মাদক: এলএসডি কী আর কেন এটা আপনার জন্য ভয়ঙ্কর ক্ষতির কারণ হতে পারে?

বিশ্বের নানা দেশে বিষণ্ণতা, দুশ্চিন্তা, মানসিক অবসাদের মত অসুস্থতার চিকিৎসায় এলএসডি'র কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন মনোচিকিৎসক ও রসায়নবিদরা।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিশ্বের নানা দেশে বিষণ্ণতা, দুশ্চিন্তা, মানসিক অবসাদের মত অসুস্থতার চিকিৎসায় এলএসডি'র কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন মনোচিকিৎসক ও রসায়নবিদরা।

বাংলাদেশের গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে তিন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে যারা অনলাইনে এলএসডি (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডায়েথিলামাইড) বিক্রি করতো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ ছাত্রের মৃত্যু হয় গত ১৫ই মে ঢাকা মেডিকেল কলেজে। সে সময় তার পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এর সপ্তাহ খানেক পর তার পরিবারের পক্ষ থেকে ঐ ছাত্রের লাশ শনাক্ত করা হয়।

এরই মধ্যে বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে ঐ ছাত্রর গলা দিয়ে রক্ত ঝরতে দেখা যায়। ভিডিওর শেষভাগে রক্তাক্ত অবস্থায় একটি রিকশায় উঠতে দেখা যায় তাকে।

পুলিশের ভাষ্যমতে, ঐ ছাত্র বন্ধুদের সাথে মাদক এলএসডি সেবন করে একজন ডাব বিক্রেতার দা নিয়ে নিজেই নিজের গলায় আঘাত করেন।

পুলিশের সন্দেহ, এলএসডি'র প্রভাবেই ভুক্তভোগী ছাত্র নিজেকে এভাবে আঘাত করেছিলেন।

এরকম ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, মানুষের জন্য এলএসডি কতটা ক্ষতিকর?

এলএসডি কী?

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনস্থ মাদক বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ড্রাগ অ্যাবিউজের তথ্য অনুযায়ী, ডি-লাইসার্জিক অ্যাসিড ডায়েথিলামাইড বা এলএসডি রাসায়নিক সংশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি একটি পদার্থ যা রাই এবং বিভিন্ন ধরণের শস্যের গায়ে জন্মানো এক বিশেষ ধরণের ছত্রাকের শরীরের লাইসার্জিক অ্যাসিড থেকে তৈরি করা হয়।

এটি স্বচ্ছ, গন্ধহীন একটি পদার্থ। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের মতে এটি পাউডার, তরল, ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের আকারে পাওয়া যায়।

এলএসডি'কে 'সাইকাডেলিক' মাদক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই ধরণের মাদকের প্রভাবে সাধারণত মানুষ নিজের আশেপাশের বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে অনুভব করে এবং কখনো কখনো 'হ্যালুসিনেট' বা অলীক বস্তু প্রত্যক্ষও করে থাকে।

আরো পড়তে পারেন:

পাউডার, তরল, ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের আকারে পাওয়া যায় এলএসডি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পাউডার, তরল, ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের আকারে পাওয়া যায় এলএসডি

উনিশশো আটত্রিশ সালে প্রথমবার এলএসডি সংশ্লেষণ করা হয়। এরপর ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে নানা ধরণের মানসিক রোগের চিকিৎসায় এলএসডি ব্যবহারের জন্য প্রচারণা চালান গবেষকরা। সেসময় এই বিষয়ে বহু বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালিত হয়, আয়োজিত হয় একাধিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনও।

উনিশশো আটত্রিশ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এলএসডিসহ সব ধরণের সাইকাডেলিক ড্রাগ নিষিদ্ধ করে। এরপর ১৯৭১ সালে জাতিসংঘ চিকিৎসা কাজে এলএসডি ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে এই বিষয়ে গবেষণায় ভাটা পড়ে।

তবে বিশ্বের নানা দেশে বিষণ্ণতা, দুশ্চিন্তা, মানসিক অবসাদের মত অসুস্থতার চিকিৎসায় এলএসডি'র কার্যকারিতা নিয়ে এখনো গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন মনোচিকিৎসক ও রসায়নবিদরা।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনে ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে আসে যে, চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে নির্দিষ্ট মাত্রায় এলএসডি গ্রহণের ফলে অসুস্থতার কারণে দুশ্চিন্তায় ভুগতে থাকা রোগীদের দুশ্চিন্তা কমে।

লন্ডন, বাসেল এবং জুরিখ শহরের ৯৫ জন রোগীর ওপর গবেষণাটি পরিচালনা করেন সুইজারল্যান্ডের বাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিসিন বিভাগের গবেষক মাথিয়াস লিখটি।

এলএসডি কেন ক্ষতির কারণ হতে পারে?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চিকিৎসার প্রয়োজনে বা গবেষণার কাজে চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে নির্দিষ্ট মাত্রায় এলএসডি গ্রহণ করে থাকে মানুষ। তবে এটি মূলত ব্যবহার হয়ে থাকে মাদক হিসেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের ভাষ্য অনুযায়ী এটি মানুষের মস্তিষ্কের সেরোটোনিন নামক রাসায়নিকের কার্যক্রম প্রভাবিত করে ব্যবহার, অনুভূতি এবং পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে ধারণা পরিবর্তন করে।

এলএসডি নেয়ার পর সাধারণত মানুষ 'হ্যালুসিনেট' করে বা এমন দৃশ্য দেখে যা বাস্তবে নেই। অনেক সময় অলীক দৃশ্য দেখার কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে থাকে মানুষ।

সুইজারল্যান্ডের ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে প্রথমবার এলএসডি সংশ্লেষণ করা সুইস রসায়নবিদ অ্যালবার্ট হফম্যানের ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সুইজারল্যান্ডের ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে প্রথমবার এলএসডি সংশ্লেষণ করা সুইস রসায়নবিদ অ্যালবার্ট হফম্যানের ছবি

এলএসডি গ্রহণ করে ভুল রাস্তা দেখে দুর্ঘটনার শিকার হওয়া, বাড়ির জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়া বা অহেতুক আতঙ্কিত হয়ে দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার বেশ কিছু ঘটনা নথিবদ্ধ রয়েছে।

ইউরোপের বিজ্ঞানী এবং গবেষকদের বাণিজ্যিক ওয়েবসাইট রিসার্চগেইট'এ ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী ১৯৫৩ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডায় মোট ৬৪ জনের মৃত্যু হয় এলএসডি গ্রহণের পরবর্তী জটিলতায়।

বিষণ্ণতা বা দুশ্চিন্তায় ভোগা ব্যক্তিরা এলএসডি গ্রহণের পর আরো বেশি বিষণ্ণতা বা দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত হতে পারেন বলেও উঠে এসেছে অনেক গবেষণায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন বলছে, এলএসডি গ্রহণের পর অনেকে মনে করেন যে তিনি সবকিছু পরিষ্কার দেখছেন এবং তার শরীরে অতিমানবিক শক্তি এসেছে। এরকম বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার ফলেও অনেকে নানা ধরণের দুর্ঘটনা শিকার হতে পারেন।

অতিরিক্ত আতঙ্কের কারণে মানুষ অনেক সময় মনে করতে পারে যে সে শীঘ্রই মারা যাবে বা মারা যাচ্ছে। এরকম পরিস্থিতিতেও মানুষ আতঙ্কের বশবর্তী হয়ে নানা ধরণের কাজ করে থাকে যার ফলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

আতঙ্কিত হওয়ার পাশাপাশি অতি দ্রুত অনুভূতির পরিবর্তন হওয়ার কারণেও মানুষ মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করতে পারে বলে বলছে ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন।

সংস্থাটি বলছে এলএসডি গ্রহণের আগে এটা বোঝা সম্ভব নয় যে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন হতে যাচ্ছে।

এছাড়া এলএসডি মানুষের শরীরে বিভিন্ন রকম প্রভাব ফেলে থাকে।

এলএসডি নেয়ার ফলে মানুষের হৃৎস্পন্দন, রক্তচাপ, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাত্রা এবং শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এছাড়া অনেকের ক্ষেত্রে অনিদ্রা, ক্ষুধামন্দা, অতিরিক্ত ঘাম সহ নানা ধরণের মানসিক সমস্যাও তৈরি হয় বলে জানাচ্ছে ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন।

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর: