আফগানিস্তান: বাগরাম-এর গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ছেড়ে যাচ্ছে মার্কিন ও নেটো বাহিনী

মার্কিন বিমান বাহিনীর একটি পরিবহন বিমান বাগরাম বিমান ঘাঁটিতে অবতরণ করছে ১লা জুলাই ২০২১

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, বৃহস্পতিবার আমেরিকান বিমান বাহিনী বাগরামের বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করেছে

প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন আমেরিকান এবং নেটো বাহিনীর শেষ সদস্যরা আফগানিস্তানের বাগরাম বিমানঘাঁটি ছেড়ে গেছে।

প্রায় বিশ বছর ধরে এই ঘাঁটি থেকেই বিদেশি বাহিনী তালেবান এবং আল কায়েদার ওপর আক্রমণ চালিয়েছে।

তাদের বাগরাম ছেড়ে যাওয়ার অর্থ হল আফগানিস্তান থেকে বিদেশি সৈন্য সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া খুব শিগগিরি সম্পন্ন হচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন আমেরিকান বাহিনী সেখান থেকে পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হবে ১১ই সেপ্টেম্বরের মধ্যে।

কিন্তু কাবুলের উত্তরে বিস্তীর্ণ এই ঘাঁটি থেকে বিদেশি সেনা প্রত্যাহার করা হচ্ছে যখন আফগানিস্তানের জিহাদী গোষ্ঠী তালেবান দেশটির বহু এলাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

সম্পর্কিত খবর পড়তে পারেন:

1px transparent line

প্রত্যাহারের জন্য ১১ই সেপ্টেম্বরের যে চূড়ান্ত সময়সীমা ধার্য করা হয়েছে , সেই তারিখেই ২০০১ সালে আমেরিকায় চালানো সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় তিন হাজার মানুষ।

ওই হামলা চালিয়েছিল আন্তর্জাতিক জঙ্গী গোষ্ঠী আল কায়েদা। তালেবানের সহায়তায় তখন তাদের মূল ঘাঁটি ছিল আফগানিস্তানে।

ঐ বছরই পরের দিকে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন জোট দুটি গোষ্ঠীকেই পরাজিত করতে আফগানিস্তানে আক্রমণ চালায়।

তালেবান আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয় ১৯৯৬ সালে।

তালেবানের পুনরুত্থান

আমেরিকা এখন তাদের সবচেয়ে দীর্ঘ এই লড়াইয়ের অবসান চাইছে। এই যুদ্ধে বহু প্রাণহানি হয়েছে।

অর্থের হিসাবেও এই যুদ্ধে ব্যয় হয়েছে বিশাল। আমেরিকা এখন আফগান সরকারের হাতে দেশটির নিরাপত্তার দায়িত্ব তুলে দিতে চাইছে।

কিছুদিন আগে পর্যন্তও আফগানিস্তানে প্রায় আড়াই থেকে সাড়ে তিন হাজার আমেরিকান সৈন্য ছিল।

তারা চলে যাবার পর এক হাজারের কম মার্কিন সেনা আফগানিস্তানে থাকবে।

মে মাস নাগাদ আফগানিস্তানে জোট বাহিনীর অন্যান্য দেশের সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ হাজার।

ধারণা করা হচ্ছে এদের বেশিরভাগই আফগানিস্তান ছেড়ে চলে গেছে। জার্মানি এবং ইতালিও বুধবার ঘোষণা করেছে দেশটিতে তাদের মিশন শেষ।

বাগরাম বিমান ঘাঁটি
ছবির ক্যাপশান, বাগরাম বিমান ঘাঁটি

এদিকে বিদেশি সেনাদের চলে যাবার খবরে আশান্বিত তালেবান আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

তারা বেশ কিছু জেলায় তাদের আধিপত্য বিস্তার করেছে।

বিদেশি বাহিনী পুরোপুরি দেশ ত্যাগ করার পর নতুন করে আবার গৃহযুদ্ধ বাধার আশংকা রয়েছে।

Presentational grey line

তালেবানের জন্য শীর্ষ টার্গেট - বিশ্লেষণ

বিবিসির আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী বিষয়ক প্রধান সংবাদদাতা লিস ডুসেট বলছেন বাগরাম ভবিষ্যতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক নির্দেশক।

আমেরিকান সামরিক শক্তির প্রতীক এই বিমান ঘাঁটি একসময় সোভিয়েত বাহনীর দখলে ছিল।

খুবই শিগগিরি শহরের মধ্যে এই বিস্তীর্ণ ও ব্যস্ত বিমানঘাঁটি এলাকার দখল নেবার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে আফগান নিরাপত্তা বাহিনীকে।

বাগরামের দখল নেয়া খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে জানাচ্ছেন লিস ডুসেট।

তিনি বলছেন প্রতীকী অর্থে এবং কৌশলগত কারণেও এই বিমানঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নেয়া জরুরি।

তালেবান যোদ্ধারা দেশের বিভিন্ন জেলায় তাদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে যেভাবে এগোচ্ছে তাতে এটা স্পষ্ট যে তাদের নজর বাগরামের ওপর, বলছেন লিস ডুসেট।

তিনি বলছেন বাগরাম বিমান ঘাঁটিকে কেন্দ্র করে যে শহর এলাকা গড়ে উঠেছে অক্টোবরে সেখানে গিয়ে এলাকার বাসিন্দাদের তিনি বলতে শুনেছেন তালেবান শহরের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে।

মিস ডুসেট বলছেন আমেরিকান বাহিনী যখন বিমান ঘাঁটি ছাড়ার জন্য তল্পিতল্পা গুছাচ্ছিলো তখন সেখানে গিয়ে তিনি বিদেশি সেনাদের দেশ ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে মিশ্র মনোভাব লক্ষ্য করেছেন।

বিমান ঘাঁটির দেয়ালের ভেতর রয়েছে বিপুল পরিমাণ সামরিক রসদের ভাণ্ডার। এই অস্ত্র সম্ভারই তালেবানের জন্য শীর্ষ টার্গেট।

তবে এই বিমান ঘাঁটিকে ঘিরে যে জনপদ ও জীবিকা গড়ে উঠেছে, যার ওপর বহু সাধারণ মানুষের রুটি রুজি নির্ভর করছে, তারা এখন তাদের ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিতাগ্রস্ত।

লিস ডুসেট বলছেন, বাগরামের যে নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে তা গভীরভাবে উদ্বেগজনক।

Presentational grey line

বাগরাম কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

বাগরাম বিমান ঘাঁটিটি কাবুলের ৪০ কিলোমিটার (২৫ মাইল) উত্তরে। এর নামকরণ কাছের একটি গ্রামের নামে।

বাগরাম বিমান ঘাঁটিটি গড়ে তুলেছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, যখন তারা ১৯৮০এর দশকে আফগানিস্তান দখল করে।

মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন বাহিনী সেখানে যায় ২০০১ সালের ডিসেম্বরে এবং এই ঘাঁটির পরিসর তারা ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে তোলে। সেখানে এখন দশ হাজার সৈন্য থাকতে পারে।

বিবিসি বাংলার আরও খবর:

1px transparent line

বাগরামে বিমান ওঠানামার জন্য দুটি রানওয়ে আছে, এর মধ্যে নতুন রানওয়েটি ৩.৬ কিলোমিটার লম্বা। সেখানে নামতে পারে বিশাল মালবাহী বিমান এবং বোমারু বিমান।

বিমান পার্ক করার জন্য সেখানে ১১০টি জায়গা আছে। এগুলো বিস্ফোরণ প্রতিরোধী দেয়াল দিয়ে সুরক্ষিত।

এ্যাসোসিয়টেড প্রেস সংবাদ সংস্থার খবর অনুযায়ী, এলাকার মধ্যে রয়েছে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল, জরুরি সেবার জন্য নির্দিষ্ট এলাকা, অস্ত্রোপচারের জন্য তিনটি অপারেটিং থিয়েটার এবং আধুনিক সরঞ্জামবিশিষ্ট দন্ত চিকিৎসার ক্লিনিক।

সেখানে আছে সংঘাতের সময় গ্রেপ্তার হওয়া বন্দীদের কারাগার। যুদ্ধ যখন তুঙ্গে, তখন এই কারাগার পরিচিত হয়ে উঠেছিল আফগানিস্তানের গুয়ান্তানামো নামে।

আল কয়েদা সন্দেহভাজনদের সিআইএর জিজ্ঞাসাবাদ নিয়ে আমেরিকান সেনেটের একটি রিপোর্টে এই কারাগারের নাম উঠে আসে।

কিউবার গুয়ান্তানামোয় কুখ্যাত মার্কিন কারাগারের মত আফগানিস্তানের কারাগারেও বন্দীদের ওপর অকথ্য অত্যাচার ও নির্যাতন চালানোর কথা জানা যায়।

গত মাসে কান্দাহারের উত্তরে আহত এই আফগান সৈন্যদের হেলিকপ্টার অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গত মাসে কান্দাহারের উত্তরে আহত এই আফগান সৈন্যদের হেলিকপ্টার অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয়

পরবর্তীতে কী ঘটছে?

এ্যাসোসিয়টেড প্রেস জানাচ্ছে প্রায় ৬৫০ জন মার্কিন সৈন্য আফগানিস্তানে থেকে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তারা কাবুল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রহরায় সহায়তা করবে এবং কূটনীতিকদের সুরক্ষা দেবে।

তারা বর্তমান এই বিমানবন্দরের নিরাপত্তার কাজ করছে নেটোয় আমেরিকার মিত্র দেশ তুরস্কের সৈন্যদের সাথে হাত মিলিয়ে।

আফগান সরকারের সাথে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তারা সেখানে থাকবে।

বাকি আমেরিকান সৈন্যরা কাবুলে মার্কিন দূতাবাসে প্রহরার কাজ করবে।

সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কাবুলকে সুরক্ষিত রাখতে এবং তালেবানকে দূরে রাখতে আফগান সরকার কতটা সফল হয়, তা নির্ভর করবে দেশটির সরকার বাগরামের নিয়ন্ত্রণ কতটা বজায় রাখতে সক্ষম হয় তার ওপর।

তালেবান গত ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির আওতায় জোট বাহিনীর ওপর হামলা বন্ধ করলেও আফগানিস্তানের সরকারি বাহিনীর ওপর আক্রমণ তারা অব্যাহত রেখেছে।

আমেরিকান এয়ার ফোর্সের এফ -১৬ জঙ্গী ফ্যালকন বিমান রাতের অভিযানের জন্য বাগরাম থেকে উড়ছে ২২শে অগাস্ট ২০১৭

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, যুদ্ধের সময় আমেরিকান জঙ্গী বিমান তাদের মিশন চালাতে বাগরাম বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করেছে, যেমন আমেরিকান এয়ার ফোর্সের এই এফ -১৬ জঙ্গী ফ্যালকন বিমানটি রাত্রিকালীন অভিযানের জন্য বাগরাম থেকে উড়ছে

তালেবানের প্রতিক্রিয়া

তালেবানের একজন মুখপাত্র জাবিহউল্লাহ মুজাহিদ বাগরাম থেকে মার্কিন সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহারকে স্বাগত জানিয়ে এএফপি সংবাদ সংস্থাকে বলেছেন "এর মধ্যে দিয়ে আফগান জনগণের নিজেদের ভবিষ্যত নির্ধারণের পথ প্রশস্ত হবে।"

ধারণা করা হয়, এই লড়াইয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৪৭ হাজারের বেশি বেসামরিক আফগান এবং প্রায় ৭০ হাজার আফগান সৈন্য।

একই সঙ্গে নিহত হয়েছে ২,৪৪২ আমেরিকান সৈন্য, ৩,৮০০র ওপর আমেরিকান বেসরকারি নিরাপত্তা কর্মী এবং জোট বাহিনীতে অন্যান্য দেশের ১,১৪৪জন সৈন্য।

ভিডিওর ক্যাপশান, ইরাক, আফগানিস্তান যুদ্ধের জন্য যেভাবে দুঃখ প্রকাশ করছেন মার্কিন ফটোগ্রাফার
1px transparent line