বাংলাদেশে মাদকের বিরুদ্ধে কি যথেষ্ট সচেতনতা তৈরি হয়েছে

বাংলাদেশে মাদকবিরোধী অভিযান অনেক পরিবারে দুর্যোগ নিয়ে এসেছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে মাদকবিরোধী অভিযান অনেক পরিবারে দুর্যোগ নিয়ে এসেছে
    • Author, সায়েদুল ইসলাম
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

কলেজে পড়ার সময় ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মাধ্যমে ইয়াবায় আসক্ত হয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের বিশ বছরের এক তরুণী।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, "প্রথম প্রথম ওরা ফ্রি ইয়াবা দিতো, খাওয়ার ব্যবস্থাও বন্ধুরাই করে দিতো। তখন আমি বুঝতেও পারছিলাম না, আমার কোন ধারণাও ছিল না যে, কী ভয়াবহ বিপদে জড়িয়ে পড়ছি!"

তিনি বলছেন, ইয়াবা খেলে কী হয়, এর ক্ষতির দিকগুলো কী - এ সম্পর্কে তাকে কেউ কখনো সচেতন করেনি।

তবে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার পর যখন পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি বুঝতে পারেন, তখন তারা তাকে ভালো করার অনেক চেষ্টা করেন। নানা ভাবে বোঝান। রিহ্যাবে ভর্তি করেন।

কয়েক দফা রিহ্যাবে চিকিৎসার পর তিনি এখন সুস্থ হয়েছেন। বিয়ে হয়েছে, একটি সন্তানও রয়েছে।

কিন্তু এই তরুণীর মতো বাংলাদেশের আরো অনেক তরুণ-তরুণী বলছেন, তারা যখন মাদকে আসক্ত হন, তখন এর অপকারিতা বা ক্ষতির দিক সম্পর্কে তারা জানতেন না। নিছক আগ্রহ বা বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে তারা এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

ইয়াবা এখন বাংলাদেশে সবচেয়ে ভয়াবহ মাদক

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, ইয়াবা এখন বাংলাদেশে সবচেয়ে ভয়াবহ মাদক

গবেষণায় কী আছে

বাংলাদেশের নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক অধ্যাপক এমদাদুল হক ২০১৮ সালে একটি গবেষণায় বলেছেন, দেশটিতে প্রায় ৭০ লক্ষ মাদকাসক্ত রয়েছে, যাদের অধিকাংশই ইয়াবাসেবী।

এছাড়া আছে ফেন্সিডিল, হেরোইন এবং অন্যান্য মাদক।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এতদিন এ বিষয়টা খোলামেলা ভাবে আলোচিত হয় নি, কিন্তু পরিস্থিতি সত্যি ভয়াবহ।

ঢাকায় নেশাখোরদের এক আড্ডা।

ছবির উৎস, ছবির কপিরাইটFARJANA K. GODHULY

ছবির ক্যাপশান, ঢাকায় নেশাখোরদের এক আড্ডা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকাসক্তদের নিয়ে পারিবারিক বা সামাজিকভাবে লুকোছাপার কারণে একদিকে যেমন আসক্তদের চিকিৎসা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি মাদকাসক্তি ঠেকাতেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

সচেতনতা তৈরি হয়েছে কতটা

মুক্তি ক্লিনিক নামের একটি নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক ড. আলী আশকার কোরেশী বিবিসি বাংলাকে বলছেন, এটা ঠিক যে, মাদক নিয়ে পারিবারিক, সামাজিকভাবে সচেতনতার ব্যাপারে একটা ঘাটতি আছে।

"মাদক দ্রব্যের ভয়াবহতা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে, তবে তা এখনো অনেক অপ্রতুল বলা যায়। কারণ শহর এলাকা ছাড়িয়ে মাদক এখন তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে গেছে এবং তরুণরা ব্যবহার করছে"।

"যতটুকু প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ড হচ্ছে, তাও হচ্ছে বড় শহর এলাকায়, তৃণমূল পর্যায়ে আসলে সেরকম প্রচারণা নেই। কিন্তু গ্রামে-গঞ্জে মাদক পাওয়া যাচ্ছে এবং অনেক তরুণ-তরুণী আসক্ত হয়ে পড়ছে" - বলছেন মি. কোরেশী।

"শিক্ষা কার্যক্রমে ইদানীং কিছু কিছু প্রচারণা বা সচেতনতার উদ্যোগ শুরু হয়েছে, কিন্তু তাও পর্যাপ্ত নয়। কারণ প্রতিটি স্কুল-কলেজে এ ব্যাপারে সচেতনতার উদ্যোগ থাকা দরকার" বলছিলেন তিনি।

তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছেন, "যখন আমরা মাদকাসক্ত রোগীর চিকিৎসা করতে যাই, তখন দেখি তাদের অভিভাবকদেরই এ সম্পর্কে কোন ধারণা নেই। এমনকি সন্তান মাদকে আসক্ত জানার পরেও তাদের মনোভাব থাকে, দেখি না কী হয়। এভাবে কয়েক বছর পার হয়ে যায়, আর তাদের সন্তান মাদকে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে"।

"শুধু মাদকে আসক্ত নয়, তাদের পরিবার, পিতামাতার আগে সচেতন হওয়ার দরকার। যখনি কেউ সন্তানের মধ্যে আচার-আচরণের পরিবর্তন দেখতে পাবেন, তখনই তার উচিত হবে একজন বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া" তিনি বলেন।

মাদক নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক ড. আলী আশকার কোরেশী বলছেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান বা সচেতনতা শুরু করতে হবে পরিবার থেকে। সামাজিকভাবে এর বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে হবে, না হলে শুধু সরকার বা এনজিওর ওপর নির্ভর করে মাদকের এই বিপুল বিস্তৃতি ঠেকানো যাবে না।

মাদকবিরোধী অভিযানে কি কাজ হচ্ছে?

বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১১ সালে মাদক সংক্রান্ত মামলা হয়েছিল ৩৭ হাজার ৩৯৫টি, আসামি ছিল ৪৭ হাজার ৪০৩ জন। ২০১৭ সালে মামলার সংখ্যা ১ লাখ ছয় হাজার ৫৩৬ জন, আসামি এক লাখ ৩২ হাজার ৮৮৩ জন।

তারা বলছেন, ইয়াবা পরিবহনে সুবিধাজনক, দামও কম আর মিয়ানমার থেকে প্রচুর যোগান আসছে, এসব কারণে এই মাদকটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

সরকারের মাদক বিরোধী অভিযানে অনেক সন্দেহভাজন মাদক ব্যবসায়ী নিহত বা গ্রেপ্তার হয়েছে।
ছবির ক্যাপশান, সরকারের মাদক বিরোধী অভিযানে অনেক সন্দেহভাজন মাদক ব্যবসায়ী নিহত বা গ্রেপ্তার হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, মাদক ব্যবসায় রোহিঙ্গা থেকে শুরু করে নানা পেশাজীবী, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ী, ছাত্র-ছাত্রীরা জড়িয়ে পড়েছে। সরকারের মাদক বিরোধী অভিযানে অনেক সন্দেহভাজন মাদক ব্যবসায়ী নিহত বা গ্রেপ্তার হয়েছে।

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মসমর্পণ বা অভিযান অব্যাহত রাখার ঘটনার পরও ইয়াবাসহ অবৈধ মাদক পাচার বা এর ব্যবসার প্রত্যাশা অনুযায়ী কমেনি।

এর কারণ হিসাবে তারা বলছেন, মাদক বিরোধী অভিযান চললেও, এখনো মাদকে আসক্ত তরুণদের এ থেকে পুরোপুরি সরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। ফলে এর ব্যবসাও বন্ধ হচ্ছে না।

তবে বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোঃ জামাল উদ্দীন আহমেদ বলছেন, মাদকের ক্ষতি ও অপব্যবহার নিয়ে তাদের প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডে একসময় ঘাটতি থাকলেও, এখন তারা সেসব কর্মকাণ্ড অনেক বাড়িয়েছেন।

"এটা ঠিক যে, এসব কার্যক্রম সম্প্রতি বিস্তৃত করা হয়েছে। এটা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, মাদক নিয়ে এতো কথা বা চর্চা অতীতে কখনো হয়নি। মাদক একটি অবহেলিত বিষয় ছিল, ভেতরে ভেতরে মাদক যে আগ্রাসন চালাচ্ছে, আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে, সেই সচেতনতা আমাদের ছিল না" - বলছিলেন মি. আহমেদ।

নেশার কবলে ঝড়ে পড়ছে অনেক সুস্থ প্রাণ।

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, নেশার কবলে ঝড়ে পড়ছে অনেক সুস্থ প্রাণ।

তিনি আরো বলছিলেন "অভিযান চালানোর পাশাপাশি আমরা মাদকের চাহিদা হ্রাস করার নানা কর্মসূচী নিয়েছি। সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় ব্যানার ফেস্টুন ঝুলিয়ে, বিতর্ক কর্মসূচী, র‍্যালি, নানা ধরণের কর্মসূচীর মাধ্যমে মাধ্যমের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছি। গত বছরে সারাদেশে আমরা ছোটবড় মিলিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে প্রায় ৯ হাজার সমাবেশ করেছি"।

''বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায় থেকে সামাজিকভাবে এর বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির একটি চেষ্টা আমরা করছি।''

এর মধ্যে ২৮ হাজারের বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদক বিরোধী একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান তিনি। সেখানে মাদকের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।

মহাপরিচালক মোঃ জামাল উদ্দীন আহমেদ বলছেন "এখনো এটা সত্যি যে, সমাজের সবাই যে সমানভাবে জাগ্রত হয়েছে তা নয়। তবে তাদের জাগিয়ে তোলার কাজটা শুরু হয়েছে"।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন: