শামীমা বেগম কি আর কখনো ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ফিরে পাবেন?

২০২০ সালে তোলা শামীমা বেগমের ছবি

ছবির উৎস, BBC NEWS

ছবির ক্যাপশান, ২০২০ সালে তোলা শামীমা বেগমের ছবি। তিনি এখন উত্তর সিরিয়ার এক ক্যাম্পে বাস করছেন।

লন্ডন থেকে পালিয়ে ইসলামিক স্টেটের সাথে যোগ দিতে সিরিয়ায় যাওয়া তরুণী শামীমা বেগমের আপাতত ব্রিটেনে ফেরা হচ্ছে না - যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে।

বর্তমানে ২১ বছর বয়স্ক শামীমা বেগম তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিলের মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য যুক্তরাজ্যে ফিরতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু তাকে সশরীরে ব্রিটেনে এসে আপিল করার সুযোগ দেয়া হবে না বলে রায় দিয়েছে যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট।

বিবিসির সংবাদদাতা ডমিনিক কাসচিয়ানি বলছেন, শামীমা বেগম চেয়েছিলেন তার কৃতকর্মের জন্য তাকে যেন ক্ষমা করা হয়। কিন্তু তিনি যা পেলেন তা হলো : তার দু'বছরব্যাপি আইন লড়াই এখন কার্যত চলে গেল হিমাগারে, এবং এর ফাঁদে আটকা পড়ে গেলেন তিনি।

তার সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: তিনি আর কখনো ব্রিটেনে ফিরে আসতে পারবেন কিনা, এবং তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ফেরত পাবেন কিনা।

নাগরিকত্বের মামলার এক বিচিত্র পরিণতি

বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক শামীমা বেগম ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রিন এলাকা থেকে আরো দুজন স্কুলছাত্রীসহ যুক্তরাজ্য ত্যাগ করে তুরস্ক হয়ে সিরিয়া চলে যান, এবং ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীর সাথে যোগ দেন।

তখন শামীমা বেগমের বয়স ছিল ১৫। সেখানে তিনি একজন ডাচ জিহাদিকে বিয়ে করেন। তাদের তিনটি সন্তান হয় তবে তারা সবাই শিশু বয়সেই মারা যায়।

গ্যাটউইক বিমানবন্দরের সিসিটিভিতে : তিন স্কুল ছাত্রী খাদিজা সুলতানা (বাঁয়ে), শামিমা ও আমিরা আবাসি (ডানে)।

ছবির উৎস, MET POLICE

ছবির ক্যাপশান, গ্যাটউইক বিমানবন্দরের সিসিটিভিতে : তিন স্কুল ছাত্রী খাদিজা সুলতানা (বাঁয়ে), শামিমা ও আমিরা আবাসি (ডানে)।

ইসলামিক স্টেটের খিলাফত ভেঙে পড়ার সময় তার স্বামী ইয়াগো রিয়েডিক একটি কুর্দি বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন বলে জানা যায়।

শামীমা বেগম এখন উত্তর সিরিয়ায় সশস্ত্র রক্ষীর প্রহরাধীন একটি শিবিরে বাস করছেন।

কীভাবে ব্রিটিশ নাগরিক হওয়া যায়?

ব্রিটেনের নাগরিকত্ব পাবার কয়েকটি উপায় আছে।

১. আপনি একজন ব্রিটিশ নাগরিক হতে পারেন যদি আপনি নিজে বা আপনার পিতামাতা যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণ করে থাকেন।

২. যদি আপনি একটা নির্দিষ্ট সময় যুক্তরাজ্যে বাস করে থাকেন। সাধারণ এর মেয়াদ পাঁচ বছর।

৩. যদি আপনি একজন ব্রিটিশ নাগরিককে বিয়ে করেন এবং যুক্তরাজ্যে দিন বছর অবস্থান করেন।

২০২০ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত এক বছরে ১৬৩,৬২৪ ব্যক্তিকে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের আইনে আপনি একই সাথে একাধিক দেশের নাগরিক থাকতে পারেন।

কীভাবে আপনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব হারাতে পারেন?

শামীমা বেগমের নাগরিকত্ব বাতিল করেছিলেন ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ ২০১৯ সালে, - নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ।

যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কয়েকটি কারণে একজনের নাগরিকত্ব বাতিল করতে পারেন।

১. জনগণের মঙ্গলের স্বার্থে ( ফর দি পাবলিক গুড) নাগরিকত্ব বাতিল করা যাবে যদি না সেই ব্যক্তি রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েন।

২. যদি কোন ব্যক্তি জালিয়াতির মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব পেয়ে থাকেন।

৩. যদি কারো কর্মকাণ্ড যুক্তরাজ্যের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে এবং তারা অন্য কোন দেশে নাগরিকত্ব পেতে পারেন।

ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শামীমা বেগমের নাগরিকত্ব বাতিল করেছিলেন ১ নম্বর কারণটি দেখিয়ে।

যুক্তরাজ্যে ফিরে আসার জন্য শামীমার আইনী লড়াই

২০১৯ সালের প্রথম দিকে লন্ডনের দৈনিক দি টাইমসের একজন সাংবাদিক সিরিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে শামীমা বেগমের খোঁজ পান।

ঐ সাংবাদিকের মাধ্যমে শামীমা বেগম ব্রিটিশ সরকারের কাছে আবেদন করেছিলেন যে তাকে যেন ব্রিটেনে ফেরত আসতে দেওয়া হয়।

শামীমা বেগম

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শামীমা বেগম

সে অনুমতি না দিয়ে সরকার তার নাগরিকত্ব বাতিল করে।

সেসময় শামীমা বেগমের মা বাংলাদেশী - এ কারণে তিনি বাংলাদেশে আশ্রয় চাইতে পারেন এমন কথা বলা হয়েছিল।

শামীমা বেগম কি রাষ্ট্রবিহীন নাকি বাংলাদেশের নাগরিকত্বে দাবিদার?

যুক্তরাজ্যের অবশ্য আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী একটা বাধ্যবাধকতা রয়েছে যে তাকে দেখতে হবে নাগরিকত্ব বাতিলের ফলে কেউ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়বেন কিনা।

শামীমা বেগমের ক্ষেত্রে কোন কোন আইনবিদ যুক্তি দিয়েছেন যে তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব হরণ করা হলে তিনি রাষ্ট্রবিহীন হয়ে পড়বেন কারণ তার অন্য আর কোন দেশের নাগরিকত্ব নেই। তাই তার নাগরিকত্ব বাতিলের আদেশ হয়তো আদালতে টিকবে না।

কিন্তু ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি ট্রাইবুনাল রুল জারি করে যে, শামীমা বেগমের নাগরিকত্ব বাতিল আইনসম্মত - কারণ তার মায়ের জন্মসূত্রে তিনি বাংলাদেশের নাগরিক। যুক্তরাজ্যের কয়েকজন আইনজীবীও বিবিসিকে একথা বলেছেন।

অবশ্য বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ তা স্বীকার করে না, এবং তাকে সেদেশে ঢুকতে দেয়া হবে না।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৯ সালে এক বিবৃতিতে বলেছিল যে শামীমা বেগমকে একজন বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে যা সঠিক নয় এবং এ জন্য তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

বিবৃতিতে বলা হয়, শামীমা বেগম কখনো বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব চাননি এবং কখনো বাংলাদেশে আসেনও নি।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

শামীমা বেগম নিজেও বিবিসির কুয়েন্টিন সমারভিলকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে তার মাত্র একটি দেশেরই নাগরিকত্ব আছে এবং তা যুক্তরাজ্যের।

"আমার জন্ম বাংলাদেশে নয়, আমি সেদেশ কখনো দেখিনি, এবং আমি ঠিকমত বাংলা বলতেও পারিনা। তাই তারা কিভাবে দাবি করতে পারে যে আমি বাংলাদেশের নাগরিক?" - বলেছিলেন তিনি।

তাহলে শামীমা বেগম কি রাষ্ট্রবিহীন হয়ে যাবেন?

তাহলে শামীমা বেগমের সামনে কী ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে?

লন্ডনের আইনজীবী সৈয়দ আহমেদ ইকবাল - যিনি নিজেও সাবেক এক ইসলামিক স্টেট যোদ্ধার হয়ে ব্রিটেনে আইনী লড়াই চালাচ্ছেন - বিবিসিকে বলেন, এই মামলাটি শামীমা বেগমের নাগরিকত্বের মূল মামলা নয়, তাই এর গুরুত্ব তেমন একটা নেই।

বিবিসি বাংলার মাসুদ হাসান খানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সৈয়দ আহমেদ ইকবাল বলেন, যেহেতু শামীমা বেগমের বাংলাদেশী নাগরিকত্ব বা অন্য আর কোন নাগরিকত্ব নেই তাই ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিল করা হলে তিনি রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়বেন - যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ব্রিটেন করতে পারে না।

মূল মামলাতে এ প্রশ্নটির ওপরেই আইনী লড়াই হবে - বলেন তিনি।

২০১৫ সালে সিরিয়া চলে যাবার সময় শামীমা বেগমের বয়স ছিল ১৫

ছবির উৎস, PA Media

ছবির ক্যাপশান, ২০১৫ সালে সিরিয়া চলে যাবার সময় শামীমা বেগমের বয়স ছিল ১৫

কিন্তু সে মামলা কবে আদালতে উঠবে বা নিষ্পত্তি হবে - তা এখন পুরোপুরি অনিশ্চিত।

অন্তত: ততদিন পর্যন্ত শামীমা বেগমের ব্রিটেনে ফেরা হবে না - সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এটা পরিষ্কার।

তাহলে শামীমা বেগমের ভাগ্যে কী আছে?

বিবিসির আইন ও স্বরাষ্ট্র বিষয়ক সংবাদদাতা ডমিনিক কাসচিয়ানি বলছেন, আদালত রায় দিয়েছে যে শামীমা বেগম সশরীরে ব্রিটেনে এসে তার নাগরিকত্ব বাতিলের মামলা লড়তে পারবেন না।

দেখা গেছে যুক্তরাজ্যে ঢোকার অধিকার হারিয়েছেন এমন অনেকেই বাইরে থেকে আপিলে অংশ নিতে পেরেছেন। কিন্তু যেহেতু শামীমা বেগম অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায় একটি সশস্ত্র প্রহরাধীন শিবিরে আছেন - তাই তার আইনজীবীরাও তার সাথে দেখা করতে পারবেন না।

সে জন্য যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ আদালত বলছে, পুরো মামলাটি তাই এখন বন্ধ রাখতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত না শামীমা বেগম এতে অংশ নেবার একটা উপায় বের করতে পারেন।

ডমিনিক কাসচিয়ানি বলছেন, এমন হতে পারে যে তা হয়তো কখনোই সম্ভব হবে না।

বিবিসি বাংলায় আরো খবর: