ইতিহাসের সাক্ষী: ইংলিশ চ্যানেলের নিচ দিয়ে ইউরোস্টারের যাত্রা শুরু হয় যেভাবে

ইংলিশ চ্যানেলের নিচ দিয়ে প্রথমবারের মতো একটি ট্রেন ইংল্যান্ড থেকে ফ্রান্সে পাড়ি দিয়েছিল ১৯৯৪ সালে। এর নাম ইউরোস্টার। যাত্রা করেছিল লন্ডনের ওয়াটারলু স্টেশন থেকে। গন্তব্য প্যারিসের গার দি নর্দ স্টেশন।

ইংলিশ চ্যানেলের নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ তৈরি করাটা ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর দিক থেকে এক বিরাট ঘটনা।

তিনটি সুড়ঙ্গ তৈরি করতে সময় লেগেছে ছয় বছরেরও বেশি সময়। সমুদ্রতল থেকে ১৩০ ফুট গভীরে এসব সুড়ঙ্গ খুঁড়তে ১১টি বিশাল মেশিন ব্যবহার করা হয়েছে।

লেজারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সুড়ঙ্গের লাইন ঠিক রাখা হয়েছে। যার ফলে দু'পাশে থেকে আসা সেই লাইন ইংলিশ চ্যানেলের মাঝখানে এসে একসঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক বছর পর টানেলটি উদ্বোধন করা হয়। যাত্রীদের জন্য খুলে দেওয়ার আগে মে মাসে ইউরোস্টার ট্রেনের উদ্বোধন করেন রানি এলিজাবেথ।

তাকে নিয়ে ট্রেনটি ফ্রান্সের ক্যালের উদ্দেশ্যে লন্ডনের ওয়াটারলু স্টেশন ছেড়ে যায়। গন্তব্যে পৌঁছে তিনি সাক্ষাৎ করেন ফরাসী প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁর সঙ্গে।

যাত্রীদের নিয়ে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর আগে ইউরোস্টারের চলাচল নিয়ে অনেক পরীক্ষা চালানো হয়। এসময় নানা ধরনের সমস্যাও দেখা দিয়েছিল।

দিনটি ছিল ১৪ই নভেম্বর। সময়: সকাল আটটা বেজে ২৩ মিনিট।

সবচেয়ে সস্তা টিকেটের দাম ছিল ৯৫ পাউন্ড। তখনকার হিসেবে ১৫২ মার্কিন ডলার। বেশিরভাগ যাত্রীই প্রায় এক বছর আগে অগ্রিম টিকেট বুক করে রেখেছিল।

প্রথম যাত্রায় ইউরোস্টারের চালক ছিলেন রবার্ট প্রিস্টন।

মি. প্রিস্টন বলেন, "আমাদেরকে এই ট্রেনের চলাচল পরীক্ষা করে দেখতে হচ্ছিল। বিশেষ করে যে লাইনের ওপর দিয়ে ট্রেনটি যাবে সেটি। এই কাজটা আমরা রাতের বেলায় করার চেষ্টা করছিলাম। তবে কিছু কাজ দিনের বেলাতেও করতে হয়েছে।"

"বেশ কয়েকবারই ট্রেন চলাচলে সমস্যা হয়েছে। এর গতিও ছিল খুব বেশি। এছাড়াও ট্রেনটি ছিল বেশ লম্বা- অন্যান্য যাত্রীবাহী ট্রেনের প্রায় দ্বিগুণ। এটা ছিল খুবই জটিল ট্রেন। তখন যে প্রযুক্তি ছিল সেটা তো আজকের দিনের প্রযুক্তির মতো এতো আধুনিক ছিল না।"

১৯৯৪ সালের ১৪ই নভেম্বর সকালে এক ধরনের উত্তেজনা নিয়ে রবার্ট প্রিস্টন ওয়াটারলু স্টেশনে এসে পৌঁছান। দেখতে পান, একটি ব্যান্ড বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে চালক ও যাত্রীদের স্বাগত জানাচ্ছে।

মি. প্রিস্টন বলেন, "শুধু ব্রিটেনের টিভি রেডিওর লোকেরাই সেখানে উপস্থিত ছিল না, বলা যায় ইউরোপ ও আমেরিকাসহ সারা পৃথিবী থেকেই সাংবাদিকরা সেখানে জড়ো হয়েছিল। ট্রেনে ওঠার জন্য যাত্রীরা ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করছিল। সেদিনের সেই ট্রেনে বেশ কয়েকজন সেলিব্রেটিও উপস্থিত ছিলেন।"

প্যারিসগামী ইউরোস্টারের প্রথম ট্রেনে ছিল আটশো'রও বেশি যাত্রী। তারা সবাই জানতে অত্যন্ত উদগ্রীব ছিলেন যে শেষ পর্যন্ত ট্রেনটি কখন প্যারিসে গিয়ে পৌঁছায়।

রবার্ট প্রিস্টন বলেন, এর আগে তিনি যত ট্রেন চালিয়েছেন - সেসব থেকে ইউরোস্টারের এই ট্রেনটি ছিল একেবারেই ভিন্ন রকমের।

"এটা ছিল খুব দ্রুতগতির। এর আগে আমি ইন্টার সিটি ট্রেন চালিয়েছি যেগুলো এক শহর থেকে আরেক শহরে চলাচল করে। এসব ট্রেন ঘণ্টায় ১২৫ মাইল গতিতে চলত। কিন্তু ইউরোস্টারের এই ট্রেন চলেছে ঘণ্টায় দুশো মাইল গতিতে।"

ইউরোস্টার চালানোর আগে রবার্ট প্রিস্টনকে দেওয়া হয়েছে বিশেষ কিছু প্রশিক্ষণ। এছাড়াও তাকে নতুন একটি ভাষা শিখতে হয়েছে।

"আমাদের ফরাসী ভাষা শিখতে হয়েছে। আমাদের সবার কাছেই এই ভাষা ছিল নতুন। ফ্রান্সে পৌঁছানোর পর ফরাসী ভাষাতে বলা হয়েছে যে কোথায় কীভাবে ট্রেন চালাতে হবে," বলেন তিনি।

সিগনালিং সিস্টেম বুঝতেও চালকদেরকে ফরাসী ভাষা জানতে হয়েছে।

রবার্ট প্রিস্টন বলেন, ট্রেনের সামনের যে ঘরটিতে চালক বসতেন সেখানে ছিল ছোট্ট একটি জানালা।

"আমরা যখন এরকম একটি নকশা দেখলাম তখন এবিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম। তারা বলেছে, ট্রেনটি যখন টানেলের ভেতর দিয়ে যাবে তখন বেশিরভাগ সময়েই টানেলের ভেতরে বাতি জ্বালানো থাকবে।"

"ট্রেন যখন দ্রুত গতিতে লাইটের পাশ দিয়ে ছুটে যাবে তখন চালকের চোখে তার একটা প্রভাব পড়বে। একারণে তারা সামনে মাত্র একটি জানালা রেখেছিল। আকারেও ছিল বেশ ছোট।"

"আমরা যখন ট্রেন চালাতে শুরু করলাম, দেখলাম যে এটা আসলে কোন সমস্যা তৈরি করছে না। বরং এটা আমাদের জন্য সহায়ক হয়েছিল।"

তিন ঘণ্টার যাত্রা শেষে ট্রেনটি প্যারিসের গার দি নর্দ স্টেশনে পৌঁছায়।

তিনি বলেন, "প্যারিসে গিয়ে যখন পৌঁছেছি ট্রেনটা খুব ধীরে ধীরে স্টেশনে থামানো হয়েছে। আমরা নির্ধারিত সময়ের দু'তিন মিনিট আগেই সেখানে পৌঁছে যাই।"

রবার্ট প্রিস্টন বলেন, "পুরো যাত্রা যেভাবে শেষ হয়েছে তাতে আমরা বেশি খুশি ছিলাম। নিরাপত্তা রক্ষীরা সবকিছু পরীক্ষা করে দেখলো। ইউরোস্টারের পক্ষ থেকে সবাইকে একটি করে সার্টিফিকেট দেয়া হলো দিনটিকে স্মরণে রাখার জন্য। দেয়া হলো স্যুভেনিরও।"

"একজন যাত্রী আমদের বললো তার টিকেটে স্বাক্ষর দেয়ার জন্য। আমাদের তিনজনকে বহু মানুষ ঘিরে ধরলে হুড়োহুড়ি লেগে গেল।"

ইংলিশ চ্যানেলের নিচ দিয়ে ইউরোস্টারের ট্রেনের প্রথম যাত্রার চালক রবার্ট প্রিস্টন বলেন, প্যারিসে পৌঁছে ৪০/৫০ মিনিট ধরে তারা লোকজনকে অটোগ্রাফ দিয়েছিলেন।

তার জন্য এটি ছিল দারুণ এক অভিজ্ঞতা যা সব ট্রেন চালকের হয় না।