ভিক্ষার জন্য অপহরণ: যেভাবে উদ্ধার হল দুই বছরের শিশু

ফিরে পাওয়া রাশিদাকে কোলে মা সুমা আক্তার

ছবির উৎস, DMP

ছবির ক্যাপশান, ফিরে পাওয়া রাশিদাকে কোলে মা সুমা আক্তার
    • Author, শাহনাজ পারভীন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

প্রায় নিয়মিতই ঢাকার বংশাল রোডে ফেলে দেয়া কাগজ, বোতল ইত্যাদি কুড়াতে যান সুমা আক্তার।

বেশিরভাগ সময়ই দুই বছরের মেয়ে রাশিদা আক্তারকেও সাথে করে নিয়ে যেতে হয়।

এপ্রিলের ২৫ তারিখ বিকেলের দিকে মেয়েকে একটি মিষ্টির দোকানের বাইরে ফুটপাতের উপর বসিয়ে রেখে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নানা ধরনের আবর্জনা বস্তায় ভরছিলেন তিনি।

কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে দেখেন ছোট্ট মেয়েটি সেখানে নেই।

নিখোঁজ নয় অপহরণ

সুমা আক্তার শুরুতে আশপাশে তাকাতে থাকেন। খেলতে খেলতে হয়ত একটু দূরে সরে গেছে, কিন্তু মেয়েকে কোথাও দেখতে না পেয়ে ভয় পেয়ে যান।

তার সাথে যখন কথা হচ্ছিল তখন কাঁদছিলেন তিনি। বলছিলেন, "আমি নিজে দুইদিন ধইরা খুঁজছি। আমি অনেক জায়গায় কাগজ টুকাই। সব জায়গায় গেছি। এরে ওরে জিগাইছি। কিন্তু মাইয়ার কোন খবর পাইনাই। কেউ কিছু বলতে পারে না।"

সুমা আক্তার দুই দিন পর বংশাল থানায় গিয়ে পুলিশের কাছে বিষয়টি অবহিত করেন। সেখানে মেয়ের হারিয়ে যাওয়া বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।

তদন্ত করতে গিয়ে বংশাল রোডের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে পরিষ্কার হয় যে শিশুটি নিখোঁজ হয়নি।

বংশাল থানার পুলিশ বলছে, নিজের সন্তানদের সহযোগিতায় রাশিদাকে তুলে নিয়ে গেছেন একজন নারী। তাকে ভিক্ষায় ব্যবহারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং শিশুটিকে মেরে আহত করা হয়েছে।

শিশু

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা ফুটেজে দেখা গেছে শিশুটিকে নিয়ে যাচ্ছে আরেকটি শিশু। (ফাইল ফটো)

সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেছে

বংশাল থানায় ঘটনাটির তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী সিকদার বলছিলেন, "যেখানে মেয়েটি বসেছিল সেখানকার এবং তার আশপাশের বেশ কিছু সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করেছি আমরা। সেই ফুটেজ দেখে আমরা বুঝলাম বাচ্চাটা নিখোঁজ হয়নি। একজন নারী এই বাচ্চাটাকে চুরি করেছে।"

ফুটেজে কি দেখা গেছে তার বর্ণনা দিয়ে মি. সিকদার বলছিলেন, শুরুতে দেখা গেল তিনটি ছোট বাচ্চা এসে রাশিদার কাছে বসলো।

তারা কিছুক্ষণ কথা বলল, কিছুক্ষণ খেলাও করলো। এরপর সাদা প্যাকেটে করে রাশিদাকে কিছু একটা খেতে দেয়া হল।

অন্যান্য খবর:

"ওই তিনটা বাচ্চার মধ্যে যার বয়স সবচেয়ে বেশি, দশ বছরের মতো, তার মাথা ও মুখ কাপড় দিয়ে হিজাবের মত ঢাকা ছিল। সে এক পর্যায়ে রাশিদাকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলো। তারপর কোলে তুলে নিলো।"

মি. সিকদার বলছিলেন, ফুটেজে দেখা গেছে দশ বছরের মেয়েটি কিছুদূর গিয়ে রাস্তা পার হয়েছে। তখনো পর্যন্ত প্রাপ্তবয়স্ক কেউ সাথে ছিল না। তাদের মা আলাদা করে আগে রাস্তা পার হয়েছেন। এই শিশুদের সাথে যে তার কোন সম্পর্ক আছে তা শুরুতে বোঝা যায়নি। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর তারা একসঙ্গে হাঁটতে শুরু করে।

বস্তি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিভিন্ন বস্তিতে খোঁজ নেয় পুলিশ।

যেভাবে উদ্ধার হল রাশিদা

শুধু ফুটেজ দেখে অবশ্য বোঝা যায়নি শিশুটিকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

মোহাম্মদ আলী সিকদার বলছিলেন, যে তিনটি বাচ্চাকে ফুটেজে দেখা গেছে তাদের পরনের পোশাক দেখে বোঝা যাচ্ছিল তারা নিজেরাও দরিদ্র।

"গায়ের কাপড়ের কারণে আমরা আশপাশে যত বস্তি আছে সেসব যায়গায় খোঁজ নেই। এরা এত গরিব যে বাচ্চার কোন ছবি পর্যন্ত নেই। কিভাবে লোকজনকে বোঝাবো যে বাচ্চাটা দেখতে কেমন। কোন হারিয়ে যাওয়া বাচ্চা সম্পর্কে কেউ কিছু জানলে আমাদের তথ্য দিতে বলি।"

মেয়েকে ফিরে পাওয়া

মি. সিকদার জানান, "ঢাকার কাছে কেরানীগঞ্জের শহীদনগর বস্তির ম্যানেজারের চোখে পড়েছে যে তার একজন ভাড়াটিয়ার তিনটি বাচ্চা, কিন্তু আরও একটি শিশুকে কয়েকদিন ধরে তাদের ঘরে দেখা যাচ্ছে এবং শিশুটিকে মারধোর করা হচ্ছে। বাচ্চাটি কান্নাকাটি করে।"

এই তথ্যের ভিত্তিতে ছয়দিন পরে রাশিদাকে উদ্ধার করে পুলিশ। তার দুটো চোখেই কালশিটে,শরীরের নানা স্থানে আঘাতের নীল চিহ্ন। পিঠ ও নিতম্বে আঘাতের চিহ্ন বেশি স্পষ্ট।

পুলিশের কাছে দেয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী রাশিদাকে ভিক্ষায় ব্যাহারের জন্য তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। চেহারা বিকৃত করে অসুস্থ দেখানোর জন্য মারধোর করা হয়েছে।

অপহরণকারী নারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার দশ বছর বয়সী মেয়েকে আটক করা হয়েছে।

রাশিদাকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। আজ আদালতের আদেশে তাকে মায়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

মেয়েকে কোলে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সুমা আক্তার বলছিলেন, "মাইয়াডারে মাইরা কিছু রাখে নাই। কিন্তু ওরে কোলে পাইয়া জানডায় যেন আমার পানি আসছে।"