বাচ্চার যত্ন-আত্তি, সুস্থতার জন্য বাজারে নতুন নতুন প্রযুক্তি

    • Author, সুজান বেয়ার্ন
    • Role, বাণিজ্য সংবাদদাতা, বিবিসি

নতুন বাবা-মা হওয়ার মধ্যে যেমন আনন্দ-আবেগ কাজ করে, তেমনি শিশুর ভাল-মন্দ নিয়ে জীবনে যোগ হয় নতুন উদ্বেগ। বাবা মায়েদের সেসব উদ্বেগ দূর করার স্লোগান নিয়ে বাজারে আসতে শুরু করেছে নতুন নতুন প্রযুক্তি কোম্পানি।

এ বছরের গোড়ার দিকে যখন ব্রিটিশ দম্পতি স্টিভেন ও আলেকজান্দ্রা গাওয়ারের প্রথম সন্তান ফিনলের জন্ম হয়, তাকে সুস্থ-স্বাভাবিক একটি নবজাতক শিশুই মনে হয়েছিল। কিন্তু ঠিক চার সপ্তাহ পর সে অসুস্থ হয়ে পড়ে।

“ঘনঘন বমি করতে শুরু করে সে," বলেন লন্ডনের কাছে হার্টফোর্ডশায়ার এলাকার বাসিন্দা স্টিভেন গাওয়ার। “পেটে কিছুই রাখতে পারতো না।"

জিপি অর্থাৎ স্থানীয় পারিবারিক চিকিৎসক তাদের বললেন ফিনলের পাকস্থলীতে অ্যাসিড তৈরি হচ্ছে বলেই সে বমি করছে। সেইমত ওষুধ দিলেন তিনি। কিন্তু তাতে বমি না কমায়, বাবা-মা আবারো ডাক্তারের কাছে গেলেন। ডাক্তার তাদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ওষুধ কাজ করতে কিছুটা সময় লাগবে।

কিন্তু ফিনলের অবস্থা ভালো হওয়ার বদলে খারাপ হতে শুরু করলে গাওয়ার দম্পতি একদিন তাকে স্থানীয় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে হাজির হন।

“সেখানে ডাক্তাররা কিছু টেস্ট করলেন। তারপর বললেন, জিপি ঠিকই বুঝেছেন, বাচ্চার পাকস্থলীতে অ্যাসিড তৈরি হচ্ছে। কিন্তু একইসাথে হাসপাতালের ডাক্তাররা মনে করলেন প্রথমে যে ওষুধ তাকে দেয়া হয়েছে সেটা ফিনলের শরীরে হয়তো কাজ করছে না, উল্টো প্রতিক্রিয়া হচ্ছে,“ বললেন মি. গাওয়ার।

বিবিসি বাংলার আরও খবর:

কিন্তু ওষুধ বদলে দিলেও ফিনলের উপসর্গ কমল না । কোনো খাবারই সে পেটে ধরে রাখতে পারছিল না। একদিন মি. গাওয়ার জরুরি স্বাস্থ্য বিভাগে (১১১) ফোন করে তাদের পরামর্শ-মত আবারো বাচ্চাকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলেন। হাসপাতালের ডাক্তাররা বললেন, ওষুধ কাজ করতে তিনদিন সময় লাগবে, তাদের ধৈর্য ধরতে হবে।

“কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছিলাম আমাদের বাচ্চা অভুক্ত থেকে যাচ্ছে,“ বললেন মি গাওয়ার।

জুনোর সন্ধান এবং রোগ নির্ণয়

মরিয়া হয়ে তিনি এক বন্ধুকে ফোন করলেন যিনি একসময় নার্স হিসাবে কাজ করতেন। ঐ বন্ধু তখন তাকে জুনো নামে একটি অনলাইন অ্যাপের সন্ধান দিলেন।

এই অ্যাপের মাধ্যমে বাবা-মা সরাসরি দ্রুত শিশু চিকিৎসক এবং প্রশিক্ষিত নার্স এবং ধাত্রীর সাথে যোগাযোগ করতে পারে এবং অনলাইনে চ্যাট করতে পারে। তবে এই অ্যাপ ব্যবহার করতে পয়সা লাগে।

মি. গাওয়ার মোবাইল ফোনে জুনো ডাউনলোড করে একজন বিশেষজ্ঞ শিশু চিকিৎসকের সাথে লাইভ চ্যাটে ফিনলের অসুস্থতা নিয়ে আলাপ করলেন।

অনলাইন চ্যাটে ঐ ডাক্তার তখন বলেন, ফিনলে হয়তো পাইলোরিক-স্টেনোসিসে ভুগছে, অর্থাৎ তার পাকস্থলী এবং ক্ষুদ্রান্তের সংযোগস্থলটি স্বাভাবিকের তুলনায় সরু যার ফলে বারবার সে বমি করছে।

এ কথা শোনার পর মি গাওয়ার আবারো ছেলেকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। রক্ত পরীক্ষা করার পর নিশ্চিত হওয়া গেল আসলেই বাচ্চা পাইলোরিক স্টেনোসিসে ভুগছে। এরপর একটি হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে তার অস্ত্রোপচার হয়।

ফিনলে এখন পুরোপুরি সুস্থ। ভালো খেতে পারছে। তার ওজন বেড়েছে।

কিন্তু জুনো আ্যপের খোঁজ না পেলে, মি. গাওয়ার বলেন, “জানি না আমাদের বাচ্চার অবস্থা এখন কী দাঁড়াতো!“

ফিনলেকে নিয়ে তার বাবা-মায়ের যে অভিজ্ঞতা সেটি যে সবক্ষেত্রেই হচ্ছে তা হয়তো নয়, কিন্তু এ থেকে বোঝা যায় যে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বাবা-মায়েদের সাহায্য করছে।

ফরোয়ার্ড ক্লিনিক্যাল নামের লন্ডন-ভিত্তিক একটি কোম্পানি জুনো অ্যাপের উদ্ভাবক। তাদের কথা - ইংল্যান্ডের জাতীয় স্বাস্থ্য বিভাগের (এনএইচএস) বিকল্প হওয়া তাদের উদ্দেশ্য নয়, বরঞ্চ ''জুনোর কাজ হবে এর ব্যবহারকারীদের বাড়তি কিছু সাহায্য দেয়া।''

জুনো অ্যাপের সাথে যুক্ত বিশেষজ্ঞ শিশু চিকিৎসক ড. শ্রুতি গানাত্রা জানান, এনএইচএসের অনেক ডাক্তার এবং ধাত্রী তাদের ছুটির দিনে জুনোর জন্য কাজ করেন। ''আমি নিজে এনএইচএস-এর একজন ডাক্তার, এবং আমি এনএইচএস-এর ঘোরতর একজন সমর্থক,'' বলেন ড. গানাত্রা।

''১১১ ফোন লাইনের মত সেবাগুলোর তুলনা হয় না। কিন্তু এনএইচএস-এর ওপর চরম চাপ তৈরি হয়েছে। সন্তান-সম্ভবা মায়েদের বা নতুন বাবা-মায়েদের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দেখা পতে মাঝে-মধ্যে অনেক সময় লেগে যায়। এই সমস্যার সমাধানের একটি উপায় হিসাবে জুনো অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে।''

স্মার্ট মোজা

অ্যাপের সাহায্যে দ্রুত একজন চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়া থেকে শুরু করে হাতে-পায়ে যান্ত্রিক বেল্ট পরিয়ে বাচ্চার ওপর নজর রাখার জন্য ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় বাবা-মায়েরা প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে।

শিশুর যত্ন-আত্তির জন্য ব্যবহৃত এসব প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার হচ্ছে। শুধু শিশুর ওপর নজর রাখার জন্য যেসব প্রযুক্তি বের হয়েছে সেগুলোর বিক্রি এখন প্রায় ১০০ কোটি ডলার। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৮ সাল নাগাদ এসব প্রযুক্তির বিক্রি দাঁড়াবে ১৮০ কোটি ডলার।

আমেরিকান প্রযুক্তি কোম্পানি ‘আউলেট বেবি কেয়ার‘ বাচ্চাদের জন্য স্মার্ট সক্স (স্মার্ট মোজা) বাজারে এনেছে যে মোজা একটি অ্যাপের সাথে সংযুক্ত।

নবজাতক শিশু থেকে শুরু করে ১৮ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুদের এই মোজা পরানো যাবে। এতে, শিশুর ঘুমের সময় তাদের হৃদযন্ত্রের গতি এবং শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা যাবে।

এর ফলে, বাচ্চার ঘুমের ধরন সম্পর্কেও বাবা-মায়েরা ধারণা পাবে - যেমন, বাচ্চা কতক্ষণ ঘুমাচ্ছে ? কত ভালো তার ঘুম হচ্ছে?

ব্রিটেনে আউলেটের প্রধান সীমা সেগাল বলেন এই স্মার্ট মোজা বাবা-মায়ের ‘শান্তি ও স্বস্তির‘ কথা চিন্তা করে তৈরি করা হয়েছে: ''এটি পরিয়ে রাখলে জানা যাবে বাচ্চা ভালো আছে, বাচ্চা উপুড় হলো কিনা তা বোঝা যাবে, তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে কিনা তা টের পাওয়া যাবে।''

ঘুম ভাঙলেই ঘুমপাড়ানি গান

আয়ারল্যান্ডের একজন প্রোডাক্ট ডিজাইনার ৪২ বছরের আনাক মার্টিন ছেলে রিও‘র ঘুমের সমস্যা সামাল দিতে লুলাই নামে একটি অ্যাপ ব্যবহার করছেন।

লুলাই বাচ্চাদের ঘুমের প্যাটার্ন পর্যবেক্ষণ করে এবং অবস্থা বুঝে নানা ঘুমপাড়ানি গান, প্রকৃতির শব্দ এগুলো বাজিয়ে বাচ্চাকে আবারো ঘুমিয়ে যেতে সাহায্য করে।

স্পেনের একটি নতুন প্রযুক্তি কোম্পানি এই আ্যপটি তৈরি করেছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে অ্যাপটি বুঝতে পারে যে কোন শিশু কোন ধরনের শব্দে আকৃষ্ট হয় এবং দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ে।

''আমার বড় ছেলে তিন বছর ধরে ঠিকমত ঘুমায়নি,'' বলেন মিস মার্টিন। ''এটা নিয়ে আমরা ক্লান্ত-বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলাম। যখন আমাদের দ্বিতীয় সন্তানের (রিও) জন্ম হলো, ততদিনে আমরা শিক্ষা নিয়েছি।''

''যখন রিও তার চার মাস বয়স থেকে প্রতি ৪০ মিনিট অন্তর জেগে যেতে শুরু করলো, আমি অনলাইনে সমাধানের উপায় খুঁজতে শুরু করলাম এবং লুলাইয়ের সন্ধান পেলাম।''

''বাচ্চা জেগে গেলেই অ্যাপটি থেকে হাল্কা মিউজিক এবং অন্যান্য শব্দ হয়। আমি ফোনটি রিওর ঘরে রেখে দিতে শুরু করি। পাঁচদিনের মাথায় দেখলাম সে টানা ১২ ঘণ্টা ঘুমিয়েছে। আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি,'' বলছিলেন আনাক মার্টিন।

তিনি জানালেন, সেই থেকে রিও ঠিকমত ঘুমাচ্ছে। ''অ্যাপ থেকে বাজা কিছু মিউজিক খুবই পছন্দ করে সে। অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।''

সম্ভাব্য ঝুঁকি

বাচ্চাদের এবং তাদের বাবা-মায়েদের টার্গেট করে যেসব প্রযুক্তি বাজারের আসছে তার যত সুবিধাই থাকুক না কেন, শিশু মনোবিজ্ঞানী ড. অ্যামান্ডা গামার মনে করেন এসব প্রযুক্তি স্বস্তির বদলে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিতে পারে।

''মাত্র কয়েক প্রজন্ম আগেও এসব কিছুই ছিলনা, কিন্তু তারপরও মানুষ অনেক নির্ভার, নিশ্চিন্ত থাকতো,'' তিনি বলেন। ''গোসলের পানি সহনীয় মাত্রায় গরম কিনা মানুষ তা আঙ্গুল চুবিয়ে বুঝতো, তাদের বাথ ব্যারোমিটার লাগতো না।''

''উদ্বিগ্ন হয়ে এসব প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া কোনো কাজর কথা নয়। মূল সমস্যা হচ্ছে যে বাবা-মায়েরা অতিমাত্রায় স্পর্শকাতর হয়ে পড়ছে। তারা স্বস্তিতে থাকতে পারছে না।''

ড. গামার বলেন, ''উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, যখনই বেবি মনিটরে তারা কোনো শব্দ শুনছে, তড়াক করে উঠে বসছে। বাবা-মায়েদের বুঝতে হবে যে বাচ্চাকে নিয়ে তাদের যে স্বাভাবিক প্রবৃত্তি প্রযুক্তি তার বিকল্প হতে পারেনা।''

তবে আউলেট বেবি কেয়ারের মিস সেগাল বলেন, ''অবশ্যই আপনার স্বাভাবিক প্রবৃত্তির ওপর আপনার ভরসা থাকতে হবে। কিন্তু জীবনের অন্যান্য দিকের মত, সন্তান লালনেও প্রযুক্তি আপনাকে সাহায্য করতে পারে। আপনার উদ্বেগ কমাতে পারে। আপনার মনকে শান্ত রাখতে পারে।''