কুর্মিটোলা ধর্ষণ সারভাইভারের নিজস্ব কথা: 'ধর্ষণের শিকার না হওয়াই আমাদের সবার অধিকার'

এ'বছরের শুরুতে, জানুয়ারি মাসের ৫ তারিখে ঢাকার কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী আক্রমণের শিকার হন। তার এই অভিজ্ঞতা, যে বহুমুখী ট্রমার মধ্য দিয়ে সময় পার করছেন, বিচার প্রক্রিয়া এবং অন্য সকল নারীর জন্য তার আশা নিয়ে এই প্রতিবেদন লিখেছেন বিবিসি বাংলার জন্য। তার নিরাপত্তার জন্য লেখক এবং ধর্ষণ সারভাইভারের নাম গোপন রাখা হল:

আমি কখনো মনে করি নাই বাংলাদেশের রাস্তাঘাট আমার জন্য নিরাপদ, কিন্তু সবসময় বিশ্বাস করেছি গায়ের জোরে মানুষের নিরাপত্তাহীনতার কারণ যারা হয়, তারা আমার জীবনের গতি নির্ধারণ করে দেবে না, আমি দিতে দেবো না।

সেইজন্যই বোধহয় অনেক জঘন্য সহিংসতার শিকার হওয়ার পরও আমি নিজের জীবন নিয়ে মোটেই শঙ্কিত হয়ে যাই নাই। আমি আমার জীবনাচরণ একটুও বদলাই নাই। আমি ভয় পেয়ে থেমে যাই নাই।

কুর্মিটোলায় অতর্কিতে হামলা

এ'বছর ৫ই জানুয়ারি সন্ধ্যা সাতটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস থেকে কুর্মিটোলায় নেমে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় অতর্কিতে আমার ওপর হামলা করা হয়। মাটিতে ফেলে দীর্ঘসময় গলা চেপে ধরে আমাকে কাবু করে ফেলা হয়; ধর্ষণ এবং নির্যাতন করা হয়। প্রায় ১১ মাস পর, ১৯শে নভেম্বর, ২০২০ এই ধর্ষণ মামলার রায় হয়।

আমার একটা নাম আছে। কিন্তু সেটার দরকার নাই। আমার মতো অনেক মেয়ে প্রতিদিন ধর্ষণের শিকার হয়।

যারা এই লেখা পড়ছেন, তাদের মাঝে অনেক মানুষই বিশ্বাস করেন অভিযুক্ত এবং সাজাপ্রাপ্ত মজনু আসলে আমাকে ধর্ষণই করেনি, কারণ সে 'ধর্ষণ করতে পারে না।' ধর্ষণ করেনি এই সন্দেহ আপনারা করতেই পারেন - পুলিশ বা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ভরসা রাখার জন্য যথেষ্ট নজির তারা কখনোই দেখাতে পারেনি - কিন্তু 'ধর্ষণ করতে পারে না' এই বিষয়টা আমি একেবারেই বুঝি না।

আমি খুব স্পষ্টভাবে জানাতে চাই যে তিনদিন ধরে অনেক ছবি দেখার পর যে ছবিটা দেখে আমি একশো শতাংশ নিশ্চিত হয়েছিলাম সেই ছবিটাতেই আমি আসামীকে শনাক্ত করেছি। র‍্যাবের যে অফিসার ছবিটা দেখাতে এসেছিলেন তিনিই আমাকে সময় নিয়ে ভেবে আসামীকে শনাক্ত করতে বলেছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর করুণ অবস্থা

শনাক্ত করার পর ফোনে র‍্যাবের পক্ষ থেকে আমাকে বলা হয় তারা খুবই 'সরি' যে আমাকে রক্ষা করতে পারে নাই। আমি তাদের বলেছিলাম আমাকে সরি বলতে হবে না - তারা যেন দেখে আর কারো সাথে যেন এমন না হয়। তারা জানিয়েছিলেন অবশ্যই দেখবেন। কিন্তু তার পরের দশ দিনেই বহু রেপ কেস রিপোর্টেড হয়েছে। আমাদের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরি বলে দায়িত্ব শেষ করে অনেক সময়ই।

কাজেই যারা বিশ্বাস করেন নাই মজনু আসল অপরাধী, তাদের আমি দোষ দেই না। কিন্তু এটাও ভাবি যে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কী মারাত্মক করুণ অবস্থা যে ভিকটিমের ব্যাপারে কোনো ধারণা ছাড়াই মানুষ মন্তব্য করে ফেলতে পারে 'বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী'কে 'মজনুর মতো' মানুষ ধর্ষণ করতে পারে না, কিন্তু তাকে দিয়ে যে কেউ যা খুশি তাই বলিয়ে নিতে পারে - সেখানে যদি একজন মানুষের জীবনের প্রশ্ন যুক্ত থাকে তাও।

বেঁচে থাকতে ট্রমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ

ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর থেকে সুস্থ হয়ে উঠতে এবং সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে আমাকে যথেষ্ট যুদ্ধ করতে হয়েছে। বিশাল বিশাল ট্রমা আমাকে পার হতে হয়েছে।

শরীরের ট্রমা, গাড়ির শব্দের ট্রমা, গন্ধের ট্রমা, অন্ধকার ফুটপাতের ট্রমা আরো কত কী! এই সবকিছুর ভয় নিয়েই আমি রোজ রাস্তায় বের হয়েছি। আমি জানি ভয়ের মুখোমুখি না হলে ভয় কাটে না। আরো বহু ট্রমা রয়ে গেছে। আমি জানি কোনো না কোনো সময় আমাকে সেইসবের মুখোমুখি হতে হবে।

আমাকে শুনতে হয়েছে, যথেষ্ট ভালো স্মার্ট দেখতে জামাকাপড় পরে ছিলাম না বলে আমি ধর্ষিত হয়েছি। আমাকে বলা হয়েছে এবার অন্তত 'শুধরে' যেতে; এবার অন্তত চুপচাপ ভালো মেয়ের মতো ঘরে বসে থেকে বেঁচে থাকতে; এবার অন্তত যেসব জামা, প্যান্ট, জুতা আমার কমফোর্টেবল লাগে না সেসব পরেই ঘুরে বেড়াতে। আমাকে বলা হয়েছে আশেপাশের মানুষের দুঃখ কষ্টের কারণ হওয়া বন্ধ করতে।

'আমি নিশ্চয়ই অনেক সৌভাগ্যবান'

তবে হ্যাঁ, আমি নিশ্চয়ই অনেক সৌভাগ্যবান। রাত সাড়ে দশটায় ফোন করে ''আমি কুর্মিটোলায় তিন ঘণ্টা ধরে রেইপড হইছি, এখন আমি কী করবো'' কথাটা নির্দ্বিধায় বলা যায় এমন মানুষ আছে আমার জীবনে। এমন মানুষ আছে আমার জীবনে শুধু যাদের আবার দেখার জন্য আমি বীভৎসতম অভিজ্ঞতার মাঝেও বেঁচে থাকতে চাইতে পারি।

আমার পরিবার, দল, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, বন্ধু, সহপাঠী, সিনিয়র, জুনিয়র, আর 'কাছের মানুষেরা' পুরো সময়টাতে আমাকে ভালবেসেছেন প্রচণ্ড। এমনকি ওসিসির ডাক্তার নার্স, মেডিকেল বোর্ডের ডাক্তার থেকে শুরু করে যে কজন কাউন্সিলরের সাথে কথা হয়েছে, সবাই খুব আন্তরিক ছিলেন আমার প্রতি।

আমি অনেক 'সৌভাগ্যবান' যে আদালতে আমার নিজেকে 'সচ্চরিত্র' প্রমাণ করার যুদ্ধটা করতে হয় নাই।

কিন্তু আমি জানি সবার ভাগ্য এতো 'সুপ্রসন্ন' থাকে না। সবার জন্য পরিবেশ এতো সহজ থাকে না। সবাই এতো আন্তরিকতা আর ভালোবাসা পায় না। আমি জানি না তাদের জীবন আরো কত কত কঠিন হয়।

পুলিশ চাইলে সব পারে

আমি জানি সবার মামলা এতো গুরুত্ব দিয়ে পুলিশ নেয় না, গুরুত্ব দিয়ে সব মামলার তদন্ত হয় না, বিচার হয় না। তনু ধর্ষণ ও হত্যা নিয়ে এতো চেঁচামেচির পরও সেটার কোনো কিনারা হয় নাই; অথচ আমি এখন জানি, পুলিশ চাইলে সব পারে।

আমি জানি সব রোগীর চিকিৎসা এদেশে সমান গুরুত্ব দিয়ে করা হয় না। বাংলাদেশটা কবে আমাদের সবার জন্য হবে আমি জানি না। কিন্তু আমি প্রত্যেকদিন সব কয়জন মানুষের জন্য কষ্ট পাই যাদেরকে ধর্ষণ করা হয়। আমি সেসব ছিন্নমূল মানুষের কথা ভাবি যারা ধর্ষক হয়ে ওঠে।

এইসব চলতেই থাকবে, কিচ্ছু করা যাবে না- এই যন্ত্রণা আমাকে প্রচণ্ড পীড়া দেয়। আমি আমার বোনের জন্য ভয় পাই, বন্ধুদের জন্য ভয় পাই, কাছের মানুষদের জন্য ভয় পাই। কিন্তু আমি তাদের কাউকেই কখনো বলি না নিজেকে গুটিয়ে নিতে। আমি তাদেরকে বলি নিজেকে রক্ষা করতে শিখতে। রক্ষা করতে না পারলে হতাশ না হতে; সব মানুষ অন্য মানুষকে আঘাত করতে পারবে বা চাইবে এমন কোনো কথা নাই।

নিরাপদ পৃথিবী গড়ার দায়িত্ব নিন

পৃথিবীতে যদি কোনো মানুষের অন্য একজনকে আঘাত করার প্রয়োজন না পড়তো - তাহলে নিশ্চয়ই বেঁচে থাকা অনেক সুন্দর হতো!

আমি সবাইকে অনুরোধ করতে চাই আমাদের সবার জন্য নিরাপদ একটা সমাজ, রাষ্ট্র, পৃথিবী গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে। আশেপাশের রেইপ সারভাইভারদের খবর নেন। এতো জঘন্যভাবে ভায়োলেটেড হওয়ার পর মানুষের সামাজিক মানসিক সাপোর্ট লাগে। আমার সবই ছিল। সবার থাকা উচিত। এইটা আমাদের অধিকার।

ধর্ষণের শিকার না হওয়াই আমাদের অধিকার ছিল। আশেপাশের ধর্ষণ ঘটনায় আসামী ধরা পড়ল কি না, নিপীড়নের শিকার মানুষটা কীভাবে বেঁচে আছে খোঁজ নেন। ঘটে যাওয়া ঘটনার ভুক্তভোগীদের পাশে বিচার পর্যন্ত থাকতে না পারলে আন্দোলন প্রতিবাদ খুব বেশিদূর নিয়ে যাবে না।

শুধু দুই একটা আলোচিত ঘটনার বিচার করে যেমন ধর্ষণ বন্ধ হবে না, ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করেও ধর্ষণ বন্ধ হবে না। সমস্যাটা গোড়া থেকে ঠিক করতে হবে, ধর্ষক উৎপাদন হওয়াই বন্ধ করতে হবে।

একসময় ধর্ষণ শব্দটার মানে জানতাম না, এরপর শুনলে লজ্জা পেতাম - লুকোতে চাইতাম; এখন শুনলে কখনও কখনও হাত কেঁপে ওঠে। হয়তো কিছুটা ভয়ে, কিছুটা অপমানে, কিছুটা যন্ত্রণায়। তার থেকেও অনেক অনেক বেশী আশঙ্কায়। আরেকটা মেয়ের জন্য আশঙ্কা। আরেকটা মেয়ের গোটা জীবনটাই নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।

কোনো একসময় গিয়ে, কোনো এক প্রজন্মের ছেলেদের- মেয়েদের, ধর্ষণ শব্দটার মানে জানতে হবে না- শিখতে হবে না এই অসম্ভব স্বপ্নের কথা। ভেবে যাই। ভেবে যাবো।