মানবাধিকার: কার্টুনিস্ট কিশোর ও লেখক মুশতাকসহ আটক শিল্পীদের মুক্তির দাবি জানাচ্ছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল

হাতকড়ার ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

বাংলাদেশের কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর এবং লেখক মুশতাক আহমেদকে অবিলম্বে ও নিঃশর্ত মুক্তি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

এছাড়া আর্টিস্ট অনন্য মামুন, শাহীন মৃধা, রিতা দেওয়ান, কিশোর ও মুশতাকের বিরুদ্ধে সব ধরণের অভিযোগ প্রত্যাহার করতেও কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা এক বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক এই মানবাধিকার সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশে সম্প্রতি নির্বিচারে আটক কিংবা অন্যান্য উপায়ে হয়রানির মাধ্যমে শিল্পীদের মত প্রকাশের অধিকার ব্যহত হবার মতো ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

এতে বলা হয়, বাংলাদেশে বেআইনিভাবে আটক সব শিল্পীদের মুক্তি, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহার এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানুষের শৈল্পিক অভিব্যক্তির স্বাধীন প্রকাশ নিশ্চিত করা উচিত।

গত ডিসেম্বরে ঢাকাভিত্তিক চলচ্চিত্র পরিচালক অনন্য মামুন তার নতুন সিনেমা 'নবাব এলএলবি'-র ট্রেইলার প্রকাশ করেন। যেখানে অভিনেতা শাহীন মৃধা একজন তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে অভিনয় করেন, যিনি আইনি সহায়তা নিতে আসা ধর্ষণের শিকার এক নারীকে হেনস্তা করছেন বলে সিনেমায় দেখানো হয়।

আরো পড়ুন:

বিবৃতিতে বলা হয়, এই সিনেমার ট্রেইলার প্রকাশিত হওয়ার পর গত বছরের ২৫শে ডিসেম্বর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট দুই শিল্পীর বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি নিরোধ আইনে মামলা করেন। যেখানে অভিযোগে বলা হয় যে, এটি মানুষের মধ্যে পুলিশের কাজ নিয়ে ভুল বার্তা দেবে।

স্থানীয় চলচ্চিত্র নির্মাতারা এই সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়ে একে দেশে শৈল্পিক অভিব্যক্তির প্রকাশের স্বাধীনতায় হুমকি বলে উল্লেখ করেন।

২০২০ সালের ডিসেম্বরেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের করা এক মামলায় লোক সঙ্গীত শিল্পী রিতা দেওয়ান এবং তার দুই মেয়ের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। তাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ আনা হয়।

বাউল গানের একটি আসর

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাউল গানের একটি আসর

২০২০ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলে একটি পালাগানে অংশ নিয়েছিলেন রিতা দেওয়ান। এর পর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার একই অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মোট চারটি মামলা হয়। এর মধ্যে একটি খারিজ করে দেয় আদালত। বাকি তিনটির বিচার চলছে। ২০২১ সালের ১৩ই জানুয়ারি ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল একটি মামলায় রিতা দেওয়ানকে জামিন দেয়।

২০২০ সালের মে মাসে বাংলাদেশের পুলিশ জনপ্রিয় কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর এবং লেখক মুশতাক আহমেদকে ঢাকার বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। তাদের বিরুদ্ধে "ফেসবুকে করোনাভাইরাস নিয়ে গুজব ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো", "জাতির জনকের প্রতিকৃতি", "জাতীয় সংগীত" এবং "জাতীয় পতাকাকে" অবমাননার অভিযোগ আনা হয়।

কিশোর একজন আন্তর্জাতিক পুরষ্কার বিজয়ী কার্টুনিস্ট যিনি সরকারি কর্মকর্তা ও তাদের নীতির সমালোচনামূলক কার্টুন আঁকার কারণে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন বলে অ্যামনেস্টির বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে "লাইফ ইন দ্য টাইম অব করোনা" যা তার ফেসবুক পেজ "আই অ্যাম বাংলাদেশি"তে প্রকাশিত হয়। এতে ক্ষমতাসীন দলের নানা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সমালোচনা করা হয়।

মুশতাক আহমেদ কুমির চাষের ডায়েরি নামে বইয়ের লেখক, তিনি "মাইকেল কুমির ঠাকুর" নামে একটি ফেসবুক পাতাও পরিচালনা করেন, যাতে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে মন্তব্য উঠে আসে।

তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১ ধারায় আনা "মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে", "জাতির জনক" "জাতীয় সংগীত" বা "জাতীয় পতাকা"র বিরুদ্ধে "প্রোপাগান্ডায়" বা "প্রচারণায়" যুক্ত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নিয়ে সম্পাদকদের উদ্বেগ ছিল শুরু থেকেই।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নিয়ে সম্পাদকদের উদ্বেগ ছিল শুরু থেকেই।

২০২০ সালের মে মাসে আটক করার পর তাদেরকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বার বার তাদের জামিন আবেদন নাকচ করেছে আদালত।

অ্যামনেস্টির বিবৃতিতে বলা হচ্ছে, কোভিড-১৯ এর কারণে তাদের সাথে পরিবারের সদস্যদের দেখা করা বন্ধ করা হয়েছে এবং পরিবারের সাথে যোগাযোগ করার এর বিকল্প কোন ব্যবস্থাও এখনো করা সম্ভব হয়নি।

বিবৃতিতে আটক শিল্পীদের মুক্তি দেয়ার দাবি ছাড়াও ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল কিংবা অ্যামনেস্টির ভাষায় এর 'দমনমূলক ধারা'র সংশোধনের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।

এতে বলা হয়, বাংলাদেশের উচিৎ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের নির্দেশনা সমুন্নত রাখা এবং শৈল্পিক ও সৃজনশীল অভিব্যক্তি যাতে কোন ধরণের ভয় ছাড়াই প্রকাশিত হতে পারে তার ব্যবস্থা করা।