ফোনে আড়ি পাতা: ফোনালাপ ফাঁস নজরদারি প্রযুক্তি এবং আইনি সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ

    • Author, আবুল কালাম আজাদ
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে প্রায়ই ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে আড়ি পাতা এবং গোপন ফোনালাপ ফাঁস হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে থাকায় সাধারণ মানুষের গোপনীয়তার অধিকার খর্ব হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এক্ষেত্রে আইন থাকলেও সরকারি সংস্থা এবং বাহিনী তা যথাযথভাবে প্রতিপালন করে কিনা সেটি নিয়েও আছে প্রশ্ন।

বাংলাদেশে আলোচিত ফোনালাপ ফাঁস হয়ে যাওয়া ভুক্তভোগিদের বেশিরভাগেরই অভিযোগ ব্যক্তিগত ফোনে আড়ি পাতা বা নজরদারির সক্ষমতা কেবল সরকারি সংস্থার কাছেই রয়েছে। যাদের মোবাইল ফোনের কথোপকথন ফাঁস হয়েছে তাদের অধিকাংশেরই সন্দেহ এবং অভিযোগ যে রাষ্ট্রীয় কোনো সংস্থার মাধ্যমেই এসব ঘটনা ফাঁস করা হতে পারে।

বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা এবং ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূরের একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়েছিল যার কারণে সেসময় তাকে বেশ বিতর্কের মধ্যে পড়তে হয় বলে জানান তিনি।

ফাঁস হওয়া সেই কথোপকথনে একটি ব্যবসার জন্য বড় অঙ্কের টাকার তদবির করা হচ্ছিল বলেই অনেকটা ধারণা তৈরি হয়। মি. হকের সন্দেহ এখনো তার ফোনে আড়ি পাতা হচ্ছে।

"আমরা যেহেতু অপজিশনের জায়গা থেকে রাজনীতি করি তাই আমার কাছে একাধিকবার মনে হয়েছে যে আমার ফোন ট্যাপ করা হচ্ছে। কারণ আমার কিছু ব্যক্তিগত আলাপ-আমি বিভিন্ন ভাবে জানতে পেরেছি যে এগুলোর তথ্য বাইরে প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে। এটাতো সাধারণ মানুষের কাজ না," অভিযোগ করেন মি. হক।

ব্যক্তিগত ফোনালাপ ফাঁস সম্পর্কে মি. হক বলেন, মানুষের ব্যক্তিগত ফোনালাপ ফাঁস করা বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী একটি অপরাধ এবং সংবিধান পরিপন্থী কাজ।

''আমার যে ফোনালাপ ফাঁস হয়েছিল সেটাকে অপপ্রচার আকারে প্রচার করা হয়েছে। আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও সেটিকে ব্যবহার করেছে। এই ফোনালাপকে কেন্দ্র করেও আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

''কিন্তু যেটি ফাঁস হয়েছিল সেটি একটানা কথোপকথন যদি হতো তাহলে মানুষ ওই বিষয়টি সম্পর্কে পুরো জানতে পারত। কিন্তু সেখানে সেটার বিভিন্ন খণ্ডিত অংশ জোড়া লাগিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে, যেটা মানুষকে বিভ্রান্তিকর মেসেজ দেয়," বলেন নুরুল হক নূর।

আরও পড়ুন:

'বেশিরভাগ সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ'

বাংলাদেশে ফাঁস হওয়া গোপন ফোনালাপের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে সেগুলোতে বিতর্কিত কথাবার্তা, কারো ব্যক্তিগত দুর্বলতার বিষয় বা চক্রান্ত ষড়যন্ত্রের মতো বিষয়গুলো প্রকাশ্যে আনা হয়েছে।

এসব ফোনালাপ ফাঁস হওয়ায় ওইসব ব্যক্তিরা বেকায়দায় পড়েছেন। সামাজিকভাবেও বিব্রত হয়েছেন, অস্বস্তিতে পড়েছেন।

দেখা গেছে, মোবাইল ফোনে আড়ি পেতে যাদের গোপন কথা ফাঁস করা হয়েছে তারা অধিকাংশই সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা সমালোচক।

মি. হক বলেন, "মানুষও কেমন যেন এটা এক প্রকার মেনে নিয়েছে যে সরকার এটা করবেই। কিন্তু আজকে যারা করছে (তারা) সরকারে ক্ষমতায় আছে। তারা অপজিশনে গেলে তাদের জন্যও কিন্তু এটা একটা বড় ধরনের সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে বলে আমি মনে করি। এজন্য এটাকে গুরুত্ব দিয়ে সরকারের বিবেচনা করা উচিত।"

আড়িপাতা দণ্ডনীয় অপরাধ

এদিকে অভিযোগ রয়েছে বাংলাদেশে ফোনালাপ ফাঁসের কোনো ঘটনারই সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি। কে বা কারা সেটি করেছে তা জানা সম্ভব হয়নি।

অথচ বাংলাদেশে ব্যক্তিগত যোগাযোগের গোপনীয়তার ক্ষেত্রে ফোনে আড়িপাতা আইনের দৃষ্টিতে দণ্ডনীয় অপরাধ।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিতি জানজানা বলেন, বাংলাদেশে যে আইন আছে সেটি যথাযথ প্রয়োগ হলে এই ধরনের আড়িপাতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষা দেয়া সম্ভব।

"বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের ৭১ ধারায় কিন্তু বলা আছে যে আড়িপাতা-আড়ি পাতলেই কিন্তু সেটা অপরাধ হয়ে যাচ্ছে। সেটা স্মার্ট ফোনের কথা বলেন, বা পেগাসাস নিয়ে আসেন, বা যে কোন ধরনের স্পাইওয়্যার ব্যবহার করেন সেটা কিন্তু এখানে আলোচ্য বিষয় নয়। যখনই একজন ব্যক্তি অন্য দুজন ব্যক্তির ফোনে আড়ি পাতছেন সঙ্গে সঙ্গে সেটি অপরাধ হয়ে যাচ্ছে।"

বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনে ফোনে আড়ি পাতার অপরাধ প্রমাণিত হলে অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড এবং অনধিক ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড দেয়ার বিধান আছে।

অনুমতি সাপেক্ষে নজরদারি কি আইনসম্মত?

আইনের ৯৭ক ধারা অনুযায়ী সরকারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত গোয়েন্দা সংস্থা, জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা, তদন্তকারী সংস্থা বা আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত সংস্থার কোনো কর্মকর্তার ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য হবে না বলে শর্ত রয়েছে।

আইনজীবী মিতি সানজানা বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এবং কুখ্যাত সন্ত্রাসী বা জঙ্গী দমনের প্রশ্নে বিভিন্ন সংস্থা অনুমতি স্বাপেক্ষে নজরদারি করতেই পারে। তবে সেটি যথাযথ নিয়ম মেনে হওয়া প্রয়োজন।

"স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এবং (স্বরাষ্ট্র) প্রতিমন্ত্রীর অনুমতি সাপেক্ষে তারা এই কাজগুলো করতে পারে। কিন্তু এ বিষয়গুলো না মেনে যদি আইনের অপব্যবহার করা হয় এবং পরবর্তীতে যদি এই ধারাগুলোকে নিজেদের জন্য সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হয় তখন কিন্তু আইনের পরিবর্তনের প্রশ্ন আসে। আমার কাছে মনে হয় যে আইনগুলো আছে তার যদি যথাযথ ব্যবহার করা হয়, এবং এর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয় তাহলে তা যথেষ্ট সুরক্ষা দেবে জনগণের গোপনীয়তা রক্ষায়।"

এদিকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা স্পর্শকাতর অবস্থানে থাকা মানুষের ফোনালাপ ফাঁস এবং নজরদারির ঘটনা বিশ্বব্যাপী একটা উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

সম্প্রতি ইসরায়েলি কোম্পানির তৈরি পেগাসাস নামের স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশের সাংবাদিক, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী আর অধিকার কর্মীদের মোবাইল ফোনের নজরদারি হবার খবর নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

ওই অনুসন্ধানে বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশের ৫০ হাজারের বেশি মোবাইল ফোনে গোপন নজরদারির করার তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে উন্নত প্রযুক্তির বহুমূল্য স্মার্ট ফোনেও ব্যক্তির অগোচরে আড়িপাতা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

পেগাসাস প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাব্য দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নামও উঠে এসেছে আলোচনায়। কারণ এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানের সাথে যুক্ত গণমাধ্যমের একটি ওয়াশিংটন পোস্টের একটি প্রতিবেদন বাংলাদেশের নাম করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কেউ পেগাসাসের মাধ্যমে নজরদারি শিকার হয়েছেন এমন কোন তথ্যপ্রমাণ নেই আর বাংলাদেশের সরকারও এটি স্বীকার করেনি।

মোবাইল ফোন সহজ টার্গেট

প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, বর্তমানে মোবাইল ফোনে আড়িপাতার মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি নজরদারি হয়ে থাকে।

এক্ষেত্রে যারা টার্গেট হন তাদের মোবাইল ডিভাইসের প্রায় সর্ম্পূণ নিয়ন্ত্রণ নেয়া সম্ভব হয় পেগাসাসের মত স্পাই ওয়্যার ব্যবহার করে। যেটা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ যে কারো জন্যই। কারণ যার ফোনে এই স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে আড়ি পাতা হয় সে কোনোভাবে টেরই পায় না যে তার ফোনের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে দূরে কোনো গোষ্ঠী বা সংস্থার কাছে।

প্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, "ফোনের একবার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে দেখা যাচ্ছে যে চাইলে তারা দূর থেকে মাইক্রোফোন অন করতে পারে, ক্যামেরা দিয়ে দেখতে পারে। কাজেই আমি যখন ফোন ব্যবহার করছি না, আমার পাশে ফোনটা রয়েছে সেসময়ও আমি কার সাথে কী কথা বলছি, তার ছবি বা সে কথাগুলো রেকর্ড করে তারা আসলে দেখতে পারছে দূর থেকে।

''এক কথায় ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলতে যে বিষয়টা ছিল তা আসলে একেবারেই থাকে না, যদি এ ধরনের কোনো ম্যালওয়্যার বা স্পাইওয়্যারে কেউ আক্রান্ত হন।"

তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার করে নজরদারি করতে একের পর এক উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবন হচ্ছে পৃথিবীতে।

কুখ্যাত কোনো সন্ত্রাসী, বা জঙ্গী ধরতে এসব নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহারের একটা বৈধতার কথা বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর সব দেশেই।

কিন্তু বাংলাদেশে যেভাবে ফোনে নজরদারি হয় এবং তা ফাঁস করে দেয়া হয় সেটি নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ। সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের উৎকণ্ঠার পরিবেশ।