বরিশালে ইউএনও'র বাসায় হামলা, মধ্যরাতে সংঘর্ষ, মেয়রকে নিয়ে অভিযোগ

দুপুরে মেয়রের বাসার সামনে পুলিশের অবস্থান

ছবির উৎস, Rafiqul Islam

ছবির ক্যাপশান, দুপুরে মেয়রের বাসার সামনে পুলিশের অবস্থান
    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বরিশাল নগরীর কোতোয়ালী থানার পুলিশ জানিয়েছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসায় হামলার সাথে জড়িত সন্দেহে এ পর্যন্ত ১২ জনকে আটক করা হয়েছে এবং আরও কয়েকজনকে ধরার জন্য অভিযান এখনো চলছে।

যাদের ধরা হয়েছে বরিশাল শহরে তাদের কয়েকজন সেখানকার সিটি মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

দুপুরে মেয়রের বাসভবনকে ঘিরে অবস্থান নিতে দেখা গেছে পুলিশ ও র‍্যাব সদস্যদের। বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনিবুর রহমানের সরকারি বাসভবনে হামলার ঘটনার পর আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে বিজিবি মোতায়েনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন মি. রহমান।

তবে এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পুলিশের কেউ রাজি হননি।

মেয়র মি. আব্দুল্লাহ গত মধ্যরাতে ইউএনও'র বাসভবন এলাকায় তার লোকদের ওপর গুলি বর্ষণের অভিযোগ করলেও আজ তিনি এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোন কথা বলেননি।

তার ব্যক্তিগত সহকারীর সাথে যোগাযোগ করলে তিনিও মেয়রের সাথে কথা বলা যাবে না বলে জানান।

তবে নির্বাহী কর্মকর্তা মুনিবুর রহমান শোভন তিনি নিজে বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

বরিশালের সুপরিচিত জায়গা বিবির পুকুড় পার
ছবির ক্যাপশান, বরিশালের সুপরিচিত জায়গা বিবির পুকুড় পার

কী বলছেন ইউএনও?

মামলার এজাহারে মুনিবুর রহমান বলেছেন বুধবার রাত প্রায় ৯:৪৫-এর দিকে ১০/১৫টি মোটর সাইকেল যোগে ৪০-৫০ জনের একটি দল "উচ্ছৃঙ্খশভাবে উপজেলা কমপ্লেক্সে প্রবেশ করে স্থানীয় সাংসদ ও প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের পক্ষ থেকে "জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে টানানো বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সরকারি ব্যানার ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছিল"।

"আমার বাসভবনে নিরাপত্তায় নিয়োজিত আনসার সদস্যরা আমাকে অবহিত করে," জানান মি. রহমান। "আমার বাসভবনে জোরপূর্বক প্রবেশ করে এক ব্যক্তি জানায় যে বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র তাদের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলার নির্দেশনা দিয়েছেন।

তিনি এজাহারে উল্লেখ করেন যে এরপর আনুমানিক ১০:১৫-র দিকে বড় একটি দল "বেআইনিভাবে জমায়ত হয়ে মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমার বাসভবনের মূল ফটকের সামনে অবস্থান নেয়"।

নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন তিনি তাদের প্রয়োজনে পর দিন দিনের বেলায় ব্যানার সরানোর পরামর্শ দেন। এ নিয়ে এক পর্যায়ে সেখানে আগতরা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে বিতণ্ডায় লিপ্ত হন।

নির্বাহী কর্মকর্তা বলছেন, "মেয়রের নির্দেশে তারা আমাকে ঘিরে ফেলে এবং আমার প্রাণনাশের হুমকি দেয়।"

এজাহারে তিনি বলেন: "আনসার সদস্যরা তাদের নিবৃত্ত করতে গেলে তারা তাদের ওপর একই সাথে লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। আনসার সদস্যদের উদ্দেশ্যে তারা গুলি করে এবংএকজন আনসার গুলিবিদ্ধ হয়।"

এরপর খবর পেয়ে পুলিশ আসলে বহিরাগতদের সাথে পুলিশের কয়েকদফা সংঘর্ষ হয়, যা রাত দুটা পর্যন্ত চলে বলে মি. রহমান দাবি করেন।

তবে মধ্যরাতেই সিটি মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর তাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছে।

যদিও রাত থেকেই পুলিশ ঘটনার সাথে জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান শুরু করার পর মেয়র আর বের হননি।

শহরে উত্তেজনা

এরপর পরই বরিশাল থেকে বাস ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয় এবং দুপুরে মেয়রের বাড়ির সামনে পুলিশ ও র‍্যাবের সদস্যরা অবস্থান নিতে শুরু করলে প্রায় ১৩ ঘণ্টা পর বাস ও লঞ্চ চলাচল আবার শুরু হয়েছে।

বাস মালিক সমিতির নেতারা বলছেন যে জনগণের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে মেয়রের নির্দেশে তারা যানবাহন চলাচল শুরু করেছেন।

বাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি পরিমল চন্দ্র দাশ বিবিসিকে বলেন, "মেয়রের ওপর গুলির প্রতিবাদে বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিলাম। এখন মেয়রের নির্দেশে আবার চালু করেছি।"

স্থানীয়রাযা বলছেন

আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের কয়েকজন জানিয়েছেন যে বরিশালের সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরণ কয়েক বছর আগে মারা যাওয়ার পর তার লোকজন সদর আসনের এমপি জাহিদ ফারুকের ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে।

এরপর থেকেই সেখানে আওয়ামী লীগের মধ্যে দুটি ধারা চলছে জাহিদ ফারুক ও মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে।

জাহিদ ফারুকের আগামী ২২শে অগাস্ট একটি কর্মসূচিতে যোগ দেয়ার কথা রয়েছে যেটি নির্বাহী কর্মকর্তা সমন্বয় করছেন ধারণা করে ক্ষুব্ধ হন মেয়র বলে মনে করছেন স্থানীয় এই নেতারা।

এ কারণেই পোস্টার, ব্যানার অপসারণের নাম করে তার ঘনিষ্ঠ লোকজন ইউএনওর বাসায় হামলার ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে বলে তাদের ধারণা।

যে বিষয়ে কেউ কোন কথা বলে না

বরিশাল সদর এলাকার সাংসদ জাহিদ ফারুক সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী।

সিটি কর্পোরেশনের একজন কাউন্সিলর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে বলেন, "বরিশালে আসেন, দেখবেন পুরো শহরে একজনের পোস্টার। তিনি হলেন মেয়র। আরও কোন নেতার কোন পোস্টার ব্যানার এই শহরে লাগানো যায় না।"

এই কাউন্সিলর বলেন, "সিটি কর্পোরেশন গঠিত হওয়ার পর প্রথম সভায় মেয়র ডায়ালগ দিয়েছিলেন যে- আমি কারোকে জবাব দিতে পারব না, জবাব দিব শেখ হাসিনার সাথে আর বাবার কাছে।"

মেয়রের পিতা সংসদের সাবেক চিফ হুইপ আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও জাতীয় সংসদ সদস্য।

ওই কাউন্সিলরের অভিযোগ, "শহরের মানুষ একজনের কাছে জিম্মি। কেউ কিছু বললে তার বাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেয়া হয় কিংবা বাড়ির দরজায় ময়লা ফেলা হয় বা হুমকি দেয়া হয়। ," নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছিলেন এই কাউন্সিলার।

আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা জানান গত এক বছরে সেখানে কলেজ শিক্ষক, জনপ্রতিনিধিসহ অনেকেই শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েও কোন কথা বলতে পারেননি।

তারা অভিযোগ করেন বালুমহল, বাস মালিক সমিতি, নদী থেকে অবৈধভাবে মাছের রেনু সংগ্রহ করে তা বিক্রি করা, এমনকি টেকনাফ থেকে নৌপথে মাদক এনে সড়ক পথে ঢাকায় পাঠানোর সাথে জড়িতদের নামও বরিশালে সবার মুখে মুখে।

"কিন্তু কথা বললেই স্ট্রেইট গুলি করে দেবে," বলছিলেন আওয়ামী লীগেরই একজন কর্মী।

তবে এসব ঘটনার জন্য তারা কাকে দায়ী করছেন সেটিও মুখ ফুটে বলতে তারা কেউই রাজি হননি।

তাদের আরও অভিযোগ বরিশাল নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক, মেয়র নিজের লোকজন নিয়ে নগর কমিটি করেছেন যাতে স্থানীয় পুরনো নেতাদের অনেকেরই জায়গা হয়নি।

এসব নিয়ে দলের মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও হামলা কিংবা অসম্মানিত হওয়ার ভয়ে কেউ কোন মন্তব্যই করতে রাজি হননি।

এমনকি স্থানীয় সাংবাদিকদের অনেকেই এসব বিষয়ে কোন কথা বলতে রাজি নন।

একজন সাংবাদিক বলেন, "প্রেসক্লাবের নাম ব্যক্তির নামে হয়েছে। পরিস্থিতি কি বুঝতে পারেন?"

মেয়রের সাথে চেষ্টা করেও গতরাতের হামলার নিয়ে কথা বলা সম্ভব হয়নি।