গাঁজা: আমেরিকাতে কি এবার 'বিনোদনমূলক ক্যানাবিস সেবন' বৈধ হবে?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে এই প্রথম বারের মত গাঁজা বা ক্যানাবিসকে ফেডারেল আইনে ডিক্রিমিনালাইজ অর্থাৎ নিষিদ্ধ মাদকের তালিকা থেকে বাদ দেবার জন্য এক বিল পাস হয়েছে।

এটা এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কারণ, গাঁজা বৈধ করার ইস্যুটিতে দীর্ঘ দিন ধরে ফেডারেল সরকার ও অঙ্গরাজ্যগুলো ভিন্ন পথে চলছে।

আমেরিকার অনেক অঙ্গরাজ্যেই ২১ বছরের বেশি যে কেউ ''আনন্দ উপভোগের জন্য'' গাঁজা সেবন করতে পারেন, কিন্তু ফেডারেল অর্থাৎ কেন্দ্রীয় আইনে এখনো গাঁজা প্রথম কাতারের মাদক বলে তালিকাভুক্ত - যা সেবনের কোন সুফল নেই বলে ধরা হয়।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টির মধ্যে ১৫টি অঙ্গরাজ্যে অনেক আগেই গাঁজাকে নিষিদ্ধ মাদকের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।

আর ৩৮টি রাজ্যে শুধু চিকিৎসামূলক ব্যবহারের জন্য গাঁজার ব্যবহার বৈধ করা হয়েছে।

পৃথিবীর অন্যতম বহুল-ব্যবহৃত মাদক এই গাঁজা

মনে করা হয়, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সেবন করা হয় যেসব মাদক তার অন্যতম হচ্ছে গাঁজা বা ক্যানাবিস।

ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে শুরু করে সারা পৃথিবীতেই বহু শতাব্দী ধরে এটি সেবনের ইতিহাস আছে।

শুধু নেশার জন্য নয়, আয়ুর্বেদের মত প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্রে এর কিছু ভেষজ গুণের কথাও বলা হয়।

কিন্তু গাঁজা বা ক্যানাবিস সেবন নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের অনেকের মনেই বহু প্রশ্ন আছে।

এটি সেবন করলে মানসিক চাপ কমে যাওয়া, সুখানুভূতি ও ঘুমঘুম ভাব হয় ঠিকই, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলেন, গাঁজা সেবনে কোন ক্ষতি হয় না বলে যে দাবি কেউ কেউ করেন - তা আসলে ঠিক নয়।

'বিনোদনমূলক' গাঁজা সেবনের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিগুলো কী?

অনেক বিশেষজ্ঞই গাঁজা সেবন করলে সাইকোসিস দেখা দেবার সম্ভাবনার কথা বলেছেন।

ব্রিটেনের রয়াল কলেজ অব সাইকিয়াট্রিস্টস- এর গবেষণায় বলা হচ্ছে, গাঁজা সেবনের ফলে অনেকের ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তা, সন্দেহবাতিক, বিভ্রান্তি এবং হ্যালুসিনেশন (নানা রকম দৃশ্য দেখতে পাওয়া যার অস্তিত্ব নেই) হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাছাড়া এমন জোরালো প্রমাণ আছে যে বিশেষত তরুণ বয়সে নিয়মিত গাঁজা সেবন করলে - স্কিৎসোফ্রেনিয়ার মত মানসিক রোগের ঝুঁকি অন্তত ৫ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। কিছু জরিপে দেখা গেছে নিয়মিত ক্যানাবিস ব্যবহারের সাথে ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা দেখা দেবার সম্পর্ক আছে।

ব্রিটেনের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোফার্মাকোলজির অধ্যাপক সিলিয়া মর্গান বলছেন, গাঁজার নেশার ফলে স্বল্পমেয়াদে স্মৃতি ও বোধশক্তি কমে যায় এবং অন্তত ২০ দিন পর্যন্ত এর প্রভাব দেহে রয়ে যায়।

তবে এসব মত সবাই সমর্থন করেন না

গাঁজার স্বাস্থ্যগত প্রতিক্রিয়া ঠিক কী এবং কতটুকু তা নিয়ে বিতর্ক আছে। তা ছাড়া সব জরিপে যে একই রকম ফলাফল পাওয়া গেছে - তাও নয়।

কিছু বিশেষজ্ঞ বলেন, বহু লোক গাঁজা সেবন করেন কিন্তু তাদের মধ্যে সাইকোসিস দেখা দেয় না।

আবার এমন অনেকে সাইকোসিসে আক্রান্ত হন যারা জীবনে কখনো গাঁজা সেবন করেননি।

মনে করা হয়, এ ক্ষেত্রে হয়তো জেনেটিক গঠন একটা ভূমিকা পালন করে।

ডিপ্রেশনের সাথেও ক্যানাবিসের সম্পর্ক স্পষ্ট নয় বলে মনে করেন কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ড. মার্তা ডি ফর্তি।

হয়তো এমন হতে পারে যে যারা বিষণ্ণতায় আক্রান্ত তাদের নেশাসক্ত হবার সম্ভাবনা বেশি।

অবশ্য ক্যান্সারের সাথে গাঁজা সেবনের কোন সম্পর্ক আছে কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়।

তবে ব্রিটেনের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ এনএইচএসের মতে গাঁজা সেবনকারীদের ব্রংকাইটিস বা ফুসফুসের ঝিল্লির প্রদাহ দেখা দেবার সম্ভাবনা বেশি।

গাঁজা কি আসক্তি সৃষ্টি করে?

একসময় বিজ্ঞানীরা মনে করতেন যে গাঁজা মানবদেহে স্থায়ী মাদকাসক্তি সৃষ্টি করে না।

কিন্তু এখন বেশকিছু তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে নিয়মিত সেবন করলে গাঁজা থেকেও প্রায় ১০ শতাংশ ব্যবহারকারীর মধ্যে আসক্তি ও নির্ভরতা সৃষ্টি হতে পারে।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

ব্রিটেনের রয়াল কলেজ অব সাইকিয়াট্রিস্টস-এর গবেষণায় দেখা গেছে, গাঁজা ছেড়ে দিলেও তা আবার সেবনের তাড়না, অস্থিরতা, হঠাৎ রেগে যাওয়া, ঘুম না হওয়া, সম্পর্কের সমস্যা, কর্মক্ষেত্রে বা স্কুলে কাজ করতে না পারা - এরকম বহু লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ড. মাইকেল ব্লুমফিল্ড বলছেন, টিএইচসি নামে গাঁজার একটি উপাদান বেশ কিছু লোকের ক্ষেত্রে আসক্তি তৈরি করতে পারে - এমন জোরালো প্রমাণ আছে।

গাঁজার কি কোন স্বাস্থ্যগত সুফল আছে?

ব্রিটেনে এক গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছিল: ব্যথা উপশম ও অন্য কিছু ক্ষেত্রে ক্যানাবিসের ব্যবহারের পক্ষে 'মাঝারি মাত্রার' প্রমাণ পাওয়া গেছে।

ব্রিটেনে কেউ কেউ মৃগী রোগীদের খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণের জন্য গাঁজা থেকে তৈরি একরকম তেল ব্যবহার করে উপকার পান - যা ক্যানাবিস অয়েল নামে পরিচিত।

ব্রিটেনে ২০১৬ সালে একটি জরিপ রিপোর্টে বলা হয়েছিল - ব্যথা উপশম, দুশ্চিন্তা দূর করা, কেমোথেরাপির পর বমি ভাব ঠেকানো, এবং মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের কিছু সমস্যার চিকিৎসার ক্ষেত্রে ক্যানাবিসের থেরাপিউটিক ব্যবহারের পক্ষে স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

এতে বলা হয়, অনিদ্রা, ক্ষুধা হ্রাস, পিটিএসডি এবং পার্কিনসন্স রোগের চিকিৎসায়ও গাঁজা সহায়ক হতে পারে বলে কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে।

যে অঙ্গরাজ্যগুলো গাঁজা বৈধ করেছে সেখানে কী ঘটেছে?

কিছু জরিপে দেখা গেছে যে আমেরিকার যেসব রাজ্যে ক্যানাবিস বৈধ করা হয়েছে সেখানে টিনএজার অর্থাৎ ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এর ব্যবহার কমেছে, অথবা একই রকম আছে।

অন্যদিকে বৈধ করার পর ২৬ বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে গাঁজার ব্যবহার বেড়েছে।

২০১৪ থেকে ২০১৬-র মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের চারটি অঙ্গরাজ্য ওয়াশিংটন, ওরেগন, আলাস্কা ও কলোরাডোতে গাঁজা বৈধ করা হয়।

কিন্তু জরিপে দেখা গেছে এদের মধ্যে একমাত্র আলাস্কা ছাড়া অন্যগুলোতে এর ফলে আফিমজাত মাদকের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়েনি।

বিনোদনমূলক ব্যবহারের সীমা

যেসব দেশে গাঁজা সেবন বৈধ করা হয়েছে সেখানেও অনেক সময় ব্যবহারকারীর জন্য একটা সীমা বেঁধে দেয়া হয়।

ক্যানাডা হচ্ছে প্রথম জি-৭ ভুক্ত দেশ যারা বিনোদনমূলক গাঁজা সেবন বৈধ করেছে। এ ছাড়া নেদারল্যান্ডস ও পর্তুগালের বিনোদনমূলক গাঁজা ব্যবহার বৈধ।

কানাডায় একজন ব্যবহারকারী সাধারণত ৩০ গ্রাম পর্যন্ত গাঁজা সাথে রাখতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে বাড়িতে একজন কতখানি মজুত রাখতে পারবেন সে ব্যাপারেও বিধিনিষেধ আছে, তবে সব অঙ্গরাজ্যে নয়।

কিন্তু ব্রিটেনে - যেখানে গাঁজা একটি ক্লাস 'বি' মাদক - সেখানে এক আউন্স সাথে থাকলেও পুলিশ তাকে তৎক্ষণাৎ জরিমানা করতে বা সতর্কবাণী দিতে পারে।

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া, পোল্যান্ড, তুরস্ক, চেক প্রজাতন্ত্র, ক্রোয়েশিয়া ও ম্যাসিডোনিয়ার মত কিছু দেশে শুধু চিকিৎসার জন্য গাঁজা ব্যবহার বৈধ।

দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশেই কৃষকদের গাঁজা চাষে উদ্বুদ্ধ করে সেসব দেশের সরকার।

পৃথিবীর অনেক দেশেই চিকিৎসার কাজে গাঁজা ব্যবহৃত হচ্ছে, নিকট ভবিষ্যতে আরো অনেক দেশে ব্যবহার শুরু হবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

সম্ভাবনাময় এই খাত থেকে মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যেই বিভিন্ন দেশের সরকার গাঁজা চাষকে গুরুত্ব দেয়।

গাঁজা কি অন্য মাদকে আসক্ত হবার দরজা?

অধ্যাপক মর্গান বলছেন, যারা কোকেন বা হেরোইনের মত কড়া মাদকে আসক্ত তারা পাশাপাশি গাঁজা সেবনও করতে পারে - কিন্তু যারা গাঁজা আসক্ত তারাই যে পরবর্তীকালে আরো কড়া মাদকের দিকে যাবেন - তার কোন জোরদার প্রমাণ নেই।

তবে তিনি বলেন, গাঁজা সেবন থেকে অনেকে তামাকের ধূমপান অর্থাৎ সিগারেটের দিকে আকৃষ্ট হতে পারেন - যা সবচেয়ে ক্ষতিকর নেশা দ্রব্যগুলোর অন্যতম।

আমেরিকায় এ বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারাভিযানের সময় ডেমোক্র্যাট শিবিরে এটা একটা বড় বিতর্কের বিষয় ছিল।

জো বাইডেন সেসময় স্পষ্ট কোন অবস্থান নিতে চাননি।

তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ক্যানাবিস বৈধ করার পক্ষে দাঁড়ানোর আগে তিনি আরো প্রমাণ পেতে চান যে গাঁজা অন্য মাদকে আসক্তি সৃষ্টির দরজা হিসেবে কাজ করে না।

মি. বাইডেন বলেছিলেন, এ ব্যাপারে এখনো যথেষ্ট প্রমাণ নেই।

তার রানিং মেট কমালা হ্যারিস কিন্তু স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন যে ক্যানাবিস বা মারিজুয়ানা 'গেটওয়ে ড্রাগ' নয় এবং এটা বৈধ করে দেয়া উচিত।

এখন দেখার বিষয়- প্রেসিডেন্ট ও ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষেক হবার পর জো বাইডেন ও কমালা হ্যারিস এ ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেন।

এক জরিপে দেখা গেছে দু-তৃতীয়াংশ প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকানই গাঁজাকে ডিক্রিমিনালাইজ করার সমর্থক।

অবশ্য,আইনে পরিণত হতে হলে বিলটিকে মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে পাস করাতে হবে।