লকডাউন: শপিংমল ও গণপরিবহন চালু হলে কী সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়বে?

গাউসিয়া-নিউমার্কেট ফুটওভার ব্রিজের ওপর
ছবির ক্যাপশান, রোববার দুপুরে গাউসিয়া-নিউমার্কেট ফুটওভার ব্রিজের ওপর
    • Author, সাইয়েদা আক্তার
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা গেছে, গত সপ্তাহে যেখানে নমুনা পরীক্ষার বিচারে কোভিড-১৯ রোগী শনাক্তের হার ছিল ২৩ শতাংশ, কয়েকদিনের ব্যবধানে সেটি এখন ১৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

সেই সঙ্গে করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও গত কয়েকদিন কিছুটা কম ছিল। যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১০১ জন মানুষ কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক সানিয়া তাহমিনা বলছেন, সংক্রমণের হার যতটুকুই কমেছে সেটি দেশে চলমান লকডাউনের কারণেই হয়েছে।

তিনি বলেন, "লকডাউনে মানুষ যেভাবেই স্বাস্থ্যবিধি মানুক, যত কমই মানুক না কেন, এর মাধ্যমে ন্যুনতম যে সুফল পাওয়া যায় তার প্রতিফলন আমরা দেখছি সংক্রমণ আর মৃত্যুর হারের পরিসংখ্যানে।

এটা প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক ব্যাপার যে জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।"

সংক্রমণ শনাক্তের হার কিছুটা কমে আসাকে অধ্যাপক তাহমিনার মত স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারাও অগ্রগতি বলে মনে করেন।

আরো পড়তে পারেন:

কিন্তু ১৪ই এপ্রিল থেকে সর্বাত্মক লকডাউন শুরুর সময় থেকে ১০দিন বন্ধ থাকার পর রোববার থেকে সারাদেশে খুলে দেয়া হয়েছে দোকানপাট এবং শপিংমল।

২৮শে এপ্রিলের পর গণপরিবহনও খুলে দেয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার।

শপিংমল খোলার ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেয়া হয়েছে, ব্যাপক মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়টি বিবেচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এর ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি নতুন করে বাড়বে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

অধ্যাপক তাহমিনা বলেন, "শপিংমল বা গণপরিবহন কয়েকদিন বন্ধ ছিল বলেই সংক্রমণটা কমতে দেখছিলাম আমরা। এখন এগুলো খুলে দেয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যাবে, রোগ বাড়বে। রোগ বাড়লে মৃত্যুও বাড়বে।"

গত কয়েক মাসে দেশে করোনাভাইরাসের নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্টের আবির্ভাব মানুষের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। ইতিমধ্যে ভারতে শনাক্ত হওয়া করোনাভাইরাসের নতুন ধরনটি নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা।

পাঞ্জাবির দোকানেও ছিল ভিড়
ছবির ক্যাপশান, পাঞ্জাবির দোকানেও ছিল ভিড়

অধ্যাপক তাহমিনা বলছেন, "আমরা জানি না ভারতের নতুন ধরণটি বাংলাদেশে ইতিমধ্যে চলে এসেছে কিনা। কারণ যে পরিমাণ জিনোম সিকোয়েন্সিং ধারাবাহিকভাবে করে সেটা শনাক্ত করতে হয়, সে সক্ষমতা বাংলাদেশে এখন নাই।

যেসব ল্যাবে এই পরীক্ষাগুলো হয়, তার অধিকাংশই এখন করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষায় ব্যস্ত।"

সেক্ষেত্রে ভারতের সাথে সীমান্ত বন্ধ করা একটি ভালো সমাধান হতে পারে, কিন্তু সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করা কষ্টসাধ্য একটি ব্যাপার।

ফলে অধ্যাপক তাহমিনা পরামর্শ হচ্ছে একমাত্র স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমেই ঝুঁকি নিরসন সম্ভব।

দোকানপাট খুললেও খুশি নন বিক্রেতারা

দোকান খোলা সংক্রান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেনাকাটা করতে যেতে হবে।

সকাল ১০টা থেকে বিকাল পাঁচটার মধ্যে শেষ করতে হবে কেনাকাটা।

দোকানপাট ও শপিংমল খোলার প্রথম দিনে, বিবিসি ঢাকার কয়েকটি বড় মার্কেট ঘুরে দেখেছে।

ঢাকার গাউসিয়া মার্কেটে দেখা গেছে, ভেতরের দোকান এবং ফুটপাত---সবখানেই পণ্যের পসার সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা।

ক্রেতাদেরও সতর্ক ভিড় দেখা গেছে।

স্বাস্থ্যবিধি পালনে সংশ্লিষ্ট মার্কেট পরিচালনা কমিটির তৎপরতা ছিল।

যদিও বেচাকেনা নিয়ে একেবারেই সন্তুষ্ট ছিলেন না বিক্রেতারা। তাদেরা দাবি দোকানপাট খোলা রাখার সময়-সীমা বাড়িয়ে দেয়া হোক।

যদিও বিকেলে সরকারি সিদ্ধান্ত দোকান খোলা রাখার সময়সীমা বিকেল ৫টা থেকে বাড়িয়ে রাত ৯টা পর্যন্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

চালু হচ্ছে গণপরিবহনও

শপিংমলের পর এ সপ্তাহেই গণপরিবহন চালু হতে পারে এমন আভাস দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

নিয়মিত ব্রিফিং ওবায়দুল কাদের এ কথা বলেছেন।

তবে তিনি বলেছেন স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ না করে যদি করোনাভাইরাস পরিস্থিতির অবনতি ঘটে, তাহলে সরকারকে বাধ্য হয়ে আবারো লকডাউনে যেতে হবে।

তিনি বলেন, "আগেরবার গণপরিবহণ চালুর সময় দেখা গেছে সবাই স্বাস্থ্যবিধি মানেন নাই। কিন্তু এবার যখন সীমিত আকারে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরিবহন চালানোর সুযোগ দেয়া হবে সেই সুযোগের অপব্যবহার যেন গণপরিবহন না করে।"

তিনি বলে কোন গণপরিবহন যেন অর্ধেকের বেশি আসনে যাত্রী নেয়া, দাঁড়িয়ে যাত্রী নেয়া, বেশি ভাড়া নেয়া---এসব না করেন। এছাড়া স্বাস্থ্যবিধি মেনে, মাস্ক পড়ে পরিবহন চালান সে দিকে কড়া নজর রাখা হবে।

সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, "স্বাস্থ্য পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে সরকারকে বাধ্য হয়ে আবারো লকডাউনে যেতে হবে।"

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ এবং মৃত্যুর হারে ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে এ মাসের পাঁচ তারিখে সরকার প্রথম দফা লকডাউন আরোপ করে।

এক সপ্তাহের ঘোষিত সে লকডাউন নয়দিন পর্যন্ত চলে। তাতে দোকানপাট ও গণপরিবহন চালু থাকার কারণে সংক্রমণ পরিস্থিতিতে তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি।

এরপর সরকার ১৪ই এপ্রিল থেকে সর্বাত্মক লকডাউনে যায়, যাতে বন্ধ ছিল গণপরিবহন এবং দোকানপাট।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বেশষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় বাংলাদেশে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

দেশে কোভিড-১৯ শনাক্ত মোট রোগীর সংখ্যা ৭ লাখ ৪৫ হাজার ৩২২ জন।