টোকিও অলিম্পিকস: ভারতীয় দল হেরে যাওয়ায় নারী হকি খেলোয়াড়ের জাত নিয়ে গালিগালাজ

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি বাংলা, কলকাতা
ঘরের মেয়ে গেছে সাড়ে ৫,০০০ কিলোমিটার দূরে টোকিওতে অলিম্পিক গেমসে খেলতে। নারী দলের হকি সেমিফাইনাল ম্যাচ হচ্ছিল সেদিন।
ভারত আর আর্জেন্টিনার সেই ম্যাচ দেখছিলেন উত্তরাখন্ডের হরিদ্বারে গ্রামের বাড়ির বাড়িতে বসে বন্দনা কাটারিয়ার পরিবার পরিজন।
বন্দনা কাটারিয়া ভারতীয় নারী দলের তারকা খেলোয়াড়। একই সঙ্গে তিনি দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ।
ক'দিন আগেই অলিম্পিকের আসরে হ্যাটট্রিক করেছেন বন্দনা। তিনিই প্রথম ভারতীয় নারী হকি খেলোয়াড়, যিনি হ্যাটট্রিক করেছিলেন।
সেদিন সারা দেশ তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু তার দু'দিনের মধ্যেই তার দল আর্জেন্টিনার কাছে পরাজিত হতেই তার বাড়ির সামনে পটকা ফাটাতে শুরু করে এক দল ব্যক্তি।
বন্দনার মা বলছিলেন, "বিকেল তখন পাঁচটা হবে। আমরা সবাই টিভিতে ম্যাচ দেখছিলাম। হঠাৎই বাড়ির বাইরে পটকা ফাটতে শুরু করে।"
এমনিতে ভারতীয় নারী দল সেমিফাইনালে পরাজিত হওয়াতে সবার মন খারাপ, কিন্তু তার মধ্যেই বাজি কেন ফাটছে?
পাড়ার লোক আর পরিবারের সদস্যরা খোঁজ করতে গিয়ে শুনলেন 'বন্দনা কাটারিয়া মুর্দাবাদ'র মতো স্লোগান।
যারা বাজি ফাটাচ্ছিল, তাদের বলতে শোনা যায়, বন্দনা কাটারিয়ার মতো দলিত সমাজের মানুষ দলে ঢুকেছে বলেই ভারত হেরেছে।
বন্দনার বড়ভাই চন্দ্রশেখর কাটারিয়া বিবিসিকে বলছিলেন, "হ্যাঁ, আমরা চামার জাতির মানুষ। জাত তো বদলাতে পারব না। কিন্তু তা বলে যে মেয়েটা দেশের জন্য খেলতে গেছে তার নামে মুর্দাবাদ স্লোগান দেবে? জাত তুলে কথা বলবে!"
মি. কাটারিয়ার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে হরিদ্বারের পুলিশ এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে।
হরিদ্বারের সিনিয়ার পুলিশ সুপারিন্টেডেন্ট সেন্থিল আভুদায়ি কে রাজ এস বলছেন, "বন্দনা কাটারিয়ার ভাই আমাদের কাছে অভিযোগ জানিয়েছিলেন যে ভারতীয় দল হেরে যাওয়ার পরে কিছু ব্যক্তি তার বাড়ির সামনে আতশবাজি ফাটিয়েছিল, জাতি তুলে আপত্তিজনক কথা বলেছিল। ভারতীয় দন্ডবিধিতে যেমন মামলা হয়েছে, তেমনই তপশিলী জাতি-উপজাতি আইনেও মামলা করা হয়েছে। একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।"

ছবির উৎস, DHRUV MISHRA
মূল অভিযুক্ত এবং ধৃত ব্যক্তি বিজয় পাল কাটারিয়া পরিবারেই প্রতিবেশী।
মি. পালের মা এবং বোনেরা অবশ্য বিবিসিকে বলেছেন যে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানো হয়েছে তাকে। সেদিন অন্য কেউ বাজি ফাটিয়েছিল। আর কাটারিয়া পরিবারের সঙ্গে একটা পুরোনো ঝগড়ার কারণে তাদের বাড়ির ছেলের নামে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে।
"আমি তো একা শুনি নি ওই কথাগুলো! সেদিন এলাকার অনেকেই ছিল। সবাইকে জিজ্ঞাসা করে দেখুন না কী বলেছিল বিজয় সেদিন," বলছিলেন বন্দনার বড় ভাই।
তার কথায়, ওই পরিবারের ছেলেকে যখন পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে, তখনও ওর মা বন্দনা কাটারিয়া মূর্দাবাদ বলছিলেন।
আরও পড়ুন:
এই ঘটনা সামনে আসার পরে এলাকার বিজেপি বিধায়ক দেশপাল কর্ণওয়াল গিয়েছিলেন বন্দনাদের বাড়িতে। মি. কর্ণওয়াল নিজেও কাটারিয়াদের মতোই চামার জাতির মানুষ।
বিবিসিকে তিনি বলেন, "দুদিন আগে যখন এসেছিলাম, তখন খুশির দিন ছিল। সবার সামনেই আমি বলেছিলাম সেদিন যে লোকে দেখুক এক চামার জাতির মেয়ে দেশের হয়ে খেলতে গিয়ে তিন গোল করেছে। আর আজ ভারত হেরে গেছে বলে কিছু উঁচুজাতির মানুষ বাজি ফাটাচ্ছে, মূর্দাবাদ স্লোগান দিচ্ছে! চামার জাতির মেয়ের জন্য ভারত হেরেছে বলা হচ্ছে! এটা তো দেশদ্রোহ।"
এই ঘটনা নিয়ে সরব হয়েছে বিভিন্ন দলিত সংগঠন। টুইটারে চলছে প্রতিবাদ।








