ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি সংকট: গাযায় হামাসের এক শীর্ষ নেতার বাড়িতে বোমা হামলা

ছবির উৎস, Reuters
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা গাযায় যে সর্বশেষ দফা বোমা হামলা চালিয়েছে তাতে ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাসের এক শীর্ষ নেতার বাড়ি লক্ষ্য করেও বোমা ফেলা হয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এই বোমা হামলার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। গাযায় হামাসের নেতা শীর্ষ এক নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ারের বাড়িতে বোমাটি বিস্ফোরিত হয় বলে তারা দাবি করছে।
রবিবার গাযায় ইসরায়েলি বোমা হামলায় নিহত হয়েছে আরও অন্তত ২৬ জন। রবিবার বিকালে গাযা হতে হামাস আবারও পাল্টা রকেট হামলা চালিয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনি রকেট হামলার কঠোর জবাব দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। গাযায় ফিলিস্তিনিদের সাথে ইসরায়েলের বিরোধ সপ্তম দিনে পৌঁছানোর পর এমন মন্তব্য করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সংঘাত অবসানের আহ্বান জানিয়েছে।
শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, মি. নেতানিয়াহু এবং ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে ফোন করে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
রোববার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের মতে, সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই লড়াইয়ে পর থেকে গাযায় কমপক্ষে ১৪৮ জন নিহত হয়েছেন এবং ইসরায়েলে দুই শিশুসহ ১০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ইসরায়েল বলেছে যে গাযায় নিহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যও রয়েছেন, আর ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলেছেন যে যারা মারা গেছেন তাদের মধ্যে ৪১ জনই শিশু।
শনিবার গভীর রাতে এক টেলিভিশন ভাষণে মি. নেতানিয়াহু বলেছেন যে, "যতদিন প্রয়োজন" ততদিন হামলা অব্যাহত থাকবে এবং বেসামরিক হতাহত কমানোর জন্য যা সম্ভব সব কিছু করা হচ্ছে।

ছবির উৎস, Getty Images
মি. নেতানিয়াহু বলেছেন, "এই সংঘাতের পেছনে কেউ যদি জড়িত থাকে, সেটা আমরা নই, যারা আমাদের ওপর আক্রমণ করছে, এই দায় তাদের।"
পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের মধ্যে গত এক সপ্তাহ ধরে উত্তেজনা ঘনীভূত হচ্ছে। যেটা মুসলমান এবং ইহুদি উভয়ের পবিত্র স্থানে সংঘাতে রূপ নেয়।
হামাস - ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী যারা গাযার নিয়ন্ত্রণে আছে - তারা ইসরায়েলকে ওই পবিত্র স্থান থেকে সরে যাওয়ার জন্য সতর্ক করার পরে রকেট নিক্ষেপ শুরু করে। যা পাল্টাপাল্টি সহিংসতাকে উস্কে দেয়।
শনিবারে সংঘাত কীভাবে শুরু হল?
গাযা শহরের পশ্চিমে একটি শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় এক পরিবারের দশ জন সদস্য নিহত হন।
ওই পরিবারে শুধুমাত্র পাঁচ মাসের শিশু ওমর আল-হাদিদি বেঁচে যান।
ওই হামলায় শিশুটির মা, চার ভাইবোন, এবং পরিবারের আরও পাঁচ সদস্য মারা যান।
শিশুটির বাবা মোহাম্মদ আল-হাদিদি তখন বাড়িতে ছিলেন না।
তিনি আক্ষেপের স্বরে সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে বলেন "সেখানে কোনও রকেট ছিল না, কেবল নারী ও শিশুরা ছিল, শিশুরা শান্তিপূর্ণভাবে ঈদ উদযাপন করছিল, তারা এমন কি করেছিল যে এভাবে মরতে হল?"

ছবির উৎস, Getty Images
ওমরকে যে চিকিৎসক দেখভাল করছেন তিনি জানিয়েছেন যে, "শিশুটির অবস্থা শুরুতে বেশ খারাপ ছিল। তার উরুর হাড় ভেঙে গিয়েছিল এবং সারা শরীরে ছিল আঘাতের চিহ্ন তবে এখন তার অবস্থা স্থিতিশীল আছে।"
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বলেছে যে, ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী গাজা থেকে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর আশডড, বীরশেবা এবং দেরোতে ২৭৮টি রকেট ছুঁড়েছে।
আইডিএফ আরও বলেছে যে, ইসরায়েলে প্রবেশ করা বেশ কয়েকটি রকেট আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বাধা পেয়েছিল।
একটি রকেট তেল আবিবের রামাত গণ শহরতলির একটি সড়কে আছড়ে পড়লে একজন নিহত হন। তিনি তার অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে ছিলেন, তখন রকেটের একটি অংশ তাকে আঘাত করে বলে জানা গেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
গাযায় টাওয়ার ব্লকে কী হয়েছিল?
এর আগে শনিবার ইসরায়েলি বিমান হামলায় একটি বহুতল ভবন টাওয়ার ব্লক ধসে পড়ে। ওই ভবনে দ্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং আল-জাজিরাসহ বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম ও অন্যান্য অফিস এবং আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট ছিল।
এর পরই এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এই ভবনটিতে হামাসের সামরিক সম্পদ ছিল। যদিও ভবনটির মালিক তা অস্বীকার করেছেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ভবনটিতে হামলার ঘটনায় তিনি "গভীরভাবে উদ্বিগ্ন"।
এ নিয়ে মহাসচিবের মুখপাত্র বলেছেন, "মহাসচিব সব পক্ষকে মনে করিয়ে দিতে চান যে বেসামরিক ও গণমাধ্যম অবকাঠামোর ওপর নির্বিচারে হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে এবং যেকোনো মূল্যে তা এড়িয়ে যেতে হবে।"
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে যে ইসরায়েলি বাহিনী লোকজনকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই ওই ভবনটিতে আঘাত হানা হয়।
সংবাদ সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী গ্যারি প্রুইট বলেছেন: "আপনাদের একটি উদ্বেগজনক ঘটনা জানাতে হচ্ছে যে, আমরা অল্পের জন্য প্রাণহানির মতো ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পেরেছি। বহু এপি সাংবাদিক এবং শিক্ষানবিশ সাংবাদিক ভবনের ভিতরে ছিলেন এবং ভাগ্যক্রমে আমরা তাদের সবাইকে যথাসময়ে সরিয়ে নিতে পেরেছি।

ছবির উৎস, Getty Images
বাইডেন টেলিফোন করে কী বলেছেন?
প্রেসিডেন্ট বাইডেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে বলেছেন যে তিনি ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন দিয়ে যাবেন। হোয়াইট হাউস এই তথ্য জানিয়েছে।
তিনি দুটি অংশেই মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং টাওয়ার-ব্লকে হামলার পরে তিনি সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
মি. বাইডেন দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট আব্বাসের সাথে কথা বলেন।
তিনি তাকে বলেছেন যে, তিনি "মার্কিন-ফিলিস্তিন অংশীদারিত্ব জোরদার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ"। তিনি আরও বলেছেন যে, ইসরায়েলে হামাসের রকেট নিক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।

ছবির উৎস, Getty Images
প্রেসিডেন্ট আব্বাসের দফতর অধিকৃত পশ্চিম তীরে, একারণে হামাস নিয়ন্ত্রিত গাযায় তার নিয়ন্ত্রণ বেশ সীমিত।
তবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হামাসের সাথে কোন কথা বলবে না। কারণ তারা হামাসকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করে।
মি. বাইডেন দুই নেতাকে বলেছেন যে তিনি এই দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব সমাধানের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ইসরায়েল, ফিলিস্তিনি এবং জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনায় অংশ নিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হ্যাডি আমির তেলআবিব রয়েছেন।








