ভারতে দলিত সদস্যরা যেভাবে নির্যাতন ও হত্যার শিকার হন তার কিছু কাহিনি

ছবির উৎস, SUDHARAK OLWE
ভারতের মুম্বাই শহরে আয়োজিত একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে দলিত সমাজের নিগ্রহ ও নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। একেকটি ছবিতে রয়েছে এরকম একেকটি গল্পের বিবরণ যেখানে দেখা যায় বৈষম্য ও সহিংসতার কারণে পিছিয়ে পড়া এই সমাজের লোকেরা কিভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য মহারাষ্ট্রে তোলা এসব ছবিতে উঠে এসেছে ভারতে লাখ লাখ দলিত মানুষের বাস্তব জীবনের ছবি যা ধরা পড়েছে ফটোগ্রাফার সুধারাক ওলভের ক্যামেরায়।
ভারতে নির্যাতন ও বৈষম্যের হাত থেকে দলিত সদস্যকে রক্ষায় আইন থাকলেও সরকারি হিসেব অনুসারে শুধুমাত্র ২০১৬ সালে তাদের বিরুদ্ধে এরকম ৪০ হাজারেরও বেশি অপরাধের অভিযোগ পুলিশের কাছে রিপোর্ট করা হয়েছে।
অতীতে যেসব বিষয়কে কেন্দ্র করে সমাজের উচ্চ বর্ণের সাথে দলিত সমাজের সংঘর্ষ হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে জমিজমা, বেতন ও মজুরি, পানি, বাড়িঘর ইত্যাদি। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে তরুণ দলিত প্রজন্মের মধ্যে আশা আকাঙ্ক্ষা তৈরি হওয়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখানে এরকম কিছু ঘটনা তুলে ধরা হলো:
মরদেহ পাওয়া যায় মাঠে
সাগর সেজওয়াল ২৪ বছরের এক ছাত্র। পড়াশোনা করছিলেন নার্সিং বিষয়ে। এক বন্ধুর বিয়েতে অংশ নিতে ২০১৫ সালে গিয়েছিলেন শিরদি শহরে। এসময় তিনি তার দুই কাজিনকে সাথে নিয়ে একটি মদের দোকানে ঢুকেছিলেন। দোকানের ভেতরে থাকতেই তার একটি ফোন আসে। ফোনের রিং টোন ছিলো দলিত নেতা এবং এই সমাজের আইকন হিসেবে পরিচিত ড. বি আর আম্বেদকারকে শ্রদ্ধা জানিয়ে।

ছবির উৎস, SUDHARAK OLWE
পুলিশের কাছে করা অভিযোগে দেখা যায় যে, দোকানের বাইরে মদ্যপানরত আটজন পুরুষ এই রিং টোনে আপত্তি জানান। তারা তাকে তার ফোনের রিং টোন পরিবর্তন করতে বলেন। তখন ঝগড়াঝাঁটি এক পর্যায়ে মারামারিতে রূপ নেয় এবং হামলাকারীরা সেজওয়ালকে একটি বোতল দিয়ে আঘাত করে। তাকে ঘুষি ও লাথি মারতে থাকে। তারপর তাকে একটি মোটরবাইকে তুলে সেখান থেকে নিয়ে চলে যায়।
আরো পড়ুন:
পুলিশ জানায়, এর কয়েক ঘণ্টা পরে তারা সেজওয়ালের মৃতদেহ খুঁজে পান একটি মাঠের ভেতরে। ময়না তদন্তে দেখা গেছে, তার শরীরের হাড় বিভিন্ন জায়গায় ভেঙে গেছে। পুলিশের ধারণা, তাকে মাটিতে শুইয়ে শরীরের উপর মোটরবাইক উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পরে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
লাশ পাথরের খনিতে
২৫ বছর বয়সী মানিক ওদাগেকে স্টিলের একটি রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ। এই ঘটনাটি ২০১৪ সালের। তার অপরাধ ছিলো যে তিনি ড. বি আর আম্বেদকারের জন্মবার্ষিকীতে বড় ধরনের একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন।
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা পুনে শহরের। এই অঞ্চলে উচ্চবর্ণের বহু লোকের বাস। তাদের কেউ কেউ এধরনের একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ব্যাপারে আপত্তিও জানিয়েছিলেন। মি. উদাগেকে অনুষ্ঠানের স্থান পরিবর্তনের জন্যেও তারা বারবার বলেছিলেন। কিন্তু যুবক উদাগে তাদের কথায় কান দেননি।

ছবির উৎস, SUDHARAK OLWE
তার পরিবার থেকে বলা হয়, চারজন পুরুষের একটি দল ১লা মে খুব সকালের দিকে তাদের বাড়িতে আসে এবং মি. উদাগেকে তুলে নিয়ে যায়। এর দু'দিন পর ৩রা মে পাথরের একটি খনিতে তার মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিলো।
অভিযুক্ত চারজনই উচ্চবর্ণের সদস্য। তাদের সবাই এখন জেলে। বেশ কয়েকবার জামিনের আবেদন জানিয়েও তারা মুক্তি পান নি। কিন্তু মি. উদাগের ভাই বলেছেন, তারা এখনও ভয় ও আতঙ্কের ভেতরে বসবাস করেন। তিনি বলেন, যখনই তিনি ওই এলাকার ভেতর দিয়ে হেঁটে যান, তখনই তার ভেতরে একটা ভয় কাজ করতে থাকে।
মরদেহ ঝুলছিল গাছে
খাদরা গ্রামের ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর নিতিন আগের মরদেহ একটি গাছ থেকে ঝুলছিল। ঘটনাটি ২০১৪ সালের ২৮শে এপ্রিলের।
পুলিশের ভাষ্যমতে, নিতিনকে তার স্কুলে উচ্চবর্ণের একটি মেয়ের সাথে কথা বলতে দেখা যায়। তারপর মেয়েটির ভাইসহ তিনজন মিলে তাকে বেশ কয়েকবার হেনস্থা করেন কারণ তারা সন্দেহ করেছিলেন যে নিতিন মেয়েটির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন।

ছবির উৎস, SUDHARAK OLWE AND HELENA SCHAETZLE
পুলিশ বলছে, প্রথমে নিতিনকে স্কুলে মারধর করা হয় তারপর মেয়েটির পরিবারের মালিকাধীন একটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশ বলছে, সেখানে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। তাদের বিশ্বাস নিতিনের মরদেহ পরে একটি গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে এটা প্রমাণ করতে যে নিতিন আত্মহত্যা করেছেন।
অভিযুক্ত ১৩ জন ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে আদালত থেকে বেকসুর খালাস পেয়েছেন। তারপর থেকেই নিতিনের পরিবার এই ঘটনার পুনর্বিচারের দাবি জানিয়ে আসছে।
আত্মহত্যা বলে চালানো
সঞ্জয় দানানের বয়স তখন ৩৮। তিনি কাজ করতেন একটি স্কুলে। ২০১০ সালে তার মরদেহ পাওয়া যায় স্কুলের কাছেই ঝুলন্ত অবস্থায়।
তার পিতামাতার অভিযোগ যে স্কুলে বিরোধের কারণে উচ্চবর্ণের সহকর্মীরা তাকে হত্যা করেছে। পরে তারা ঘটনাটি এমনভাবে সাজিয়েছে যেন সেটাকে আত্মহত্যা বলে মনে করা হয়।

ছবির উৎস, SUDHARAK OLWE
এই ঘটনায় পুলিশ ১৮ জনকে গ্রেফতার করেছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজন শিক্ষকও ছিলেন। ছিলেন বোর্ড মেম্বার এবং অধ্যক্ষও। তারপর থেকেই তারা জামিনে রয়েছেন।
পানি থেকে বঞ্চিত
পানি তুলতে গিয়ে পিছলে পরে মাথায় আঘাত পান ১০ বছরের কিশোরী রাজশ্রী কাম্বলে। তার পিতা নামদেব কাম্বলে বলেন, তার কন্যা এখনও জীবিত থাকতো যদি তাদেরকে পানির সরবরাহ থেকে বঞ্চিত করা না হতো।

ছবির উৎস, SUDHARAK OLWE
ঘটনাটি ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের। খরার কারণে ওই গ্রামের কুয়ার পানি শুকিয়ে গিয়েছিল। মি. কাম্বলে জানান, তখন গ্রামের কাউন্সিল বিভিন্ন এলাকায় পানির সরবরাহ অব্যাহত রাখলেও দলিতরা যে এলাকায় থাকেন সেখানে পানি সরবরাহের কোন ব্যবস্থা করেননি। কিন্তু পানি চেয়ে তাদের কাছে বারবার অনুরোধ করা হয়েছিল।
তিনি জানান, গ্রামের মাতব্বরদের বিরুদ্ধে তিনি পুলিশের কাছে একটি মামলা দায়ের করতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি সেটা করতে পারেন নি।
কুয়া খনন করায় হত্যা
মাধুকর ঘাদজেকে হত্যা করা হয় কারণ ৪৮ বছর বয়সী এই ব্যক্তি তার নিজের জমিতে একটি কুয়া খনন করেছিলেন। অভিযোগ করা হয় যে তার জমির চারপাশে ছিল উচ্চবর্ণের ১২ জন সদস্যের জমি। তারাই তাকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ।

ছবির উৎস, SUDHARAK OLWE
পুলিশের বক্তব্য: তিনি যখন কুয়া খনন করছিলে তখনই তাকে আঘাত করা হয়। পরে যখন তাকে কাছের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে ডাক্তাররা জানান যে তিনি ইতোমধ্যে মারা গেছেন।
মি. ঘাদজের স্ত্রী ও সন্তানের অভিযোগ স্থানীয় রাজনীতির সাথে জড়িত শিক্ষিত একটি পরিবারের উদ্যোগে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এর তিন বছর পর অভিযুক্ত ১২ জনকেই খালাস করে দেন নিম্ন আদালত। কারণ যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। এখন মুম্বাই-এর একটি আদালতে আপিলের শুনানি চলছে।
শিরশ্ছেদের পর পুড়িয়ে হত্যা
মাত্র একদিন পরেই রোহান কাকাদের বয়স হওয়ার কথা ছিল ১৯। ঘটনাটি ২০০৯ সালের। বাড়িতে ফেরার সময় তাকে হত্যা করা হয়। সময়মতো বাড়িতে ফিরে না আসায় তার পিতামাতা তার খোঁজ করতে থাকেন এবং কয়েক ঘণ্টা পর তাদের সন্তানের মস্তকহীন শরীর খুঁজে পান। দেখতে পান যে সেই মরদেহ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

ছবির উৎস, SUDHARAK OLWE
অভিযুক্তরা হলেন উচ্চ বর্ণের পাঁচজন সদস্য। বলা হচ্ছে, এই তরুণ তাদেরই কোন একজনের বোনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু কাকাদের পিতামাতার বক্তব্য, তাদের মধ্যে কোন প্রেম ছিল না। তারা বন্ধু ছিলো এবং মাঝে মধ্যে তাদের দেখা সাক্ষাৎ হতো।
এর আড়াই বছর পর কাকাদের পিতা মারা যান। তার মা এখনও হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে লড়ে যাচ্ছিলেন কিন্তু আদালত অভিযুক্ত সবাইকে বেকসুর খালাস দিয়েছে।








