বিএসএফের হাতে বাংলাদেশী কিশোরী ফেলানি হত্যা: বিচার কি হবে?

    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া টপকানোর সময় ভারতীয় সীমান্ত-রক্ষীদের গুলিতে বাংলাদেশী কিশোরী ফেলানি খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় সাত বছর পূর্ণ হল আজ।

কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলছে ফেলানির মৃতদেহ - এই মর্মান্তিক ছবিটি সে সময় সীমান্তে বিএসএফের নিষ্ঠুরতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

যে বিএসএফ সদস্যর বিরুদ্ধে ফেলানিকে গুলি চালানোর অভিযোগ উঠেছিল, দু'দফায় বাহিনীর নিজস্ব বিচার প্রক্রিয়ার শেষে তিনি অবশ্য খালাস পেয়ে গেছেন - তবে ফেলানি খাতুনকে হত্যার ঘটনায় অপর একটি মামলা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে এখন বিচারাধীন আছে।

কিন্তু ফেলানির মৃত্যুর সাত বছরের মাথায় এসে তার পরিবারের সুবিচার পাওয়ার আশা এখন কতটুকু?

২০১১ সালের ৭ই জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলায় চৌধুরীহাট সীমান্ত চৌকির কাছে ভোররাতে দালালদের সাহায্যে সীমান্ত পেরোচ্ছিল ফেলানি খাতুনের পরিবার।

তার বাবা আগেই কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে যান, কিন্তু ফেলানি যখন নিজে বেড়া টপকাচ্ছিল - তখনই বিএসএফের ছোঁড়া গুলিতে তার জীবন শেষ হয়ে যায়।

পরবর্তী বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে তার দেহ যেভাবে সেই বেড়ার ওপরেই ঝুলতে থাকে - সেই ছবি বাংলাদেশ জুড়ে তীব্র জনরোষ ও ভারতবিরোধী আবেগের জন্ম দিয়েছিল।

ভারতেও মানবাধিকার কর্মীরা এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন - আর তাদের হয়েই এখন দেশের সুপ্রিম কোর্টে ফেলানি খাতুন হত্যা মামলাটি লড়ছেন সিনিয়র আইনজীবী বিজন ঘোষ।

মি ঘোষ জানাচ্ছেন, সর্বোচ্চ আদালত চূড়ান্ত শুনানির জন্য এই মামলাটিতে তারিখ দিয়েছেন - খুব সম্ভবত এই জানুয়ারি মাসের ১৭ বা ১৮ তারিখেই সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা মামলাটি শুনবেন।

তবে সেই সঙ্গে তিনি বলছেন, "এই মামলাটি খুবই স্পর্শকাতর। শুধু একজন মারা গেছেন, তাতে আবেগপ্রবণ হলেই যে বিষয়টার নিষ্পত্তি হয়ে যাবে তা নয় - কারণ একদিক থেকে ভাবলে একটা দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নও এই ঘটনায় জড়িত।"

"যিনি মারা গেছেন, তিনি যে নির্দোষ ছিলেন এ ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কিন্তু বিএসএফই বা কী করবে? আমাদের সীমান্তই তো ফাঁকফোকরে ভরা ... জমি ভাগ হলেও একই জাতিগোষ্ঠীর মানুষ যে সীমান্তের দু'পারে থাকেন, সেটা কী করে অস্বীকার করি?"

বিবিসি বাংলাকে দেওয়া তার এই বক্তব্য থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, কেন বিএসএফের নিজস্ব বিচার প্রক্রিয়া ও ট্রাইব্যুনালে দু'দফায় দীর্ঘ শুনানির পরও অভিযুক্ত জওয়ান অমিয় ঘোষ বেকসুর খালাস পেয়ে গেছেন।

বিএসএফ কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে এই বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে একেবারেই রাজি নন।

কিন্তু একান্ত আলোচনায় তারা খোলাখুলিই বলছেন শীতের রাতে ঘন কুয়াশার মধ্যে যখন একজন সীমান্ত-রক্ষী বেড়া টপকানোর সময় কাউকে লক্ষ্য করে গুলি চালান তখন তার বিরুদ্ধে কিছুতেই হত্যার অভিযোগ আনা যায় না - বিশেষত যেখানে বিএসএফের ম্যান্ডেটই হল সীমান্তে চোরাকারবার ও অবৈধ যাতায়াত ঠেকানো।

ফলে ভারতের আদালতেও অভিযুক্ত জওয়ানের সাজা হবে সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ - যদিও একেবারে হাল ছাড়তে রাজি নন সুপ্রিম কোর্টে মামলাটির মূল আবেদনকারী, মানবাধিকার সংগঠন মাসুমের কর্ণধার কিরীটি রায়।

তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, "দেখুন ন্যাংটার তো হারানোর কিছু নেই, ফলে রায় বিরুদ্ধে গেলেও আমাদের কী আর এসে যাবে? তবু ভারতের বিচারব্যবস্থার ওপর আমাদের এখনও আস্থা আছে বলেই আমরা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি।"

সেই সঙ্গেই তিনি আরও জানাচ্ছেন ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) ফেলানি খাতুনের ঘটনায় সব দিক বিবেচনা করে পাঁচ লক্ষ রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছিল - কিন্তু ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা মানেনি।

"মানবাধিকার কমিশন বলেছিল ফেলানি সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ছিল - বিএসএফও কখনও দাবি করেনি সে তাদের দিকে গুলি বা পাথর ছুঁড়েছিল, বা প্রকৃত দোষীরা কেউ আহতও হয়নি। সেই কারণেই ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়েছিল, কিন্তু ভারত সরকার সেই আদেশও উপেক্ষা করেছে," বলছিলেন কিরীটি রায়।

বস্তুত এই মামলায় ভারত সরকার তথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহানুভূতি যে বিএসএফের দিকেই, সেটা কোনও গোপন কথা নয়।

বন্ধু-প্রতিম প্রতিবেশী বাংলাদেশের চাপে বিএসএফ ট্রাইব্যুনালের দাবি মেনে নেওয়া হলেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ যে এর বেশি কিছু করতে প্রস্তুত নয়, আইনজীবী বিজন ঘোষও প্রকারান্তরে সে কথা মেনে নিচ্ছেন।

তিনি বলছিলেন, "বিএসএফ অ্যাক্ট বলে এদেশে একটা আইন আছে, সেই আইনের বাইরে গিয়েও কিন্তু এই ঘটনায় অভিযুক্তদের কোর্ট মার্শালের আওতায় আনা হয়েছে। নয়তো বিএসএফ আইনে যা বলা আছে, তা অক্ষরে অক্ষরে মানলে কোর্ট মার্শালে তাদের আনার কথাই নয়!"

ফলে ফেলানি খাতুনের মৃত্যুর সাত বছরের মাথায় এসে তার হত্যাকারীরা শেষ পর্যন্ত আদৌ কোনও সাজা পাবেন, সেই সম্ভাবনা এখনও সুদূরপরাহত।

কিন্তু ভারতের মানবাধিকার কর্মীরা এখনও মনে করছেন, সর্বোচ্চ আদালতে বিএসএফকে ভর্ৎসনার মুখে পড়তে হতে পারে, এমন কী ফেলানি খাতুনের পরিবার যাতে অন্তত আর্থিক ক্ষতিপূরণ পায় সুপ্রিম কোর্ট সেই নির্দেশও দিতে পারে।