ভারতে আতশবাজি নিয়ে তুমুল তর্ক - হিন্দুরা প্রাচীন যুগেও কি উৎসবে বাজি ফাটাতেন?

এ বছরের দীপাবলীতে হায়দ্রাবাদে আতসবাজি জ্বালাচ্ছে শিশু ও কিশোরীরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, এ বছরের দীপাবলীতে হায়দ্রাবাদে আতশবাজি জ্বালাচ্ছে শিশু ও কিশোরীরা
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

প্রাচীন ভারতে হিন্দুরা তাদের উৎসবের সময় আদৌ আতশবাজির ব্যবহার করতেন না, সামাজিক মাধ্যমে এই দাবি করার পর তীব্র আক্রমণের মুখে পড়েছেন ব্যাঙ্গালোরের একজন ডাকসাইটে নারী পুলিশ কর্মকর্তা।

ডি রূপা মৌদগিল বা 'ডি রূপা' নামে পরিচিত ওই সিনিয়র আইপিএস অফিসারকে সাসপেন্ড করার দাবি জানিয়েছেন বলিউড অভিনেত্রী কঙ্গনা রানাওয়াত।

তামিলনাডুর রাজনৈতিক দল ডিএমকে-র নেত্রী কানিমোয়ি বা কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভি'র তীব্র সমালোচনার মুখেও পড়েছেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা।

এদিকে আতশবাজির ব্যবহার নিয়ে ডি রূপার সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়াতে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ে জড়িয়ে পড়েছিল 'ট্রু ইন্ডোলজি' বা 'প্রকৃত ভারততত্ত্ব' নামে একটি টুইটার হ্যান্ডল - তারপর টুইটার কর্তৃপক্ষ সেই হ্যান্ডলটি ব্লক করে দিয়েছে।

'ট্রু ইন্ডোলজি'কে যাতে আনব্লক করা হয়, তার জন্যও এখন জোরদার প্রচার চালানো হচ্ছে ভারতে। অনেক দক্ষিণপন্থী ব্যক্তিত্ব সেই দাবিতে সমর্থনও জানাচ্ছেন।

আইপিএস অফিসার ডি রূপা

ছবির উৎস, D Roopa/Twitter

ছবির ক্যাপশান, আইপিএস অফিসার ডি রূপা

কিন্তু কীভাবে সূত্রপাত হল এই তুমুল বিতর্কের - যাতে এখন ভারতের পুলিশ অফিসার থেকে শুরু করে অভিনেত্রী, অ্যাক্টিভিস্ট বা রাজনীতিবিদরা অনেকেই জড়িয়ে পড়ছেন?

এই বিতর্কের সূচনা আসলে এ বছরের দীপাবলীর দিনে (১৪ই নভেম্বর) ডি রূপার একটি টুইটার পোস্টকে ঘিরেই।

দীপাবলীকে কেন্দ্র করে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে আতশবাজির বেচাকেনা ও জ্বালানোর ওপর যে নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছিল, সেই পটভূমিতেই ওই পোস্টটি করেছিলেন ব্যাঙ্গালোরের ওই জনপ্রিয় পুলিশ কর্মকর্তা।

টুইটারে তিনি নিজেরই একটি ফেসবুক লিঙ্ক পোস্ট করেন, যাতে লেখা ছিল, "আমাদের উৎসব কি এতই অন্তঃসারশূন্য যে আতশবাজি না-ফাটালে উৎসব হবে না?"

আরও পড়তে পারেন :

ভারতের তামিলনাডুতে একটি আতসবাজির দোকান

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতের তামিল নাডুতে একটি আতশবাজির দোকান

"দীপ জ্বালিয়ে, মানুষের সঙ্গে দেখা করে বা মিষ্টি বিলি করে কত ভাবেই না উৎসব পালন করা যায়! অথচ কিছু লোক বাজি ফাটানোর জন্যই জেদ ধরে থাকবে!"

ডি রূপা আরও লেখেন, "আতশবাজি ফাটানো যাচ্ছে না বলে যারা হিন্দুদের সর্বনাশ হয়ে গেল রব তুলছেন, তাদের উদ্দেশে বলব বৈদিক যুগের আগে-পরেও কিন্তু বাজি ফাটানোর কোনও রীতি ছিল না। আমাদের পুরাণ-মহাকাব্যেও আতশবাজির কোনও উল্লেখ নেই।"

"এই দেশে আতশবাজি এসেছে ইউরোপীয়ানদের হাত ধরে। কাজেই এটা কখনওই হিন্দু ধর্মের 'কোর ট্র্যাডিশন' বা মৌলিক পরম্পরা, রীতিনীতির অংশ নয়!"

এই পোস্টের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই টুইটারেটি-র একটা বড় অংশ ডি রূপাকে আক্রমণ করতে শুরু করে। 'ট্রু ইন্ডোলজি' হ্যান্ডল থেকে দাবি করা হয়, প্রাচীন ভারতে আতশবাজির ব্যবহার ছিল না, এই বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল।

কঙ্গনা রানাওয়াত

ছবির উৎস, Prodip Guha

ছবির ক্যাপশান, কঙ্গনা রানাওয়াত

'ট্রু ইন্ডোলজি' ওই পুলিশ কর্মকর্তার উদ্দেশে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে মন্তব্য করে, "প্রাচীন শাস্ত্র ও পুরাণ থেকে শ্লোক উদ্ধৃত করে আমরা দেখিয়ে দিতে পারি প্রাচীনকাল থেকেই ভারতে বাজি ফাটানোর চল ছিল।"

কিন্তু ক্রমশ 'ট্রু ইন্ডোলজি' এবং ডি রূপার মধ্যে তর্কাতর্কি ভীষণ তিক্ত ও খারাপ মোড় নিতে থাকে - একটা পর্যায়ে টুইটার ট্রু ইন্ডোলজি-র অ্যাকাউন্টটিই বন্ধ করে দেয়। যদিও এ জন্য তারা কোনও নির্দিষ্ট কারণ দেখায়নি।

উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের একটা পর্যায়ে ডি রূপা ট্রু ইন্ডোলজি-র উদ্দেশে বলেছিলেন, "তোমাদের সময় ঘনিয়ে এসেছে" (ইয়োর টাইম ইজ আপ)। সেই মন্তব্যকে হাতিয়ার করে ডি রূপার বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ শানানো হতে থাকে।

ভারতে আতশবাজি তৈরির বেশির ভাগ কারখানাই তামিল নাডুর শিভাকাশি অঞ্চলে। ফলে তামিল রাজনীতিবিদরা প্রায় সকলেই ঢালাওভাবে আতশবাজি নিষিদ্ধ করার বিরোধিতা করছেন।

Skip X post, 1
X কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: তৃতীয়পক্ষের কন্টেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of X post, 1

এই পটভূমিতেই তামিল রাজনৈতিক দল ডিএমকে-র শীর্ষ নেত্রী কানিমোয়ি পুলিশ কর্মকর্তা ডি রূপাকে কটাক্ষ করে লেখেন, "এ কী ধরনের বিপজ্জনক দুনিয়ায় আমরা বাস করছি?"

"অনির্বাচিত একজন অফিসার কীভাবে এত অসীম ক্ষমতা ভোগ করেন, কীভাবে তিনি বলতে পারেন কার সময় ফুরিয়ে এসেছে?"

"এ তো দাউদ ইব্রাহিমের মতো ব্যাপারস্যাপার" - কুখ্যাত মাফিয়া ডনের সঙ্গে তুলনা টানতেও দ্বিধা করেননি কানিমোয়ি তার বক্তব্যে।

তবে আরও এক ধাপ এগিয়ে আইপিএস অফিসার ডি রূপাকে বরখাস্ত করার দাবি জানান বিতর্কিত বলিউড তারকা এবং ইদানীং হিন্দুত্বের নানা ইস্যুতে সরব, অভিনেত্রী কঙ্গনা রানাওয়াত।

পুলিশ কর্মকর্তা ডি রূপাকে মুম্বাইয়ের একটি অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পুলিশ কর্মকর্তা ডি রূপাকে মুম্বাইয়ের একটি অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে

কঙ্গনা টুইটারে তাকে সাসপেন্ড করার দাবি জানিয়ে লেখেন, "এই ধরনের কর্মকর্তারা পুলিশ বাহিনীর কলঙ্ক!"

ডি রূপা ওই পদে আসার যোগ্য নন বলেও মন্তব্য করেন তিনি, সেই সঙ্গে দাবি জানান 'ট্রু ইন্ডোলজি'কে টুইটারে ফিরিয়ে আনারও।

কংগ্রেস নেতা অভিষেক মনু সিংভি-ও ডি রূপার সমালোচনা করে টুইট করেন, তবে তার বক্তব্যের সুর ছিল কিছুটা ভিন্ন।

"একজন ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস অফিসার কেন একটি অজ্ঞাতনামা টুইটার হ্যান্ডলের সঙ্গে তর্কাতর্কিতে জড়াবেন, তাও আবার তাঁর কাজের সময়ে?" - এটাই ছিল মি. সাংভির প্রশ্ন।

Skip X post, 2
X কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: তৃতীয়পক্ষের কন্টেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of X post, 2

সোশ্যাল মিডিয়াতে ঝগড়া করে ডি রূপা যে কিছু জিততে পারবেন না, সে কথাও মনে করিয়ে দেন তিনি।

তবে ডি রূপা এই তর্কে জিতুন বা হারুন - এই দীপাবলীর মওশুমে একটা প্রশ্ন তিনি বেশ সফলভাবেই উসকে দিয়েছেন।

প্রাচীন ভারতে হিন্দুরা আদৌ আতশবাজি ব্যবহার করত কি না - সেই প্রশ্নকে ঘিরে এই মুহুর্তে মেতে আছেন ভারতের নেটিজেনদের এক বিরাট অংশ!

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন: