কলকাতায় ১৯৪৬ এর দাঙ্গার দিনেই কেন পশ্চিমবঙ্গে 'খেলা হবে দিবস' : প্রশ্ন হিন্দু সন্ন্যাসীদের

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে খেলা হবে স্লোগান লেখা একটি দেওয়াল লিখনে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে খেলা হবে স্লোগানটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি কলকাতা

তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রচারে সবসময়ে বাজত যে খেলা হবে গানটি, ভোটে জেতার পরে মমতা ব্যানার্জী সেই খেলা হবে কথাটিকে নিয়েই একটা দিবস উদযাপনের ঘোষণা করেন।

সরকারি ব্যবস্থাপনায় ১৬ই অগাস্টে সারা রাজ্যে ফুটবল ম্যাচ হবে, ফুটবল বিলি করা হবে আর ক্লাবগুলিকে অনুদান দেওয়া হবে।

কিন্তু এখন কিছু হিন্দু সন্ন্যাসী দাবি করছেন যে ওই তারিখটি বদল করা উচিত কারণ ওই দিনটাতেই ৭৫ বছর আগে শুরু হয়েছিল কলকাতা দাঙ্গা, যেটি দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস নামে ইতিহাসের পাতায় উঠে গেছে।

আরও পড়তে পারেন:

ওই হিন্দু সন্ন্যাসীরা পশ্চিমবঙ্গের গর্ভনরের সঙ্গেও দিন বদলের আর্জি নিয়ে দেখা করেছেন। একই সঙ্গে হিন্দু পুনরুত্থানবাদী আরএসএস-ও চাইছে ওই দাঙ্গার স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে।

পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর জগদীপ ধনকড়ের সঙ্গে দেখা করছেন কয়েকজন হিন্দু সন্ন্যাসী

ছবির উৎস, @jdhankhar1 Twitter

ছবির ক্যাপশান, হিন্দু সন্ন্যাসীদের একটি দল গভর্নর জগদীপ ধনকড়ের সঙ্গে দেখা করে খেলা হবে দিবসের তারিখ বদলের আর্জি জানিয়েছেন

আরএসএস কি দাঙ্গার স্মৃতি জাগিয়ে তুলছে?

আরএসএসের দক্ষিণ বঙ্গ প্রান্তের কার্যবাহ, অর্থাৎ সাধারণ সম্পাদক জিষ্ণু বসু বলছিলেন, "এটা বাঙালিদের কাছে অত্যন্ত লজ্জার, যে ১৬ই অগাস্ট ময়দানের সভা থেকে মুসলিম লিগ ডাইরেক্ট অ্যাকশান ডে-র ডাক দিয়েছিল আর তারপরেই বাঙালি হিন্দুদের হত্যা - হিন্দু নারীদের অসম্মান - ধর্ষণ করা হয়েছিল, সেই দিনটাকে উদযাপন করা হচ্ছে - উৎসব করা হচ্ছে।"

আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, ওই দাঙ্গায় তো শুধু হিন্দুরা মারা যাননি, মুসলমানদেরও তো হত্যা করা হয়েছিল?

"শুরু তো হয়েছিল ওই ডাইরেক্ট অ্যাকশানের ডাক থেকে - প্রথম দিকে শুধুই হিন্দুদের হত্যা করা হয়েছে - তারপরে দাঙ্গা যখন বাঁধল, তখন অবশ্য হিন্দু মুসলমান উভয়েই নিহত হন। যে কোনও মৃত্যুই দুঃখের," বলছিলেন জিষ্ণু বসু।

১৯৪৬ এর ১৬ অগাস্ট থেকে দাঙ্গা শুরু হয়। রাস্তায় কয়েকটি মৃতদেহ পড়ে আছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ১৯৪৬ এর ১৬ অগাস্ট থেকে দাঙ্গা শুরু হয়েছিল, যাতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ নিহত হয়েছিলেন

খেলা হবে দিবসকে ঘিরে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে একদল হিন্দু সন্ন্যাসীর আর্জির মধ্যে দিয়ে, তা থেকে বিশ্লেষকদের মনে হচ্ছে যে নির্বাচনে যেমন ধর্মীয় বিভাজন ব্যাপকভাবে হয়েছিল - এটাও সেদিকেই এগোচ্ছে।

কিন্তু বিজেপি সরাসরি এগিয়ে না এলেও কেন রামকৃষ্ণ মিশন বা ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের মতো অরাজনৈতিক সংগঠনগুলির সন্ন্যাসীরা এই উদ্যোগ নিলেন, সেই প্রশ্নও ঘুরছে।

দাঙ্গার প্রথম দিনে নিহতদের বেশিরভাগই মুসলমান

তথ্যচিত্র নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদার দেশভাগ নিয়ে একটি তথ্যচিত্র সিরিজ বানাচ্ছেন - যার একটা বড় অংশ জুড়েই থাকছে কলকাতার দাঙ্গার বিষয়।

ওই ছবির জন্য গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য দিয়ে মি. দস্তিদার বলছিলেন, "এই যে বলা হয় যে তিনদিন ধরে মুসলমানরা একতরফা আক্রমণ করেছিল, আমি সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে বলতে পারব, হাসপাতালে সেই দিনগুলোর আহত নিহতদের তালিকায় যদি নজর দেন, তাহলে দেখবেন মুসলমান নাম সেখানে সংখ্যায় বেশি।"

দাঙ্গা শুরুর ১২ দিন পরেও কলকাতার রাস্তায় মৃতদেহ পরে ছিল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দাঙ্গা শুরুর ১২ দিন পরেও কলকাতার রাস্তায় মৃতদেহ পরে ছিল

"শুধুই হিন্দুরা আক্রান্ত হয়েছিল বা শুধুই মুসলমানদের ওপরে আক্রমণ হয়েছিল, এরকম মোটেই নয়। পাশাপাশি ওইরকম কঠিন পরিস্থিতিতেও কিন্তু অনেক হিন্দু পরিবার মুসলমানদের বাঁচিয়েছে, আবার মুসলমান শ্রমিক নেতা একটি স্কুলের হিন্দু মেয়েদের আগলে রেখেছেন - এই উদাহরণও কিন্তু প্রচুর আছে," বলছেন সৌমিত্র দস্তিদার।

তবে এতবছর পরে ওই ভয়ঙ্কর সময়টার স্মৃতি আর না ফিরিয়ে আনাই ভাল বলে মনে করেন তিনি।

কলকাতার দাঙ্গা শুরুর দিনের স্মৃতি তার 'অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখে গেছেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানও।

শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিতে কলকাতার দাঙ্গা

"কলকাতা শহরে শুধু মরা মানুষের লাশ বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে। মহল্লার পর মহল্লা আগুনে পুড়ে গিয়েছে। এক ভয়াবহ দৃশ্য। মানুষ মানুষকে এইভাবে হত্যা করতে পারে, চিন্তা করতেও ভয় হয়!" অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ৬৬ পাতায় লিখেছেন শেখ মুজিব।

বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান

কয়েক অনুচ্ছেদ পরে তিনি আবারও লিখেছেন: "মুসলমানদের উদ্ধার করার কাজও করতে হচ্ছে। দু'এক জায়গায় উদ্ধার করতে যেয়ে আক্রান্তও হয়েছিলাম। আমরা হিন্দুদেরও উদ্ধার করে হিন্দু মহল্লায় পাঠাতে সাহায্য করেছি। মনে হয়েছে, মানুষ তার মানবতা হারিয়ে পশুতে পরিণত হয়েছে।

"প্রথম দিন ১৬ই আগস্ট মুসলমানরা ভীষণভাবে মার খেয়েছে। পরের দুই দিন মুসলমানরা হিন্দুদের ভীষণভাবে মেরেছে। পরে হাসপাতালের হিসাবে সেটা দেখা গিয়েছে।"

এইদিনেই কলকাতায় নিহত হন ১৬ জন ফুটবল প্রেমীও

গত চল্লিশ বছর ধরে ১৬ই অগাস্ট দিনটি পশ্চিমবঙ্গে পালিত হয়ে আসছে ফুটবল প্রেমী দিবস হিসাবে।

এই দিনেই, ১৯৮০ সালে কলকাতার দুই চির প্রতিদ্বন্দী ক্লাব - ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগানের এক ডার্বি ম্যাচ চলাকালীন ইডেন গার্ডেন্সে সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।

মারা গিয়েছিলেন ১৬ জন ফুটবল প্রেমী।

তাদের স্মরণে সারা রাজ্যেই প্রতিবছর রক্তদান শিবিরের আয়োজন করে রাজ্য ফুটবল নিয়ামক সংস্থা আই এফ এ।

প্রবীন ক্রীড়া সাংবাদিক রূপক সাহা ১৯৮০ সালের ১৬ অগাস্ট মাঠে রিপোর্টিং করতে হাজির ছিলেন।

"আমি রিপোর্টার হিসাবে সেদিন মাঠে ছিলাম। দেখেছি কী একটা নারকীয় কাণ্ড হয়েছিল। একের পর এক মৃতদেহ পড়েছিল সাদা চাদরে ঢাকা। সেই দিনটার স্মৃতি ভোলার নয়। এরকম একটা দিন নিয়ে ছেলে খেলা করা ঠিক না। দিনটাকে খেলা দিবস না করে ছেলে খেলা দিবস বলা উচিত, সেটাই তো হচ্ছে," বলছিলেন রূপক সাহা।

১৬ই অগাস্ট ফুটবল প্রেমী দিবসে রক্তদান শিবির

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ১৯৮০ সালের ১৬ই অগাস্ট নিহত ১৬ জন ফুটবলপ্রেমীর স্মরণে দিনটিকে ফুটবল প্রেমী দিবস হিসাবে পালন করা হয়

তার কথায়, "এ নিয়ে কারা রাজনীতি করছে বা কারা রাজনৈতিক লাভ ঘরে তুলবে, তা নিয়ে আমি বিন্দুমাত্রও আগ্রহী নই। সরকারের উচিত এসব গিমিক না করে ফুটবলটাকে বাঁচানোর চেষ্টা করা। কলকাতার মাঠে তো আর ফুটবল নেই, সেটার সলিল সমাধি হয়ে গেছে।"

এই প্রশ্নও উঠছে, যে রাজ্যে খেলা হবে দিবস পালন করা হচ্ছে, সেখান থেকে অলিম্পিকে হাতে গোনা যে কজন গিয়েছিলেন, তারা কেন মোটেই ভালো করতে পারেন নি। এর বিপরীতে হরিয়ানা, আসাম, মনিপুরের মতো রাজ্যগুলি থেকে অলিম্পিকে যাওয়া ক্রীড়াবিদরা টোকিও থেকে পদক নিয়ে ফিরলেন - এই সংখ্যার দিকেও নজর দিচ্ছেন অনেকে।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন