৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিকের বিবৃতিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যেভাবে দেখছে

নির্বাচন কমিশন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, নির্বাচন কমিশন
    • Author, কাদির কল্লোল
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণ এবং দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক যে বিবৃতি দিয়েছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

এমন বিবৃতির পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার অভিযোগ এনে আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, তারা বিষয়টাকে রাজনৈতিক কৌশলে মোকাবেলা করবেন।

অন্যদিকে বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়েছে।

দু'দিন আগে ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের দাবি জানিয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে নির্বাচন পরিচালনায় ব্যর্থতার অভিযোগ অনেক পুরোনো।

এখন কমিশনের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মসহ দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এনেছেন ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক।

আরো পড়তে পারেন:

ড: আব্দুর রাজ্জাক, কৃষিমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য
ছবির ক্যাপশান, ড: আব্দুর রাজ্জাক, কৃষিমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য

আওয়ামী লীগের সিনিয়র কয়েকজন নেতা নির্বাচন কমিশন এমন বিবৃতির সাথে বিএনপির যোগসূত্র থাকার অভিযোগ করেছেন।

দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং মন্ত্রী ড: আব্দুর রাজ্জাক জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে তারা তাদের দলের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করেছেন।

তারা মনে করেন, এখন হঠাৎ করে এই বিবৃতি দেয়া হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে। আর এই বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের সবাই বিস্তারিত সবকিছু জেনে স্বাক্ষর করেছেন কিনা- এনিয়ে তাদের সন্দেহ রয়েছে বলে ড: রাজ্জাক উল্লেখ করেন।

তিনি বলেছেন, "যারা বিবৃতি দিয়েছেন, জাতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অনেক সময তারা নিরব থাকেন। এই কয়েকদিন আগেই জাতির পিতার ভাস্কর্য ভাঙচুর করেছে ধর্মান্ধ গোষ্টী এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। সে ব্যাপারে কিন্তু উনারা কোন বক্তব্য দেন নাই। যখন দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য হেফাজত বা ধর্মান্ধরা কাজ করছে, তখন নতুন একটা উপাদান আনা হলো এই বিবৃতি দিয়ে। এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে।"

অন্যদিকে, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিশিষ্ট নাগরিকদের এই বিবৃতির জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

তবে তিনি বলেছেন, "৪২ জন যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেই কথাগুলোতো আমরা বহু আগে থেকেই বলছি। ২০১৮ সালের নির্বাচন এবং পরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ সবগুলোতেই নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতিত্ব করেছে। বলা যায় যে চরমভাবে ব্যর্থতা, অযোগ্যতা- তার সব প্রমাণই দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আমরা দু'বছর ধরে এই বক্তব্য দিয়ে আসছি।"

তিনি বলেছেন, আ্ওয়ামী লীগ নেতারা সত্যকে অস্বীকার করে এখন সবকিছুই একতরফা রাজনৈতিক চিন্তা থেকে বিচার করছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
ছবির ক্যাপশান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

ইস্যুটি নিয়ে প্রধান দুই দলের নেতারা পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিচ্ছেন।

তবে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সুলতানা কামাল এবং বদিউল আলম মজুমদারসহ ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিকের অভিযোগের পেছনে নির্বাচন কমিশনও রাজনীতি দেখছে।

একজন নির্বাচন কমিশনার অবসারপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার সাহাদাত হোসেন চৌধুরী বলেছেন, দু'একটি পত্রিকার প্রকাশিত অভিযোগের বিরুদ্ধে তারা বিভিন্ন সময় প্রতিবাদ করেছিলেন। কিন্তু সে সব অভিযোগই এখন সামনে আনা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ নেতাদের বড় প্রশ্ন হচ্ছে, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের দাবি নিয়ে।

২০১৭ সালে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে নেয়া হয়েছিল। সে সময় প্রধান বিচারপতি ছিলেন এস কে সিনহা। তখন তার নেতৃত্বে আপিল বিভাগ সংসদের সেই ক্ষমতা বাতিল করে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে আনার রায় দিয়েছিলেন। এর বিরুদ্ধে সরকারের রিভিউ আবেদন আপিল বিভাগে রয়েছে।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, যেহেতু বিষয়টি এখন বিচারাধীন সেকারণে এখন জুডিশিয়াল কাউন্সিল দেশে নেই এবং এই ইস্যুতে নতুন করে বিতর্ক র্সষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তারা মনে করেন।

আওয়ামী রীগ নেতা ড: রাজ্জাক বলেছেন, "সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল নিয়ে তিন বছর আগে অনেক বিতর্ক করা হয়েছিল। এখন দেশে সেই কাউন্সিল নেই। এরপরও এমন কাউন্সিল গঠন করে নির্বাচন কমিশনের অপসারণ চাওয়া হয়েছে। পলে এর পেছনে উদ্দেশ্য রয়েছে- সেটা পরিস্কার বোঝা যায়।"

কিন্তু বিবৃতিদাতাদের মধ্যে অন্যতম বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, তারা আইন অনুযায়ীই রাষ্ট্রপতির প্রতি ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।

" নির্বাচনের কমিশনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হযেছে। এমনকি একজন নির্বাচন কমিশনারও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে নিযোগ দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন। এগুলোই আমাদের ভিত্তি। আমরা নিজেরা তদন্ত করি নাই। এগুলো আমাদের অভিযোগ। আমরা অভিযোগের ব্যাপারে রাষ্ট্রপতির দৃষ্টি আকর্সণ করেছি। তিনি যেন তদন্তের ব্যবস্থা করেন। এ সত্যতা পেলে তিনি যেন ব্যবস্থা নেন। সংবিধান অনুযায়ী যে ব্যবস্থার কথা বলা আছে, আমরা তা অনুসরণ করেই আবেদন করেছি।"

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী অন্য দু'জন বিশিষ্ট নাগরিক বলেছেন, তাদের আবেদনের ভিত্তিতে কোন ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা - এতে তাদের সন্দেহ রয়েছে।

কিন্তু অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে তা জনসমক্ষে তুলে ধরার লক্ষ্য থেকেই তারা এ বিবৃতি দেন।