ফেলানি হত্যার ঘটনার ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার পায়নি পরিবার

    • Author, সানজানা চৌধুরী
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফ এর গুলিতে ফেলানি হত্যার ঘটনার ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত বিচার পায়নি নিহতের পরিবার।

দু'হাজার এগার সালের ৭ই জানুয়ারি বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ি উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে ভারতীয় রক্ষী বাহিনী-বিএসএফের গুলিতে নিহত হন ১৪ বছরের কিশোরী ফেলানি খাতুন।

প্রতি বছর এই দিনটি ঘনিয়ে এলেই আতঙ্কে উদ্বেগে অস্থির হয়ে ওঠেন ফেলানির মা জাহানারা বেগম।

হত্যার পর সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে কাঁটাতারে ঝুলন্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয় ফেলানির লাশটিকে।

নিজের চোখে ফেলানির বাবা নুরুল ইসলাম নুরু দেখেছেন সন্তানকে কাঁটাতারে ঝুলে থাকা অবস্থায় তিলে তিলে মরে যেতে।

এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার চাইতে নিজের মৃত্যুকেই যেন আরও সহজভাবে মেনে নিতেন তিনি।

"এইভাবে আমার মেয়েটাকে পাখির মতো মেরে ওরা ঝুলায় রাখল। আমি তো একজন মা। এই দিনটা আসলে আমার যে কি হয়, আমি বলতে পারবো না। এর চাইতে আমি মরে গেলে বেশি ভালো হতো।"

ফেলানির সেই ঝুলে থাকা লাশের ছবি নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী সমালোচনার ঝড় তোলে।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাশটি ঝুলন্ত অবস্থায় রেখে দিয়ে বিএসএফ লাশটি সরিয়ে নেয়।

দু'দিনব্যাপী পতাকা বৈঠক শেষে হত্যার ৩০ ঘণ্টা পর ফেলানির লাশ বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে বিএসএফ।

ওইদিনই ময়নাতদন্ত শেষে দাফন করা হয় ফেলানিকে।

এরপর আন্দোলনের মুখে ভারতে হত্যার বিচার কার্যক্রম শুরু হয় কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন মীমাংসা হয়নি।

বিচার বার বার পিছিয়ে যাওয়ায় হতাশ ফেলানির পরিবার।

মা জাহানারা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, "যখন আমার মেয়ে মারা গেল তখন তো তারা বিচার করবে বলে অনেক আশা দিল। একে একে দশ বছর পেরিয়ে গেল, বিচার পাচ্ছি না। আমি চাই দুই সরকার মিলে যেন আমার মেয়ের হত্যার বিচারটা করে।"

ফেলানি হত্যার আড়াই বছর পর ২০১৩ সালের অগাস্টে ভারতের জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস আদালতে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার কাজ শুরু হয়।

পরের মাসেই বিএসএফ জওয়ান আসামি অমিয় ঘোষকে খালাস দেয় বিএসএফ এর ওই বিশেষ আদালত।

এরপর রায় প্রত্যাখ্যান করে ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে পুনর্বিচারের দাবি জানান ফেলানির বাবা।

এর প্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের আবারও বিচারকাজ শুরু হয়। পরের বছর সেটিতেও খালাস পান অমিও ঘোষ।

ওই বছরই ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম) এই হত্যা মামলার পুনর্বিচার এবং ক্ষতিপূরণের দাবিতে ফেলানির বাবার পক্ষে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি রিট পিটিশন করে।

দফায় দফায় নতুন তারিখ ধার্য হলেও মামলার শুনানি আজও ঝুলে আছে।

সবশেষ গত বছরের ১৮ই মার্চ শুনানির দিন ধার্য হলেও সেটাও পিছিয়ে যায়।

অথচ এই বিচার কাজ চালিয়ে নিতে ইতোমধ্যে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে দরিদ্র পরিবারটি।

"আমি বিচার চাই। মরার আগে বিচারটা দেখে গেলে শান্তি পাইতাম। আর এই বিচার করতে গিয়ে পথে বসে গেছি। আমার তো আরও পাঁচটা বাচ্চা আছে। তাদেরকে তো দেখতে হবে। সরকার আমাদের পাশে অন্তত দাঁড়াক।" বলেন জাহানারা বেগম।

ফেলানির বাবা নুরুল ইসলাম নুরু কুড়িগ্রামের কলোনীটারী গ্রামে বেড়ে উঠলেও তিনি থাকতেন ভারতেও বঙ্গাইগাঁও গ্রামে।

তিনি ২০১১ সালে বাংলাদেশে ফেলানি খাতুনের বিয়ে ঠিক করেন এবং মেয়েকে বিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যেই ৭ই জানুয়ারি বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশের চেষ্টা করেন।

অনন্তপুর সীমান্ত দিয়ে পার হওয়ার সময় হঠাৎ গুলির শব্দ শুনে দ্রুত কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার চেষ্টা করেন বাবা নুরু। এক পর্যায়ে বাংলাদেশ সীমান্তে পড়ে গিয়ে তিনি আহত হন।

কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি ফেলানির। একটি গুলির শব্দ আর মেয়ের চিৎকারে তিনি বুঝতে পারেন, তাদেরকে লক্ষ্য করেই গুলি ছোড়া হচ্ছে।

নিজেকে কোনভাবে নিরাপদে আড়াল করতে পারলেও চোখের সামনে তিলি তিলে মারা যেতে দেখেন মেয়েকে।

কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলন্ত অবস্থায় মারা যায় ফেলানি।

ধরা গলার জাহানারা বেগম বলেন, "মানুষের মরণ তো হয়ই কিন্তু পৃথিবীর কাউকে যেন তার সন্তানের এমন মৃত্যু দেখতে না হয়। আমি এইটা চাই আল্লাহর কাছে।"

ফেলানি হত্যার পর দুই দেশের সমঝোতায় পুরো পরিবারটিকে পরে বাংলাদেশে আনা হয়।

ভারতীয় ভূখণ্ডে ভারতীয় রক্ষী বাহিনীর গুলিতে নিহত হওয়ায় এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দায়ভার পরে ভারত সরকারের ওপর।

কিন্তু এই বিচারকাজ বিএসএফ এর বিশেষ আদালতের পরিবর্তে সিভিল আদালতে হওয়া উচিত ছিল বলে জানান, ফেলানি হত্যা মামলায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সদস্য এবং কুড়িগ্রাম জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট এস. এম. আব্রাহাম লিংকন।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে উত্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে ৩৩২ জনের প্রাণহানি হয়েছে।

কিন্তু মানবাধিকার সংগঠন মাসুম যে হিসেব দিয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে ২০১০ সাল থেকে এপর্যন্ত ঐ সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলিতে ১২৩৬ ব্যক্তি নিহত হয়েছে।

ঐ সীমান্তে প্রতি বছর ১৫০ জন করে মানুষ মারা যাচ্ছে বলে মাসুম কৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে।

অথচ সীমান্ত হত্যা বন্ধে বিজিবি ও বিএসএফের শীর্ষ পর্যায়ের সম্মেলনে সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

আরও পড়তে পারেন:

দুই দেশের রাজনৈতিক পর্যায়ের আলোচনাতেও ভারত সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি নেয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন তেমন দেখা যায়নি।

ফেলানিকে হত্যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ ও জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে এখন থেকে দরকষাকষির মাধ্যমে ন্যায়বিচার আদায় করতে হবে বলে পরামর্শ দিয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরা।