ইতালির সিসিলিতে কীভাবে শক্ত হচ্ছে আফ্রিকান সংস্কৃতি

পালের্মোর রাস্তায় সেনেগালিজ শিল্পী দুদু দিউফ এবং তার দলের পারফরমেন্স

ছবির উৎস, NurPhoto/Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পালের্মোর রাস্তায় সেনেগালিজ শিল্পী দুদু দিউফ এবং তার দলের পারফরমেন্স

ইতালির সিসিলি দ্বীপটি এখন হাজার হাজার আফ্রিকান অভিবাসীর বসতি। ইউরোপে যাওয়ার জন্য জীবন বাজি রেখে নৌকায় করে সাগর পাড়ি দিয়ে ভূমধ্যসাগরের এই দ্বীপে এসে নামেন। তাদের অনেকেরই পরে আর ইটালির মুল ভূখণ্ডে যাওয়া হয়নি বা ইচ্ছা করেই যাননি।

পালের্মোর কৃষ্ণাঙ্গ সাংবাদিক ইসমাইল ইনেশি প্রত্যক্ষ করেছেন কীভাবে ধীরে ধীরে সিসিলিয়ান মূলধারার সংস্কৃতির ওপর প্রভাব বিস্তার করছে আফ্রিকান সংস্কৃতি - আফ্রিকান সঙ্গীত, কাব্য এবং খাদ্য। কীভাবে অনেক কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান সিসিলিতে তারকা হয়ে উঠছেন?

পালের্মোর আফ্রিকান বিট

গ্রীষ্মের এক শুক্রবারের রাত। সিসিলির রাজধানী শহর পালের্মোর জমজমাট বাজার লা ভুসিরিয়ায় আফ্রিকান একটি রেস্তরাঁর বাইরে বসেছে সেনেগালি মিউজিকের ধামাকা। সেনেগালেরই একজন শিল্পী দুদু দিউফ এই মিউজিক দলটি চালান। । তিনিই সিওয়ারা নামে এই রেস্তরাঁর মালিক।

২০১৮ সালে চালুর পর থেকে পালের্মোর কেন্দ্রে এই রেস্তরাঁটি নগরীর আফ্রিকার কম্যুনিটির মেলামেশার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

আশপাশেই অনেক সিসিলিয়ান রেস্তোরাঁ রয়েছে যেখানে রান্না চলছে কাপোনাতা, আরানসিনি বা ভাজা মাছের মত স্থানীয় জনপ্রিয় সব ডিশ। রাস্তার ধারে টানা গাড়িতে অ্যাপেরোল স্প্রিতজ (বিশেষ ধরণের ইতালিয়ান মদ) বিক্রি করছেন ফেরিওয়ালারা। কিন্তু মানুষের নজর কাড়ছে আফ্রিকান ড্রাম এবং সেই সাথে শরীরের দুলুনি।

সন্ধ্যা যখন রাতে গড়ায় সিওয়ারা রেস্তরাঁটি যেন হয়ে ওঠে নাচের ফ্লোর। কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ তরুণীর সাথে যোগ দেন সিসিলিয়ান তরুণ তরুণী। আফ্রিকান ড্রামের সাথে চলে উদ্যম নৃত্য। সেই সাথে বিক্রি শুরু হয় সিওয়ারার বিশেষ আফ্রিকান ককটেল - আফ্রিকান আম, আনারস এবং আদা মেশানো মদ।

বহু সংস্কৃতির হটস্পট

সিসিলির প্রাচীন এ শহরে বাড়ছে আফ্রিকার নাচ, সঙ্গীত এবং সেই সাথে খাবারের জনপ্রিয়তা। এমনকি সিসিলির তরুণরা এখন আফ্রিকান হেয়ার স্টাইলের ভক্ত হয়ে উঠছে।

এর প্রধান কারণ পালের্মো এখন হাজার হাজার কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের বসতি। এদের সিংহভাগই এসেছেন পশ্চিম আফ্রিকার কয়েকটি দেশে থেকে - সেনেগাল, নাইজেরিয়া এবং গাম্বিয়া।

পালের্মো অবশ্য বহুদিন ধরেই নানা সংস্কৃতির একটি মিলন ক্ষেত্র, ইংরেজিতে যাকে বলে মেল্টিং পট। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইতালিয়ান এই দ্বীপটিতে অভিবাসীদের বরণ করে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তার অন্যতম কারণ শহরের মেয়র লিউলুকা অর্লান্ডো অভিবাসীদের ব্যাপারে অনেক উদার।

পালের্মোর বালেরো মহল্লায় অভিবাসী আফ্রিকান এবং সিসিলিয়ানদের মাল্টি-কালচারাল উৎসব, এপ্রিল, ২০১৯

ছবির উৎস, AFP

ছবির ক্যাপশান, পালের্মোর বালেরো মহল্লায় অভিবাসী আফ্রিকান এবং সিসিলিয়ানদের মাল্টি-কালচারাল উৎসব, এপ্রিল, ২০১৯

হাজার হাজার যেসব অফ্রিকান উত্তর ইউরোপে অবৈধ অভিবাসনের উদ্দেশ্যে সাগর পাড়ি দেয়, তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ প্রথমে সিসিলিতে এসে নামে। তাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত এখনেই থেকে যায়।

ইতালির যে সব শহরে নানা জাতি-গোষ্ঠী-বর্ণের মানুষের বসবাস, পালের্মো সেগুলোর অন্যতম। শুধু ইতালিরই নয়, পালের্মো এখন ইউরোপের মাল্টি-কালচারাল (বহু সংস্কৃতির) হটস্পট হয়ে উঠেছে।

আরও পড়তে পারেন:

পালের্মোর বালেরো নামে যে মহল্লাটির সাথে দীর্ঘদিন ধরে মাফিয়াদের নাম জড়িয়ে ছিল সেখানে এখন কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের সবচেয়ে ভিড়। শুধু কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান নয় নয়, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীরাও এখন বালেরো এবং পুরো পালের্মোর জনসংখ্যার বেশ উল্লেখযোগ্য একটি অংশ।

বালেরো মহল্লার ভেতর যদি হেঁটে যাওয়া যায় হরহাশেমা চোখে পড়বে আফ্রিকান রেস্তরাঁ যেগুলোর মেন্যুতে রয়েছে ডোমাডা বা চিকেন-রাইসের মত পশ্চিম আফ্রিকান ডিশ। রাস্তায় অনেক টানা গাড়িতে বিক্রি হচ্ছে ঢ্যাঁড়শ, কচু বা কামরাঙ্গা মরিচের মত সবজি যেগুলো সিসিলিয়ানরা আগে কখনো দেখেনি।

চোখে পড়বে কয়লার আগুনে ভুট্টা রোস্ট করছেন একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী, আর তার পাশে বসেই ঠাণ্ডা বিয়ার পান করছেন বয়স্ক একজন সিসিলিয়ান। পাশের গলিতেই হয়তো হয়ত একদল আফ্রিকান তরুণ গোল হয়ে বসে গ্রিল করা চিকেন শাসলিক খাচ্ছে। পালের্মোর সর্বত্রই এখন আফ্রিকান চোখে পড়ে। রাস্তার কোনায় ছোটো দোকান খুলে নাইজেরিয়ান নারীরা কোমল পানীয়, মিষ্টি বা বিয়ার বিক্রি করছে। এমনকি অনেক সেনেগালি দর্জির দোকান চোখে পড়বে যেখানে আফ্রিকান ট্র্যাডিশনাল বা ঐ ধাঁচে পোশাক তৈরি করা হচ্ছে।

তবে হালে এই দ্বীপে অভিবাসী বিরোধী মনোভাব দেখা দিতে শুরু করেছে, এবং এর প্রধান কারণ করোনাভাইরাস প্যানডেমিকের কারণে সামগ্রিক অর্থনীতির বেহাল দশা। কিন্তু তাতে করে অভিবাসীদের কারণে এই নগরীর সাংস্কৃতিক মানচিত্রের নতুন যে চেহারা দাঁড়িয়েছে তা সহসা বদলাবে না।

সিসিলির আফ্রিকান তারকা

নাইজেরিয়ার আফ্রো-বিট শিল্পী রে জিযি এবং নেলসন বিলিনজ - যিনি বিগ বিলি নামে খ্যাতি পেয়েছেন- তারা এখন পালের্মোর সঙ্গীত জগতের উল্লেখযোগ্য তারকা।

পালের্মোর অভিবাসী বান্ধব মেয়র লিউলুকা অর্লান্ডো (ডানে) একটি নাগরিকত্ব প্রদান অনুষ্ঠানে

ছবির উৎস, Getty

ছবির ক্যাপশান, পালের্মোর অভিবাসী বান্ধব মেয়র লিউলুকা অর্লান্ডো (ডানে) একটি নাগরিকত্ব প্রদান অনুষ্ঠানে

সিসিলির আরেক আফ্রিকান তারকা নাইজেরিয়ান ২৫ বছরের তরুণ গায়ক ক্রিস ওবেহি। নাইজেরিয়ার ইডো প্রদেশে বাড়ি ছেড়ে ১৭ বছর বয়সে লিবিয়া হয়ে ইউরোপের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলেন এই যুবক। সিসিলিতে নেমে সেখানেই থেকে গেছেন।

ওবেহি এখন এখানকার বড় তারকা। মে মাসে তার একটি গানের অ্যালবাম বের হয়েছে, যেখানে তিনি ইটালিয়ান, সিসিলিয়ান, ইডো এবং ইংরেজি ভাষায় গান গেয়েছেন। ওবেহি এতটাই জনপ্রিয় গায়ক এখানে যে এ বছর তিনি সঙ্গীতে সিসিলির সবচেয়ে বিখ্যাত পুরস্কার ‘রোসা বালিসত্রেরি আলবার্তো ফাভারা‘ জিতেছেন। এই দ্বীপের প্রবাদ-প্রতিম গায়িকা রোসা বালিসত্রেরির নামে এই পুরষ্কার।

সিসিলিয়ান ভাষায় ওবেহির গাওয়া সু তি লু দিসি (কে তোমাকে বলেছে) গানটি নিয়ে এখানকার মানুষ পাগল। তার নিখুঁত সিসিলিয়ান উচ্চারণে মুগ্ধ তারা।

ওবেহির অনেক গানে পালের্মো আসার পথে তার যে কষ্টকর অভিজ্ঞতা হয়েছে তা প্রকাশ পায়।

লিবিয়া থেকে নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা নিয়ে তার একটি গান বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

গানের কথা এমন - ‘নন সিয়ামো পেশশি‘ বাংলায় যার অর্থ ‘আমরা সাগরের মাছ নই, আমরা মানুষ।‘