সীমান্ত হত্যা: মেঘালয় সীমান্তে বিজিবির গুলিতে মৃত্যুর প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ মেঘালয়ের গ্রাম

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর পর সেখানে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে নিহতদের পরিবারে শোকের মাতম গত কয়েক বছরে বেশ পরিচিত দৃশ্য হয়ে উঠেছে।
কিন্তু গত দিন দশ-বারো ধরে এর একেবারে উল্টো ছবি ঘটতে দেখা যাচ্ছে মেঘালয় সীমান্তে সাউথ গারো হিলস জেলায় - যেখানে বিজিবির গুলিতে সীমান্তে একজন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যুর পর স্থানীয় গ্রামবাসীরা ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন।
মেঘালয়ের পুলিশ ও প্রশাসন বিবিসিকে জানিয়েছে, নিহত ব্যক্তিকে মাদক চোরাকারবারি বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা হলেও তার আদৌ কোনও অপরাধের রেকর্ড ছিল না।
দুদেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে এখন এই হত্যাকান্ডের প্রতিকারের চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মেঘালয়ের রাসনগর গ্রামের বাসিন্দা, ৪৮ বছর বয়সী থেডিয়ান জি মোমিনের গুলিবিদ্ধ মরদেহ সীমান্তের কাছে বাংলাদেশের দিক ঘেঁষে পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল গত ২৯শে ডিসেম্বর সকালে।
স্থানীয় গ্রামবাসীদের বক্তব্য, তার আগের রাতেই বাংলাদেশের দুষ্কৃতীরা তাকে টেনে-হিঁচড়ে সীমান্তের অন্য পারে টেনে নিয়ে যায় এবং বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি-র সহায়তায় সূর্যপুর-ডুমিলকুড়া সীমান্তের কাছে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

ছবির উৎস, Barcroft Media/Getty Images
আরও পড়তে পারেন:
রাসনগর গ্রামটি যে সাউথ গারো হিলস জেলায় পড়ছে, সেখানকার পুলিশ প্রধান প্রিয়াংশু পান্ডে বিবিসি বাংলাকে এদিন জানান, "প্রত্যক্ষদর্শী গ্রামবাসীদের জবানবন্দী অনুযায়ী ওই ব্যক্তিকে শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল তার মৃত্যুর ঠিক আগের দিন বিকেলে।"
"তিনি সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে বিকেল সাড়ে চারটা নাগাদ ক্ষেতের শাকসবজি তুলতে গিয়েছিলেন, তবে তিনি পুরোপুরি ভারতের সীমানার ভেতরেই ছিলেন।"
"পরদিন সকালে বিএসএফ আমাদের জানায় যে একজন ভারতীয় নাগরিককে গুলি করে হত্যা করার কথা বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি তাদের জানিয়েছে।"
"বিএসএফ আমাদের বলে যে বিজিবি গুলিচালনার কথা স্বীকার করলেও আত্মরক্ষার্থেই না কি সে গুলি চালানো হয়েছে। ওই ব্যক্তির কাছ থেকে ইয়াবা মাদকের ট্যাবলেটও ছিল বলে বিজিবি দাবি করেছে।"
"অথচ তার নামে পুলিশের কাছে কোনও ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই, এলাকায় বরং তার বেশ সুনামই ছিল।"

ছবির উৎস, Meghalaya Government
"চোরাকারবারেও সে জড়িত ছিল না, তাই এলাকার বাসিন্দারা স্তম্ভিত - বিজিবির বক্তব্য তারা মোটেও বিশ্বাস করতে পারছেন না", বলছিলেন ওয়েস্ট গারো হিলসের পুলিশ সুপার প্রিয়াংশু পান্ডে।
স্থানীয় বিএসএফ কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই সীমান্তের অন্য দিকে ময়নসিংহ সেক্টরে মোতায়েন বিজিবি-র ৩৯ ব্যাটেলিয়নের কাছে এই হত্যাকান্ডের ব্যাপারে একটি প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছেন।
এদিকে এই ঘটনায় সীমান্ত এলাকায় তীব্র উত্তেজনা তৈরি হওয়ার পর মেঘালয় রাজ্য সরকারও বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে।
মেঘালয়ের উপ-মুখ্যমন্ত্রী প্রেস্টোন টিনসং বিবিসিকে বলছিলেন তাদের সরকার অবশ্য এখনও থেডিয়ান জি মোমিনের মৃত্যু নিয়ে কোনও চূড়ান্ত রিপোর্ট হাতে পায়নি।
উপমুখ্যমন্ত্রী মি টিনসং জানান, "সরকার বিষয়টি বিএসএফের হাতেই ছেড়ে দিয়েছে এবং বিএসএফ কর্তৃপক্ষের রিপোর্টের অপেক্ষায় আছে।"
এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of X post
"আমরা শুধু এটুকু জানি, কমান্ডান্ট পর্যায়ে দুদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।"
এদিকে এই বিতর্কের মধ্যেই সীমান্ত এলাকার আর একটি ঘটনাকে ঘিরেও মেঘালয়ে উত্তেজনা ছড়িয়েছে, যেটি ঘটেছে রাজ্যের ওয়েস্ট জয়ন্তিয়া হিলস জেলায়।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে, ২রা জানুয়ারি রাতে ওই জেলার আমজলং গ্রামে বিজয় রংপির সুপারিবাগানে ঢুকে ফসল চুরি করার চেষ্টা করছিল একদল বাংলাদেশি দুষ্কৃতী।
বিজয় রংপি সেটা টের পেয়ে বাধা দিতে গেলে তাকে পিছমোড়া করে বেঁধে বাংলাদেশের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ওই দুষ্কৃতীরা - কিন্তু তার চিৎকারে গ্রামের লোকজন জড়ো হয়ে যাওয়ায় সে চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।
মেঘালয় বিএসএফের পক্ষ থেকে টুইট করে এ ঘটনায় গ্রামবাসীদের ভূমিকার প্রশংসাও করা হয়েছে।
মেঘালয়ে মোতায়েন বিএসএফের আইজি হরদীপ সিং দুদিন আগেই এক সাংবাদিক বৈঠকে মন্তব্য করেন, "মেঘালয় ও বাংলাদেশের ৪৪০ কিলোমিটার লম্বা সীমান্তের ৩০ শতাংশ এলাকায় এখনও কাঁটাতারের বেড়া বসানো সম্ভব হয়নি।"

ছবির উৎস, Meghalaya BSF
"আর এ কাজ যতদিন না শেষ হচ্ছে ততদিন এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।"
"সীমান্তে বেশ কয়েকটা জায়গায় বেড়া বসাতে বাংলাদেশ সরকারের অনুমতিও লাগবে, আমরা তাদের কাছে সে ব্যাপারে যোগাযোগও করছি", জানান বিএসএফের ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
প্রসঙ্গত, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহেই বিএসএফ ও বিজিবি-র মহাপরিচালকরা আসামের রাজধানী গুয়াহাটিতে শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়েছিলেন - আর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সেটাই ছিল দুই বাহিনীর ডিজি-দের মধ্যে প্রথম বৈঠকে।
সীমান্ত হত্যাকান্ড বন্ধ করার ব্যাপারেও সেই সম্মেলনে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা হয়েছিল।
কিন্তু এই মুহূর্তের বাস্তবতা হল, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে বিএসএফের বিরুদ্ধে যে ধরনের ক্ষোভ-বিক্ষোভ আখছার শুনতে পাওয়া যায় - এখন মেঘালয়ের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী গ্রামেও বিজিবি-র বিরুদ্ধে ঠিক একই ধরনের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে।








