আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট: গাযার কর্মকর্তাদের মতে রোববার ছিল সবচেয়ে বেশি 'প্রাণঘাতী দিন'
ফিলিস্তিনে থাকা গাযার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইসরায়েলের সাথে চলমান সংঘাত শুরুর পর থেকে রোববারই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে। কর্তৃপক্ষের মতে, গাযায় ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এদিন মারা গেছে ৪০ জনের বেশি মানুষ।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী বলছে, গত সপ্তাহে ফিলিস্তিনি জঙ্গিরা ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে তিন হাজারের বেশি রকেট ছুড়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আরো বেশি সংঘাত হলে ওই এলাকায় "নিয়ন্ত্রণহীন সংকট" তৈরি হবে।
তিনি এমন ভয়ংকর সহিংসতার জরুরী ভিত্তিতে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
সোমবার ভোরে, ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে হামাস রকেট ছোড়ার পরপরই গাযা শহরের বেশ কয়েকটি এলাকায় বিমানে করে ৮০টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইসরায়েল।
জাতিসংঘ হুঁশিয়ার করে বলেছে যে গাযায় জ্বালানি সংকট হতে পারে। যার কারণে হাসপাতাল এবং অন্য প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সংকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রক্রিয়া বিষয়ক জাতিসংঘের ডেপুটি স্পেশাল কো-অর্ডিনেটর লিন হ্যাস্টিং বিবিসিকে বলেন, তিনি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করেছেন যে, গাজায় জ্বালানি এবং অন্যান্য পণ্য সরবরাহ করতে যাতে জাতিসংঘকে অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু সেখানে কিছু নিরাপদ নয় বলেও তাদের বলা হয়েছে।
গাযার কর্তৃপক্ষ বলছে, রোববারের ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৬ জন নারী ও ১০ শিশুসহ অন্তত ৪২ জন নিহত হয়েছে।
এদিকে ইসরায়েল বলছে, গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে দেশটিতে এখনো পর্যন্ত রকেট হামলায় দুই শিশুসহ ১০ জন মারা গেছে।
আরো পড়ুন:
হামাস নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, গাযায় এ পর্যন্ত ১৮৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে ৫৫ জন শিশু এবং ৩৩ জন নারী। এছাড়া আহত হয়েছে আরো ১২৩০ জন।
ইসরায়েল বলছে, নিহতদের মধ্যে অনেকেই জঙ্গি ছিল।
রোববার কী ঘটেছিল?
রোববার মধ্যরাতের পর পরই গাযার একটি ব্যস্ত সড়কে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে অন্তত তিনটি ভবন ধসে পরে এবং অনেকে নিহত হয়।
এর পর প্রায় সারা রাত ধরে এবং বিকেলে ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলকে লক্ষ্য করে রকেট ছোড়ে হামাস।
সাইরেন বাজার সাথে সাথে লাখ লাখ ইসরায়েলি নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়ে আশ্রয় নেন।
ফিলিস্তিনিরাও সতর্কতা অবলম্বন করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু জনবহুল এবং দরিদ্র গাযা উপত্যকার অনেক বাসিন্দার আসলে যাওয়ার মতো তেমন কোন নিরাপদ আশ্রয় ছিল না।
রিয়াদ এশকুনতানা নামে একজন ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, তিনি তার মেয়েদেরকে বাড়ির এমন একটি ঘরে ঘুম পারিয়েছিলেন যেটি বিস্ফোরণের স্থান থেকে সবচেয়ে দূরে বলে তিনি মনে করেছিলেন। তবে ওই রাতের পর তার মেয়েদের মধ্যে শুধু একজন বেঁচেছিলেন। যার নাম ছিল সুজি। তার বয়স মাত্র ৬ বছর। তার স্ত্রী এবং আরো তিন সন্তান মারা যায়।
মি. এশকুনতানা বলেন, "মেয়েরা বেঁচে আছে কিনা তা দেখতে ছুটে যাই আমি।"
"আমার স্ত্রী লাফিয়ে পড়ে মেয়েদের জড়িয়ে ধরে ঘরের বাইরে নিয়ে আসার চেষ্টা করছিল। আর তখনই ঘরটিতে দ্বিতীয় ক্ষেপণাস্ত্রটি আঘাত হানে... ছাদ ধসে পরে আর আমি ধ্বংস্তুপের নিচে পরি।"
পরে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করে যে, তারা ওই এলাকায় জঙ্গিদের একটি সুড়ঙ্গকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। সুড়ঙ্গটি ধসে পরার কারণে এর উপরে থাকা বাড়িঘরও ধসে পরে। যার কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত বেসামরিক প্রাণহানি ঘটে বলে জানায় তারা।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর দাবি তারা হামাসের নেতা এবং তাদের অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।
তাদের দাবি, তারা হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার এবং তার ভাই মুহাম্মাদ সিনওয়ারের বাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এই টার্গেটের জায়গাগুলো হামাসের রসদ এবং জনশক্তির মূল উৎস বলে দাবি করে তারা।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস বা এপি'র এর তথ্য অনুযায়ী, হামলার সময় তারা বাড়িতে অবস্থান করছিলেন না।
গাযার উদ্ধার কর্মীরা হামলার পর ধ্বংস্তুপের নিচ থেকে মানুষকে উদ্ধার করতে দিনভর চেষ্টা চালিয়েছে।
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, নিহতদের মধ্যে ডা. আয়মান আবু আল-আউফ নামে একজন চিকিৎসকও রয়েছেন। তিনি শিয়া হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ মেডিসিন বিভাগের প্রধান এবং করোনাভাইরাস টিমের সদস্য ছিলেন।
ইসরায়েলে হামাসের ছোড়া রকেট মধ্য এবং দক্ষিণ ইসরায়েলের আশকেলন, আশদদ, নেটিভটসহ অন্যান্য এলাকায় আঘাত হানে। তবে হতাহতের কোন খবর পাওয়া যায়নি।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে যে, গত সপ্তাহে তাদের এলাকাকে লক্ষ্য করে সবচেয়ে বেশি রকেট হামলার ঘটনা দেখেছেন তারা।
দেশটির আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এসব রকেটের অনেক গুলোকেই প্রতিহত করেছে। তবে এদের মধ্যে কয়েকটি গাড়ি এবং ভবনে আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে সন্ধ্যায় ইহুদিদের ছুটির দিন (শাভুয়াটের দিন) সন্ধ্যায় ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আগমুহুর্তে আশকেলনে ইয়াদ মাইকেল সিনাগগের দেয়াল রকেটের কারণে ফুটো হয়ে যায়।
টাইমস অব ইসরায়েলের তথ্য মতে, এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। স্থানীয়রা খুব দ্রুত ওই স্থান থেকে সরে যায় যাতে ক্ষয়ক্ষতি সরিয়ে দ্রুত অনুষ্ঠান শুরু করা যায়।
জাতিসংঘের বৈঠকে কী ঘটেছিল?
সম্প্রতি জাতিসংঘের ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা কাউন্সিল বৈঠকে বসলেও আনুষ্ঠানিক কোন বিবৃতিতে সম্মত হতে পারেনি এবং বৈঠকের পর কেউ এ নিয়ে মুখ খোলেনি।
ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আসেনি কারণ তারা মনে করছে যে এটি দুই দেশের কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
রোববারের বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত লিন্ডা থমাস-গ্রিনফিল্ড বলেন, "সব পক্ষ যদি অস্ত্র-বিরতি চায়" তাহলে তাতে সমর্থনে প্রস্তুত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া সংঘাত নিরসনে তারা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিয়াদ আল-মালিকি একটি শরণার্থী শিবিরে শনিবারের হামলায় একই পরিবারের ১০ সদস্য নিহত হওয়া এবং ৫ মাস বয়সী একটি মাত্র শিশুর বেঁচে যাওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, "ইসরায়েল সবসময় আমাদেরকে বলে যে আমরা যাতে তাদের জুতোয় পা রেখে দেখি, কিন্তু তারা তো কোন জুতো পরেনি, তারা মিলিটারি বুট পরে রেখেছে।"
এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলের স্থায়ী প্রতিনিধি গিলাদ এরদান, হামাসের হাতে নিহত ১০ বছর বয়সী এক আরব-ইসরায়েলি মেয়ে শিশুর ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি জোর দিয়ে দাবি করেন যে, ইসরায়েল "সন্ত্রাসীদের অবকাঠামো ভেঙ্গে এবং বেসামরিক প্রাণহানি না করে" তারা আসলে "বীরোচিত" কাজ করছে।
মি. এরদান নিরাপত্তা কাউন্সিলকে কঠোর ভাষায় হামাসের নিন্দা করার আহ্বান জানান। তবে ইসরায়েল হুঁশিয়ার করে বলেছে, নিজেদের সুরক্ষায় তারা সব ধরণের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।