ইতিহাসের সাক্ষী: কীভাবে লেখা হয়েছিল নারী ও নারীর দেহ নিয়ে বিতর্কিত সেই বইটি

ছবির উৎস, AFP
'আওয়ার বডিজ, আওয়ারসেলেভস' অর্থাৎ 'আমাদের দেহ ও আমরা' - এই নামে ১৯৭৩ সালে একটি বই বেরিয়েছিল, লিখেছিলেন বিপ্লবী চিন্তাধারার একদল আমেরিকান নারী।
বইটি সে সময় ব্যাপক বিক্রি হয়েছিল এবং তা হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিশ্বব্যাপী আলোচনার বিষয়।
এই বৈপ্লবিক এবং বিতর্কিত এই বইটিকে কেউ কেউ বলেছিলেন "একটি অশ্লীল আবর্জনা," আবার অন্যরা বলেছিলেন, এটি হচ্ছে "নারীদের স্বাস্থ্য আর যৌনতা বিষয়ে তথ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস।"
সেই বইয়ের লেখকদের অন্যতম জোয়ান ডিৎজিওনের সাথে কথা বলেছেন বিবিসির জোসেফিন ক্যাসার্লি ।
সেটা ১৯৬৯ সালের কথা। জোয়ানা'র বয়স তখন ২৫, তিনি তখন পেশায় একজন চিত্রকলার শিক্ষক। মাত্র কিছুদিন আগেই বিয়ে করেছেন তিনি।
এবং ঠিক সেই সময়টাতেই তিনি নারীবাদে আগ্রহী হতে শুরু করেছেন।
"প্রথম যে বৈঠকটিতে আমি গিয়েছিলাম তা ছিল একেবারেই চমকপ্রদ। সেখানে ছিলেন ৫০ থেকে ৬০ জন নারী। তাদের মধ্যে কয়েকজনের সাথে শিশু সন্তান ছিল। কেউ কেউ বাচ্চাদের বুকের দুথ খাওয়াচ্ছিলেন। সবাই ছিলেন মানসিকভাবে খুব উদ্দীপ্ত" - বলছিলেন জোয়ান।
আমেরিকার বস্টন শহরের একটা স্থানীয় সংবাদপত্রে একটা বিজ্ঞাপন দেখে ব্যাপারটা সম্পর্কে জেনেছিলেন জোয়ান- তাতে বলা হয়েছিল যে নারীদের স্বাস্থ্য ও যৌনতা নিয়ে একটি ওয়ার্কশপ হবে।
ব্যাপারটা তাকে আগ্রহী করে তুললো। কর্মশালার নাম দেয়া হয়েছিল 'নারী ও তার দেহ।'
"আমার মনে আছে যে প্রথম অধিবেশনটাই ছিল যৌনতা নিয়ে। তবে সে সময় আমি ওসব বিষয়ে তেমন কিছুই জানতাম না। "
"দেখলাম একটা বোর্ডে নারীর যৌনাঙ্গের একটা বিরাট ছবি বা ডায়াগ্রাম। তাতে তার নানা অংশকে নাম দিয়ে চিহ্নিত করা আছে।"
"তখনকার দিনে মেয়েদের বেশির ভাগেরই এ নিয়ে শুধু এটুকুই জানা ছিল যে - হ্যাঁ, আমাদের শরীরের নিচের দিকে ওরকম একটা অংশ আছে। এটুকুই।
বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:
সেটা ছিল আমেরিকায় নারী স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম দিকের কথা। তখন নারীরা পুরুষদের সমান বেতন, গর্ভপাতের অধিকার - এসব দাবি করছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতিও হয়েছিল।
তখন সবেমাত্র জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বাজারে পাওয়া যেতে শুরু করেছে।
সেই সময়টাকে যদিও বলা হচ্ছিল যৌনতার মুক্তির যুগ । কিন্তু জোয়ানের মত অনেক নারীই, এমনকি যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন তারাও - তাদের নিজের শরীর সম্পর্কে খুবই কম জানতেন। যৌন স্বাস্থ্যের ব্যাপারেও তাদের খুব কমই জানা ছিল।
"তেমন বেশি কিছু না। হ্যাঁ, আমরা নরনারীর যৌনমিলন সম্পর্কে জানতাম - কিন্তু সেই জানাটা ছিল খুবই সীমিত।"
কিন্তু জোয়ান যে কর্মশালাটিতে গিয়েছিলেন তাতে শুরু থেকেই যৌনতার বিষয়ে খুবই খোলামেলা কথাবার্তা হয়েছিল।
"সেখানে নারীরা কিভাবে বিভিন্ন উপায়ে যৌনতৃপ্তি পেতে পারে তা নিয়ে কথা হয়, স্বমেহন নিয়ে কথা হয়। আমার কাছে সেটা একেবারেই আশ্চর্য ব্যাপার বলে মনে হয়েছিল।"
সেটা কি আপনার নিজের যৌনজীবনে কোন পরিবর্তন এনেছিল।
"হ্যাঁ নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। আমি যৌনমিলনের ক্ষেত্রে আমার নিজের দেহ কখন কিভাবে সাড়া দিচ্ছে তা বুঝতে শিখলাম, আমি ও আমার স্বামী নানা কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখলাম।"
জোয়ান তখন থেকে এ ধরণের ওয়ার্কশপের আয়োজন করার কাজে আরো বেশি সক্রিয় হলেন।

ছবির উৎস, Getty Images
এগুলোতে আসা নারীরা যৌন-স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে সন্তান জন্মদান বা গর্ভপাতের মত সব বিষয়ে তাদের নিজেদের জীবনের গল্প অন্যদের সাথে বিনিময় করলেন।
"এরকম অনেক মহিলা এসেছিলেন যারা গর্ভপাত করিয়েছেন। সেটা যে কত বিপজ্জনক এবং বেআইনি কাজ ছিল - কিভাবে গোপনে এ জন্য ডাক্তার খুঁজে বের করেছিলেন তারা, এমনকি একজন মহিলার গল্প শুনলাম যে গর্ভপাত করার জন্য একটি কাপড় ঝোলানোর হ্যাঙ্গার ব্যবহার করেছিলেন, এবং তার পর তার কীভাবে রক্তপাত হয়েছিল।
এই নারীরা আরো কথা বলেছিলেন স্বাস্থ্য সেবা নিতে গিয়ে তাদের কি ধরণের কথাবার্তার সম্মুখীন হতে হয়েছিল।
অনেক নারীই এখন মনে করেন পুরুষ ডাক্তাররা তাদের কথা ঠিকমত শোনেননি, বা তাদের যথাযথ সম্মান দেখাননি।
তবে কিছু ডাক্তার এই নারীদের প্রতি সহমর্মিতা দেখিয়েছিলেন।
জোয়ান এবং তার সহযোগী নারীরা সেই সব ডাক্তারদের সাথে দেখা করেছিলেন সেই কোর্সের জন্য নানা উপকরণ তৈরির জন্য।
"আমরা উপলব্ধি করতে শুরু করলাম যে নারীদের প্রজননতন্ত্র এবং যৌনতা বিষয়ে যেসব গবেষণা হয়েছে, তার বেশিরভাগই পুরুষদের করা এবং তারাই মেয়েদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। তা ছাড়া গর্ভধারণ এবং সন্তান জন্মদানের ব্যাপারে বইয়ের সংখ্যাও খুবই কম। তারও বেশিরভাগই ডাক্তারি দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা এবং পুরুষদেরই লেখা।
বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:
তারা ঠিক করলেন তারা একটা প্যামফ্লেট বের করবেন যার বিষয় হবে নারীর যৌনতা ও স্বাস্থ্য।
"প্রথম নাম ছিল উইমেন এ্যান্ড দেয়ার বডিজ। তার পর আমরা ভাবলাম, না এটার নাম নারীরা ও "তাদের" দেহ - এমন কেন হবে? এটা তো "আমাদের"ই বিষয় - আমরা নিজেরাই, আমাদেরই দেহ, আমাদেরই জীবন।"
সেই প্যামফ্লেট এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে ১৯৭২ সালে তাদের সাথে যোগাযোগ করলেন সাইমন এ্যান্ড শুস্টার নামে একজন প্রকাশনা সংস্থা। তারা জানতে চাইলেন, এ বিষয়ে এই নারীরা একটি বই লিখতে আগ্রহী কিনা।
প্রথম দিকে তারা ঠিক নিশ্চিত ছিলেন না যে এ বিষয়ে একটি বই বের করা ঠিক হবে কিনা। ব্যাপারটা একটা বাণিজ্যিক উদ্যোগের মতো শোনাচ্ছিল। মনে রাখতে হবে এরা ছিলেন একদল বৈপ্লবিক চিন্তাধারার নারী যারা পুরুষতান্ত্রিকতা ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন। বই বের করা নিয়ে তাদের মনে একটা সন্দেহ ছিল।

ছবির উৎস, Mark Reinstein
তবে শেষ পর্যন্ত তারা রাজি হলেন। তবে তারা বললেন বইয়ের দাম খুব কম রাখতে হবে যাতে এটা সবাই কিনতে পারে। আর তা ছাড়া ক্লিনিকগুলোয় বইটি বিক্রির সময় ৭০ শতাংশ ডিসকাউন্ট দিতে হবে - যাতে রোগীদের মধ্যে এটি বিতরণ করা যায়।
"বইটা আমরা যেভাবে লিখেছিলাম তা ছিল সত্যি এক ব্যতিক্রমী ব্যাপার। আমরা সবাই মিলে একসাথে কাজ করেছিলাম। ফলে বইটার প্রতিটি শব্দের ব্যাপারে আমাদের ১২ জনের গ্রুপের সবাইকে সম্মতি দিতে হয়েছিল। কাজেই আমাদের দিনের পর দিন বৈঠক করতে হয়েছিল। সেটা ছিল এমনই যে আমরা দ্বিতীয়বার তা করার কথা ভাবতেও পারি না। কিন্তু এটা ছিল প্রকৃতপক্ষেই একটা যৌথ প্রক্রিয়া। আমার চোখে এটা ছিল এক দারুণ ব্যাপার।"
'আওয়ার বডিজ আওয়ারসেলভস'র প্রথম সংস্করণটি বের হয় ১৯৭৩ সালে।
বইটি ছিল বৈপ্লবিক, দ্ব্যর্থহীন এবং আন্তরিক।
"আমরা উপলব্ধি করছি যে আমাদের জীবনের এমন অনেক দিক আছে যা আমাদের ক্রুদ্ধ করে। অনেকেই আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে যে আমরা বড় বেশি উচ্চকণ্ঠ। কিন্তু আমাদের মেজাজ আসলে অনেক বেশি জটিল।"
এটি ছিল নারীদের দৈহিক গঠন এবং যৌন অনুভূতির বিষয়ে নানা তথ্যে ভরা একটি বিশ্বকোষের মত।
"আমরা জোর দিয়ে বলছি আপনি একটি আয়না নিয়ে বসে নিজেকে পরীক্ষা করুন। নিজেকে স্পর্শ করুন। নিজের গন্ধ নিন। আপনার দেহই আপনি, এবং আপনি অশ্লীল কিছু নন।"
বইটিতে একটি অধ্যায় ছিল যা লেসবিয়ান বা নারী সমকামিতার ওপর। আরো কয়েকটি অধ্যায় ছিল জন্মনিয়ন্ত্রণ, গর্ভপাত, গর্ভধারণ ও সন্তানের যত্ন নেবার ওপর। এতে আরো দুটি অধ্যায় ছিল ধর্ষণ ও আত্মরক্ষার কৌশল বিষয়ে। বইটিতে ব্যক্তিগত গল্পের সাথে বাস্তব তথ্যের সমন্বয় ঘটানো হয়েছিল।
বইটি বেস্টসেলার হয়েছিল এবং পরিণত হয়েছিল একটি সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ন ঘটনায়।
"বইটি সবাই সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। ক্লিনিকগুলোও বইটি কিনেছিল, মেডিক্যাল স্কুলগুলো এটিকে প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহার করেছিল। কিন্তু সবচেয়ে বেশি পড়েছিলেন সাধারণ নারীরা। আমরা অনেকের কাছ থেকে চিঠি পেয়েছি যে কীভাবে বইটি তাদের মধ্যে একটা পরিবর্তন এনে দিতে পেরেছিল।"
কিন্তু সবাই যে এ বই পছন্দ করেছিল তা নয়।
উনিশশো সত্তুর দশকের শেষ দিকে জেরি ফুলওয়েল নামে একজন ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান প্রচারক বইটিকে অশ্লীল এবং আবর্জনা বলে বর্ণনা করলেন। বললেন, স্কুল ও লাইব্রেরিগুলোর উচিত এই বই নিষিদ্ধ করা। সত্যিই কিছু প্রতিষ্ঠান বইটিকে নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু জোয়ান বলছেন, তারা যে প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলেন তার বেশির ভাগই ছিল ইতিবাচক।
"যখনই আমরা কোথাও যেতাম, লোকে বইটি নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলতো। কিন্তু এটা যে সারা দেশে মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিল - তা আমাদের খুবই অভিভূত করেছিল। "
সেই আন্দোলনের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠাতাই ছিলেন কলেজে-পড়া শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান নারী। তাদের অভিন্ন অভিজ্ঞতাই কি বইটিতে প্রতিফলিত হয়েছিল?
"হ্যাঁ নিশ্চয়ই তাই। আমরা সবাই ছিল মধ্যবিত্ত শ্বেতাঙ্গ নারী। তবে তখনকার দিনে এটা নিয়ে আমাদের কোন আত্মসচেতনতা ছিল না। তবে পরে ধীরে ধীরে আমরা এই সীমাব্ধতা সম্পর্কে সচেতন হতে শুরু করেছিলাম। এবং আমাদের মধ্যে যেন অন্য জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি ও অংশগ্রহণ থাকে - তার জন্য যতটা সম্ভব চেষ্টা করেছি।
বইটির পাঠকদের ব্যাপ্তি বাড়াতে তারা যা করেছিলেন তার অন্যতম হচ্ছে স্প্যানিশ ভাষায় বইটির একটি সংস্করণ বের করা। এর পর অন্য অনেক ভাষাতেই বইটি প্রকাশিত হয়েছে।
বইটি যত জনপ্রিয় হলো, ততই বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে নারী সংগঠনগুলো তাদের সাথে যোগাযোগ করতে লাগলো। তারা বললো তারা তাদের প্রেক্ষাপটের সাথে মানানসই করে বইটি প্রকাশ করতে চায়। এভাবে বইটির ৩৩ ভাষায় অনুবাদ হলো - আক্ষরিক অর্থেই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লো।
আওয়ার বডিজ আওয়ারসেলভস বইটি সারা পৃথিবীতে মোট ৪০ লক্ষ কপিরও বেশি বিক্রি হয়। যুক্তরাষ্ট্রেই বইটির নয়টি সংস্করণ বেরোয়। আধুনিক সংস্করণগুলোতে নতুন কিছু প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে - যেমন কিভাবে ইন্টারনেটে নারীদের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য মূল্যায়ন করতে হবে, তা ছাড়া নারীদের বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়া এবং জেন্ডার পরিচয়ের মত বিষয়গুলো।
যেদিন তারা প্রথম সেই বৈঠকে বসেছিলেন - তখন কি তারা চিন্তা করতে পেরেছিলেন যে একদিন এটাই তাদের সারা জীবনের কাজ হয়ে দাঁড়াবে? প্রশ্ন করা হয়েছিল জোয়ানকে।
"না, এটাই হচ্ছে আমাদের প্রয়াসের সবচেয়ে সুন্দর দিক। বইটা আমাদের অংশ হয়ে গেছে, আমি এবং অন্যরা যেভাবে বেড়ে উঠেছি, বইটেও সাথে সাথেই বেড়ে উঠেছে, পরিবর্তিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। "
"আমি কৃতজ্ঞ যে বইটি আমাদের জীবনে কিছু যোগ করার মতো শক্তি অর্জন করেছে। কিন্তু তখন আমরা ভাবতেই পারি নি যে একটি এমনটা হবে। সত্যি ভাবতে পারিনি।"









