, তাদের মধ্যে যারা মারা গেছেন, প্রত্যেকের দেহ কিন্তু সৎকারের জন্য আসামেই তাদের নিজেদের বাসায় পাঠিয়েছে। পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।"

"তাই আমার মনে হয় অন্য দেশের ট্রানজিট পয়েন্ট না, এই ট্রানজিট আসলে আসাম থেকেই আসামে - নিজের দেশ থেকেই নিজের দেশে ফেরত আসার একটা ট্রানজিট পয়েন্ট," বলেন তিনি।

যারা ডিটেনশন সেন্টার বা নাম বদল হওয়ার পর ট্রানজিট ক্যাম্প থেকে ছাড়া পাচ্ছেন, তাদের মুক্তি যে আসলে হচ্ছে না, সেটা বলছিলেন পারিজাত নন্দ ঘোষ।

মাত্র বৃহস্পতিবার ধুবড়ি জেলার মানকাছাড় এলাকার এক নারী সোনা খাতুনকে তারা মুক্ত করেছেন প্রায় ছয় বছর আটক থাকার পরে।

ছাড়া পেলেও মুক্তি নেই

মি. ঘোষ জানাচ্ছিলেন মুক্ত হওয়ার পরেও প্রতি সপ্তাহে তাকে থানায় হাজিরা দিতে যেতে হবে।

"তার বাড়ি থেকে লোকাল থানা অনেক দূর এবং যোগাযোগের অবস্থা খুবই খারাপ। বন্যার সময়ে তো তাদের যাওয়ার কোনও উপায়ই নেই। আর বৃষ্টি না থাকলে অটো ভাড়া একেকজনের দেড়শো টাকা। যদি পুরো অটো ভাড়া করে যায় তাহলে হাজার টাকা নেয় বলে তার ভাই আমাকে জানালেন।"

"এরা তো প্রান্তিক মানুষ - আর প্রত্যেকেই শ্রমজীবী। তাদের পক্ষে প্রতি সপ্তাহে দেড়শো বা হাজার টাকা করে দেওয়া কী সম্ভব? এছাড়া যারা ডিক্লেয়ার্ড ফরেন ন্যাশানাল, কিন্তু জামিনে মুক্ত, তারা কিন্তু কোনও সরকারি সুবিধা পাবেন না।"

আসামের বাংলাভাষী হিন্দু মুসলমান - বিশেষত প্রান্তিক মানুষ - যাদের নিজের দেশের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার হয়তো কোনও নথি নেই, বা হারিয়ে গেছে - যার জন্য তাকে বিদেশি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে - বন্দী শিবিরের নাম বদল হলেও, প্রায় সকলেই বলছেন যে, তাদের জীবনে কোনও পরিবর্তন ঘটবে না।