আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
মোদীর প্রশংসাকারী, বিতর্কিত বিচারপতির নিয়োগকে ঘিরে ভারতে প্রশ্ন
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
ভারতে সুপ্রিম কোর্টের একজন অত্যন্ত বিতর্কিত সাবেক বিচারপতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রধান নিযুক্ত হওয়ার পর সেই নিয়োগকে ঘিরে নানা মহলে প্রশ্ন উঠছে ও ওই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা হচ্ছে।
বিচারপতি অরুণ মিশ্র গত বছর যখন সুপ্রিম কোর্টে ছিলেন, তখন একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছিলেন, "মোদী একজন বহুমুখী প্রতিভা এবং আন্তর্জাতিক স্তরে প্রশংসিত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা।"
শীর্ষ আদালতের বিচারপতির মতো দায়িত্বশীল পদে থেকে তিনি কীভাবে নির্বাহী বিভাগের প্রধানের এরকম 'স্তুতি' করতে পারেন, তখন তা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছিল।
বিচারপতির পদ থেকে অবসর নেওয়ার ন'মাস বাদে সেই প্রধানমন্ত্রী মোদীর নেতৃত্বেই একটি পাঁচ সদস্যের সিলেকশন প্যানেল তাঁকে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে বেছে নিয়েছে।
প্যানেলের অন্যতম সদস্য, রাজ্যসভায় কংগ্রেসের দলনেতা মল্লিকার্জুন খর্গে এই নিয়োগে আপত্তি জানালেও তাঁর মতামত আমলে নেওয়া হয়নি। পরে তার আপত্তির কথা একটি চিঠিতে মি খর্গে প্রকাশ্যেও এনেছেন।
বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:
এদিকে অরুণ মিশ্রকে মানবাধিকার কমিশনের প্রধানের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য বিরোধিতা করে বিবৃতি দিয়েছেন ভারতের বহু অ্যাক্টিভিস্ট, শিক্ষাবিদ ও গবেষক।
দেশের অন্তত ৭১জন মানবাধিকার কর্মী ও আন্দোলনকারী গত সপ্তাহে তাদের ওই বিবৃতিতে লিখেছেন, "বিচারপতি হিসেবে রাজনৈতিক স্পর্শকাতর সব মামলায় তিনি হয় কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ নিয়েছেন কিংবা কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ নেতাদের সাহায্য করেছেন।"
ওই বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজের সদস্য রবিকিরণ জৈন, ভি. সুরেশ ও মিহির দেশাই।
এ ছাড়া শিক্ষাবিদ নন্দিনী সুন্দর, অপূর্বানন্দ এবং মানবাধিকার অ্যাক্টিভিস্ট আকার প্যাটেল ও হর্ষ মান্দেরও ওই বিবৃতিতে সই করেছেন।
কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে অরুণ মিশ্রর কার্যকাল কেন এতটা বিতর্কত হয়ে উঠেছিল?
সাবেক প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ-র বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টেরই একজন কর্মী যখন যৌন লাঞ্ছনার অভিযোগ আনেন, তখন তাকে সেই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে রায় ঘোষণা করেছিলেন বিচারপতি অরুণ মিশ্র।
জাস্টিস মিশ্রকে সেই 'তদন্ত কমিটি'তে মনোনীত করেছিলেন রঞ্জন গগৈ নিজেই। কোর্টের একটি ছুটির দিনে অভিযোগের শুনানি হয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্টে অরুণ মিশ্রর সোয়া ছয় বছরের মেয়াদে একের পর এক প্রধান বিচারপতিরা তাকে সংবেদনশীল নানা মামলার বেঞ্চে মনোনীত করেছেন - অনেক ক্ষেত্রেই আরও অনেক সিনিয়র বিচারপতিকে টপকে।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল বিশেষ সিবিআই বিচারক বি. এইচ. লোয়ার 'রহস্যজনক' মৃত্যুর তদন্ত চেয়ে পিটিশন দাখিল করা হলে তার শুনানির ভার যখন অন্তত নজনকে টপকে বিচারপতি অরুণ মিশ্রকে দেওয়া হয়।
সিবিআই জাজ লোয়া যখন মারা যান তখন তিনি সোহরাবউদ্দিন শেখ এনকাউন্টার মামলাটি শুনছিলেন, যাতে অভিযুক্তদের মধ্যে ছিলেন দেশের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
অরুণ মিশ্রকে এই দায়িত্ব দেওয়ার পর দিনই সুপ্রিম কোর্টের চারজন শীর্ষ বিচারপতি প্রতিবাদে দিল্লিতে এক নজিরবিহীন সাংবাদিক বৈঠক করেন।
কিন্তু তার আগে বা পরেও বহুবারই কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের পক্ষে অস্বস্তিকর বহু মামলার শুনানির ভার পেয়েছিলেন অরুণ মিশ্র।
গুজরাটের পুলিশ কর্মকর্তা সঞ্জীব ভাট, যিনি ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গায় নরেন্দ্র মোদীর ভূমিকা সামনে এনেছিলেন, সুপ্রিম কোর্টে তার আবেদনের শুনানিও হয়েছিল বিচারপতি অরুণ মিশ্রর বেঞ্চে।
গুজরাটের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা হারীন পান্ডিয়ার হত্যা মামলায় যখন নতুন কিছু সাক্ষ্যপ্রমাণ সামনে আসে, তখন সেই ঘটনায় নতুন করে তদন্তের দাবিও খারিজ করে দেন বিচারপতি অরুণ মিশ্র।
উল্টে তিনি সেই মামলায় আবেদনকারী সংস্থাকে পঞ্চাশ হাজার রুপি জরিমানা করেন।
এই রকম উদাহরণ অজস্র। বস্তুত বিচারপতি মিশ্রর অবসরের ঠিক পর 'আর্টিকল ফোরটিন' সাময়িকীতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ভারতের তিনজন খ্যাতনামা আইনজীবী লিখেছিলেন, জাস্টিস মিশ্র কার্যত 'হিজ মাস্টার্স ভয়েস' হয়ে উঠেছিলেন।
ওই তিনজন আইনজ্ঞ ছিলেন অনুপ সুরেন্দ্রনাথ, অপর্ণা চন্দ্রা ও সুচিন্দ্রন ভাস্কর নারায়ণ।
সুপ্রিম কোর্ট থেকে বিচারপতি অরুণ মিশ্রর অবসরের ঠিক পর পরই 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস' পত্রিকায় দিল্লি হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি রেখা শর্মা 'গুডবাই জাস্টিস মিশ্রা' নামে একটি প্রতিবেদন লেখেন।
সেখানে তিনি ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ অলিভার ক্রমওয়েলকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, "ইউ স্যাট টু লং। উই আর ডান উইথ ইউ!" অর্থাৎ অনেক হয়েছে বিচারপতি মিশ্র, এবার আপনাকে বিদায় জানানোর পালা।
কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, ন'মাসের মধ্যেই অরুণ মিশ্র আবার পাদপ্রদীপের আলোয় ফিরে এলেন - এবারে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবে।
নিয়োগের পরদিন, গত বুধবারই (৩রা জুন) তিনি দিল্লিতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন।